চতুর্থ মেয়াদের প্রার্থিতা নিয়ে নতুন আইনি জটিলতায় ইনফান্তিনো

জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আগামী বছর নির্ধারিত ফিফা সভাপতি নির্বাচনে যেন আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারেন, সে জন্য সংস্থাটির 'গভর্নেন্স, অডিট অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স কমিটি'র কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে আন্তর্জাতিক সুশাসন ও মানবাধিকার বিষয়ক অলাভজনক সংস্থা ‘ফেয়ারস্কয়ার’।

দ্য অ্যাথলেটিক চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছে, ফেয়ারস্কয়ারের মূল দাবি—ফিফার নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন মেয়াদের বেশি কেউ পদে থাকতে পারবেন না। ইনফান্তিনো ইতিমধ্যেই তার শেষ মেয়াদ অতিক্রম করছেন, ফলে আগামী বছরের নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে তার অংশ নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। আগামী বছরের নির্বাচনে এখন পর্যন্ত একমাত্র ইনফান্তিনোই সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

মেয়াদকাল বিতর্কের পেছনের ইতিহাস

২০১৬ সালে ফিফার ভয়াবহ দুর্নীতি কেলেঙ্কারির পর তৎকালীন সভাপতি সেপ ব্ল্যাটার পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সেই বছরের বিশেষ কংগ্রেসে জয়ী হয়ে সভাপতির চেয়ার সামলান ৫৬ বছর বয়সী ইনফান্তিনো। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, একজন প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ ৩ মেয়াদের (১২ বছর) বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না।

তবে ২০২২ সালে কাতারের দোহায় ফিফা কাউন্সিলের এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইনফান্তিনোর সময়কালটি তার নিজস্ব 'পূর্ণাঙ্গ মেয়াদ' ছিল না, বরং তা ছিল ব্ল্যাটারের অসম্পূর্ণ মেয়াদ পূরণ। তাই দাপ্তরিকভাবে ২০১৯-২০২৩ ছিল তার প্রথম মেয়াদ এবং ২০২৩-২০২৭ তার দ্বিতীয় মেয়াদ। এই ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে তিনি ২০৩১ সাল পর্যন্ত চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার সুযোগ তৈরি করে রেখেছেন।

ফেয়ারস্কয়ারের চিঠিতে তোলা ৩ প্রধান যুক্তি

গত ১৩ আগস্ট প্রেরিত এই চিঠিতে ফেয়ারস্কয়ার ফিফা রিভিউ কমিটির কাছে তিনটি সুনির্দিষ্ট পয়েন্ট তুলে ধরেছে:

  • ফিফার মূল সংবিধানে মেয়াদ 'আংশিক' কিংবা 'সম্পূর্ণ' কি না—সে ভিত্তিতে মেয়াদ বাদ দেওয়ার কোনো আইনি বিধান নেই। সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে "কেউ তিন মেয়াদের বেশি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না"।
  • ২০১৬ সালে ফিফায় দুর্নীতি বন্ধ ও স্বচ্ছতা আনতে যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করা হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল মেয়াদ নির্দিষ্ট করা। মজার বিষয় হলো, ইনফান্তিনো নিজেই সেই ২০১৬ সালের ফিফা সংস্কার কমিটির উয়েফা প্রতিনিধি ছিলেন।
  • যদি মধ্যবর্তী মেয়াদগুলোকে গণনা না করা হয়, তবে যেকোনো সভাপতি কাউন্সিলকে ব্যবহার করে অকাল নির্বাচনের মাধ্যমে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার অসদুপায় অবলম্বন করতে পারেন।

বিতর্কের ঝড়ে কোণঠাসা ইনফান্তিনো

ইনফান্তিনোর এই চতুর্থ মেয়াদের পরিকল্পনা ঘিরে ফুটবল বিশ্বজুড়ে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা ইতোমধ্যেই তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। পাশাপাশি উত্তর আমেরিকার কনকাকাফ এবং এশিয়ার এএফসি যৌথ চিঠিতে তাঁর নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করে পদত্যাগেরও ইঙ্গিত দিয়েছে।

এছাড়া সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় তাঁর ভূমিকা নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে:
১. মার্কিন রাজনীতি ও ট্রাম্প ইস্যু: তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে 'ফিফা পিস প্রাইজ' দেওয়া এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ভঙ্গ করার অভিযোগে ফেয়ারস্কয়ার ইতোমধ্যেই ফিফা এথিক্স কমিটিতে অভিযোগ দায়ের করেছে। পরবর্তীতে নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশন এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৫০ জন সদস্যও এই তদন্তের পক্ষে সওয়াল করেছেন।
২. খেলোয়াড় বিতর্ক: ২০২৬ বিশ্বকাপের মাঝামাঝি মার্কিন ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা হঠাৎ স্থগিত করা।
৩. বাণিজ্যিক বিতর্ক: যোশুয়া কুশনারের 'থ্রাইভ ক্যাপিটাল'-এর কাছে গোপনে ফিফার টুর্নামেন্ট ও ইভেন্টের শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা করা, যা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হলে পরে সেই পরিকল্পনা বাতিল হয়।

রিভিউ কমিটির বর্তমান সদস্যরা ২০২২ সালের সেই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বাতিল করে ইনফান্তিনোকে পরবর্তী নির্বাচনের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করবেন কি না—এখন সেটাই দেখার বিষয়। বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে ফিফার সাথে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।