ইলিশ এখন বিলাসী খাবার

নিকটজনেরা বলেন বাজার করা নাকি আমি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। আমি কারও বাজারে তৃপ্তি পাই না। ছোটকাল থেকে বাবার সঙ্গে বাজারে যেতাম। সেই কৈশোর থেকে একাকী বাজার-সদাই নিজে করার মধ্য দিয়ে সেটা অভ্যাসেও দাঁড়িয়েছে। অন্য কারও ওপর বাজারের ক্ষেত্রে নির্ভর করতে পারি না। এই গৌরচন্দ্রিকার কারণ ইলিশ নিয়ে দেশ রূপান্তরের সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিবেদন।

এখন ইলিশের মৌসুম। পরিবারের সবার বায়না বাজার থেকে কেন ইলিশ আনি না। বাজারে হাইব্রিড মাছের ছড়াছড়ি। কিন্তু ইলিশ মানসম্মত সাইজ অনুযায়ী পাওয়া যায় না। ২৫০ গ্রাম থেকে বড়জোর ৫০০ গ্রামের ঊর্ধ্বে ইলিশ মেলা ভার। ‘পরিবারের পীড়াপীড়িতে ইলিশ কিনতে বাজারে গিয়েছিলাম। মাত্র দুই-তিনজন বিক্রেতার কাছে সর্বোচ্চ এক কেজি ওজনের ইলিশ পেলাম। সংখ্যায়ও কম। দাম শুনে আঁতকে উঠেছি। দুই হাজার দুইশ টাকা প্রতি কেজি ইলিশ। বহু চেষ্টা করেও দর কমানো সম্ভব না হওয়ায় অগত্যা একটি ইলিশ কিনে বাসায় ফিরি। টেনেটুনে সেটি একবেলা চলার। পরিবারের সবার চাহিদা পূরণে এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করলেও; এক কেজির ইলিশ বাইশ শ’ টাকায় কিনে অনুশোচনায় দগ্ধ হই। রীতিমতো অর্থনাশের শামিল। যে ইলিশটি বাইশ শ’ টাকায় কিনেছি একই সাইজের ইলিশ চার-ছয় আনায়ও কিনেছি, সেই অতীতে। খাদ্যপণ্যের দরের তারতম্য কোথায় পৌঁছেছে! নিয়মিত বাজার করি বলেই খাদ্যপণ্যের বাজার অর্থনীতি সম্পর্কে আমার ধারণা খুবই পরিষ্কার।

এক সমীক্ষায় জানতে পেরেছি বিশ্বে সর্বাধিক ইলিশ উৎপন্নের ও আহরণের জন্য বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। ইলিশ উৎপন্নের সেরা দেশটিতে এক কেজি ইলিশের দাম কীভাবে বাইশ শ’ টাকা হয়? বাজারের সিংহভাগ ইলিশ তাহলে কেন ২৫০ গ্রাম থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের? বড় ইলিশ বাজার থেকে উধাও কেন? কোথায় যায় দেশের ইলিশ? প্রশ্নগুলো অমূলক বিবেচনার সুযোগ নেই। শোনা যায় বাংলাদেশের ইলিশে সয়লাব পশ্চিম বাংলার বাজার। কথাগুলো আমলে নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করিনি। কেননা কলকাতায় ইলিশের দাম আমাদের দেশের মতোই। গত শতকের সত্তর ও আশির দশকে কলকাতায় গিয়ে কলকাতার বাঙালিদের মুখে ইলিশের আহাজারি শুনতাম। বিমানে গেলে ইলিশ ভেজে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও রয়েছে। পদ্মার ইলিশের কথায় তাদের চোখেমুখে অতৃপ্তির ভাব ফুটে উঠত। ইলিশবঞ্চিত কলকাতার বাঙালিদের হতাশার অভিব্যক্তি তাদের কথায়-আচরণে প্রকাশ পেত। বিশেষ করে দেশভাগে ভিটেমাটি ত্যাগ করে জীবন বাঁচাতে পশ্চিম বাংলায় স্থায়ী হওয়া বাঙালদের ক্ষেত্রে সর্বাধিক দেখেছি। ইলিশের জন্য তাদের আদিখ্যেতায় বিরক্তই হতাম। অথচ আজকের বাস্তবতা, আমরা তাদেরই ভাগ্যবরণ করেছি।

কলকাতায় বেশ ক’বার মাছের বাজার পরিদর্শনও করেছি। বাজারে হরেক মাছের দোকান দেখেছি, তবে নগণ্য ছিল ইলিশ। ২০০ গ্রাম থেকে ৪০০ গ্রামের সর্বাধিক ইলিশ মাছ দেখেছি। দাম শুনেও আঁতকে উঠেছি। এখন পশ্চিম বাংলার সমস্ত বাঙালির দীর্ঘ যুগের হাপিত্যেশের অবসান হয়নি, আমাদের দশাও তদ্রƒপ। স্মার্ট ফোন ও কেবল টিভির কল্যাণে

বিশ্বসংস্কৃতি এখন সবার ঘরে ঘরে, হাতের মুঠোয়। কলকাতার বাংলা চ্যানেলে রন্ধন বিষয়ক অনুষ্ঠানে বর্ষা ঋতু উপলক্ষে ইলিশের নানা পদের রান্নার রন্ধন প্রণালি সম্প্রচারিত হয়। পশ্চিম বাংলার দর্শকরা আমাদের চ্যানেল না দেখলেও, আমরা তাদের চ্যানেলের অনুষ্ঠান নিয়মিত দেখি। অভিন্ন রুচি-সংস্কৃতির কারণে কলকাতার বাংলা চ্যানেল আমাদের দেশে হিন্দির পর সর্বাধিক জনপ্রিয়। ওই ইলিশ রান্না-বিষয়ক অনুষ্ঠানের প্রভাবেই বোধকরি পারিবারিক চাপে এক কেজি ইলিশ মাছ আমাকে বাইশ শ’ টাকায় কিনতে হয়েছে। রন্ধন প্রণালি যখন খাতায় টুকে রাখা দেখেছি তখন আর সন্দেহের অবকাশ থাকেনি।

গত শতকের সত্তর ও আশির দশকে যারা কলকাতায় ভ্রমণ করেছেন, তাদের সবারই দুটি বিব্রতকর অভিজ্ঞতা রয়েছে। একটি কলকাতার যানজট। অপরটি লোডশেডিং। যে দুটির কোনোটিতে তখন আমরা আক্রান্ত হইনি। যানজট ও লোডশেডিংয়ে অনভ্যস্ত আমরা নিজেদের ভাগ্যবান বিবেচনা করতাম। কলকাতার প্রতিটি দোকানের সামনে সারিবদ্ধ জেনারেটর থাকত। কলকাতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে ভারতের রাজধানীর মর্যাদা পেয়েছিল। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর ১৯১১ সাল পর্যন্ত কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার রাজধানী। সেই কলকাতার দুর্দশা দেখে আমরাও কম হতাশ হইনি তখন। ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী উপহাস করে কলকাতাকে ভারতের ডাস্টবিন বলেছিলেন। কলকাতায় এখন যানজট নেই। মেট্রোরেল কলকাতার ৮০ শতাংশ যানজট নিরসন করেছে। পাতাল রেলসহ নানা সুপরিকল্পিত উপায়ে তারা যানজটের অবসান করেছে। লোডশেডিংও নেই। তারা দুর্ভোগের সেই খাদ থেকে পরিকল্পিত উপায়ে পরিত্রাণ লাভ করেছে। বামফ্রন্ট সরকারের অনেক সাফল্যের মধ্যে যানজট নিরসন এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আমরা এখন ওই দুই খাদে পড়েছি। সরকার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির রেকর্ড স্থাপন করলেও বিদ্যুতের লোডশেডিং মুক্ত করতে পারে না। পাশাপাশি বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিলে মানুষ এখন দিশাহারা।

ইলিশের কথায় ফিরে আসি। আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি। এটাই আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য রুচি-সংস্কৃতি। যে মাছের কোনো উৎপাদন ব্যয় নেই, এর দাম এত ঊর্ধ্বমুখী কেন? ইলিশ নিয়ে এত আক্ষেপ কেন তৈরি হলো এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান দরকার। ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছের স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু সে মাছ এখন নগণ্য মানুষই কিনে খাওয়ার সামর্থ্য রাখেন। সমষ্টিগত মানুষের পক্ষে ইলিশ কেনা অসাধ্য কেবল নয়, অসম্ভবও। ইলিশের ছড়াছড়ি অতীতে দেখেছি, কিন্তু এখন ইলিশ দুষ্প্রাপ্য কেন? মা-ইলিশের ডিম ছাড়ার সময় ইলিশ ধরা সরকার নিষিদ্ধ করে দেয়। কিন্তু আমাদের সামগ্রিক সংস্কৃতি হচ্ছে আইন অমান্য করার হীন মানসিকতা। কোস্ট গার্ডদের ফাঁকি দিয়ে জেলেরা মা-ইলিশ ধরে। এতেও ইলিশের ঘাটতির সম্ভবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। ইলিশ মধ্যবিত্তদেরও নাগালের বাইরে চলে গেছে। সাধারণের পক্ষে তো স্বপ্ন-কল্পনা। জাতীয় মাছের এমন দশার কারণ নির্ধারণ করা যেমনি আবশ্যক, তেমনি জরুরিও।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

mibabla71@gmail.com