৩০ লক্ষাধিক মানুষ চিকিৎসা বঞ্চিত

দীর্ঘ ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালের স্থায়ী কোনো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। এমনকি এই দীর্ঘ সময়েও হাসপাতালের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি। তবে জমি অধিগ্রহণ ও ভবন নির্মাণ না হলেও অবকাঠামোহীন প্রস্তাবিত দুটি ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১২ চিকিৎসক, ১০ নার্সসহ অন্যান্য জনবল। চিকিৎসক থাকলেও শুধু ভবন না থাকায় নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল খ্যাত ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জের ৩০ লক্ষাধিক মানুষ বঞ্চিত সরকারি চিকিৎস সেবা থেকে।

জানা গেছে, ২০০৪ সালে ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জে দুটি ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার। ওই দুটি হাসপাতালের জন্য জমি অধিগ্রহণে জেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর ২০০৬ সালে জমি অধিগ্রহণ ও হাসপাতালের অবকাঠামো নির্মাণে অর্থও বরাদ্দ হয়। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াটি আর আলোর মুখ দেখেনি। যে কারণে হাসপাতাল দুটিও নির্মাণ হয়নি। তবে জমি অধিগ্রহণ কিংবা হাসপাতাল ভবন নির্মাণ না হলেও ২০১১ সালে ১২ জন চিকিৎসকসহ অন্যান্য জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে সিদ্ধিরগঞ্জে ছয়জন চিকিৎসকের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন চারজন, নার্সের পাঁচটি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন চারজন এবং অন্যান্য ১৩টি পদের মধ্যে কর্মরত একজন। এ ছাড়া বর্তমানে ফতুল্লায় ছয় চিকিৎসক পদের মধ্যে কর্মরত পাঁচজন, নার্সের পাঁচটি পদের মধ্যে কর্মরত তিন, অন্যান্য ১৩টি পদের মধ্যে কর্মরত একজন।

ফতুল্লার ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের প্রাতিষ্ঠানিক কোড ১০০০০৪২১ ও সিদ্ধিরগঞ্জ ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের প্রাতিষ্ঠানিক কোড ১০০০০৪২৩। অবকাঠামো না থাকায় এসব পদে নিয়োগপ্রাপ্তরা অন্যান্য সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাজ করছেন। জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানায়, আইনে রয়েছে যদি কোনো স্থানে অবকাঠামো না থাকে, তাহলে নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রেষণে অন্যত্র নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। তবে নিয়োগ প্রাপ্তদের নিয়মিত বেতন হয় না। উন্নয়ন খাতে যখন ফান্ড আসে তখনই তাদের বেতন হয়। এ জন্য এখানে যারা আসেন তারা ২-৪ মাস থেকে অন্যত্র চলে যান।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে অসংখ্য গার্মেন্ট, টেক্সটাইল মিল, স্পিনিং মিল, রিরোলিং মিলসহ সহস্রাধিক শিল্পকারখানায় ১০ লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মরত। ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীর ৭১৪টি প্লটের সবগুলোতেই গড়ে উঠেছে শিল্পকারখানা। ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীতেই কাজ করছেন ৩ লক্ষাধিক শ্রমিক। আদমজী ইপিজেডেও গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক শিল্পকারখানা। সেখানে কাজ করছেন পৌনে ১ লাখ শ্রমিক। এ দুটি অঞ্চলের বাসিন্দাদের চিকিৎসার জন্য কোনো সরকারি হাসপাতাল না থাকায় সামান্য অসুখেও তাদের নির্ভর করতে হয় প্রাইভেট চিকিৎসার ওপর। ছুটতে হয় শহর অভিমুখে। 

ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জের সাধারণ মানুষের দাবি, এখানে সরকারি হাসপাতাল নির্মাণ। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজাহারুল ইসলাম মান্নানও জাতীয় সংসদে সিদ্ধিরগঞ্জে হাসপাতাল নির্মাণের প্রসঙ্গ তুলেছেন।

স্থানীয় শ্রমিকরা জানান, ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জের মোট জনসংখ্যার বেশির ভাগই শ্রমিক। কম খরচে চিকিৎসার জন্য তাদের যেতে হয় শহরের দুটি হাসপাতালে নয়তো রাজধানীতে। সড়কপথে প্রতিনিয়ত যানজটের কারণে দেরি হওয়ায় আহতদের অনেকেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না।

ফতুল্লা থানা বিএনপি নেতা রুহুল আমিন জানান, ২০০৩ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নারায়ণগঞ্জে একটি সমাবেশে এলে আমরা ফতুল্লায় হাসপাতাল নির্মাণের দাবি জানাই। পরে তিনি ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জে দুটি ২০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের অনুমোদন দিয়ে অর্থও বরাদ্দ দেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের শাসনামলে হাসপাতাল দুটি বাস্তবায়ন হয়নি। তাই বর্তমান সরকারের কাছে দ্রুত হাসপাতাল নির্মাণের জন্য অনুমোদন দেওয়ার দাবি জানাই।

সিদ্ধিরগঞ্জের আটি এলাকার বাসিন্দা মো. ফারুক এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আমরা বরাবরই সরকারি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। সিদ্ধিরগঞ্জবাসীকে যেকোনো অসুখে ছুটতে হয় ৩০০ শয্যা হাসপাতাল নয়তো প্রাইভেট ক্লিনিকে।’

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মুশিউর রহমান জানান, গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জে দুটি ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণের বরাদ্দ এলেও জমি অধিগ্রহণ না হওয়ায় অবকাঠামো নির্মাণ হয়নি। জনবল নিয়োগ হলেও ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জবাসী সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা পায়নি। এখন যদি সরকার জমি অধিগ্রহণ করে অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেয়, তাহলে হাসপাতাল দুটির কার্যক্রম চালু করা সম্ভব।