বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে থাকা প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা ছিলেন বলে পরিচয় শনাক্ত করেছে মিয়ানমারের সেনা সমর্থিত সরকার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, রোহিঙ্গা সংকট তথা বাস্তুচ্যুত রাখাইন রাজ্যের নাগরিকদের প্রত্যাবাসন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বিষয়। গত রবিবারের ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নতি হলেই কেবল এদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। মন্ত্রণালয়টি জানিয়েছে, গত ৩১ জুলাই ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার একটি তালিকা মিয়ানমারকে দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে বাংলাদেশে থাকা রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা বলে নিশ্চিত করেছে মিয়ানমার। দেশটি বলছে, তারা বাংলাদেশের দেওয়া প্রত্যাবর্তনের তালিকায় থাকা ৪ হাজার ২৪১ জনকে সন্ত্রাসী তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত বলে চিহ্নিত করেছে। তবে আরও ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনকে যাচাই করতে পারেনি।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর এক দমনাভিযানের পর ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে চলে আসে আর এখনো অনেকে সাগর ও স্থলপথে অনিশ্চিত যাত্রার মাধ্যমে আসা অব্যাহত রেখেছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বর্তমানে আরাকান আর্মির সঙ্গে লড়াই করছে; যারা ওই অঞ্চলের জন্য বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসন চায়। এটি রাখাইনে সক্রিয় একটি জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং রাজ্যটির একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ করছে। ২০১৮ ও ২০১৯ সালের আগের প্রত্যাবাসন উদ্যোগগুলোতে দুই দেশ প্রস্তুতি নিলেও, শেষ পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যায়নি। এর আগে গত মাসে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছিলেন, মালয়েশিয়া থেকে ৫ হাজার এবং বাংলাদেশে অবস্থানরতদের মধ্যে ৩ লাখ রোহিঙ্গা ফেরত নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। শরণার্থীদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। তবে কুয়ালালামপুর জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে এমন পরিস্থিতিতে এই প্রত্যাবাসন কার্যকর করা হবে না।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ফলে তারা বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। রাখাইনে নির্যাতন ও সহিংসতার কারণে কয়েক দফায় বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। ২০১৬ সালে রাজ্যটিতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযানের পর সাড়ে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন করে কিছু অনুপ্রবেশ এবং নিয়মিত জন্মহারের কারণে এই সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি নিবন্ধিত শরণার্থী শিবিরে এবং নোয়াখালীর ভাসানচরে বসবাস করছেন এসব রোহিঙ্গা। বাংলাদেশের পাশাপাশি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মালয়েশিয়াকে দীর্ঘদিন ধরে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখা হয়। চলতি বছর ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার।