পাবনার চাটমোহর উপজেলার চলনবিল অঞ্চলের কাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন একটি ব্রিজের উচ্চতা কম হওয়া নিয়ে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মাঝে। ব্রিজের উচ্চতা কম হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে নৌকা, বাল্কহেড, পণ্যবাহী ট্রলার এবং পর্যটকবাহী বড় নৌকা চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্রিজের নির্মাণকাজ স্থগিত, নকশা সংশোধন ও উচ্চতা বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট আট কর্মকর্তা বরাবর আইনি নোটিশ (জাস্টিস ডিমান্ড নোটিশ) পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী।
অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবিÑস্থানটি বিআইডব্লিউটিএ-এর নির্ধারিত নৌ চ্যানেল নয়। নকশা ও উচ্চতার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন মহলের সরেজমিন পরিদর্শন শেষে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আইনি নোটিশ সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বৃহত্তর পাবনা ও বগুড়া জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২ (এচইজওউচ-২)-এর আওতায় ছাইকোলা ইউপি হতে হান্ডিয়াল ইউপি অফিস সড়কের মুনিয়াদিঘী কৃষি কলেজের নিকট কাটা নদীর ওপর ৮৮.১০ মিটার দীর্ঘ পিএসবি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকারও বেশি চুক্তি মূল্যের এই কাজটি বাস্তবায়ন করছে আইসিএল প্রাইভেট লিমিটেড-ওসি (জেভি) নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
গত (১০ আগস্ট) এলাকাবাসীর পক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আব্দুল লতিফ স্থানীয় সরকার সচিব, পানি সম্পদ সচিব, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী, বিআইডাব্লিউটিএ চেয়ারম্যান, পাবনা জেলা প্রশাসক ও চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ আটজনকে এই নোটিশ পাঠান।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, কাটা নদী দিয়ে প্রতিদিন এলাকার কৃষি পণ্য, গবাদিপশুর খাদ্য (খড়), বালু-পাথর বহনকারী ট্রলার এবং চলনবিলে ভ্রমণ করতে আসা পর্যটকদের বড় বড় নৌকা চলাচল করে। ব্রিজের প্রস্তাবিত উচ্চতা বজায় রেখে কাজ শেষ হলে এসব নৌযান চলাচল স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে, যা পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ ও বিআইডব্লিউটিএ নীতিমালার পরিপন্থী। অবিলম্বে নির্মাণকাজ স্থগিত রেখে এলজিইডি ও বিআইডব্লিউটিএ-এর যৌথ দল দিয়ে এলাকা পরিদর্শনের পর ব্রিজের নকশা সংশোধনের দাবি জানানো হয় নোটিশে।
এ বিষয়ে নোটিশদাতা আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল লতিফ বলেন, আমি এই এলাকার সন্তান হিসেবে নাগরিক দায়িত্ব থেকে নোটিশটি পাঠিয়েছি। নিম্ন উচ্চতার ব্রিজের কারণে এলাকার জীবন-জীবিকা ও নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে পড়বে। দ্রুত নকশা সংশোধন না করা হলে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে।
নৌকার মাঝি নবীর উদ্দিন বলেন, বর্ষাকালে এই কাটা নদী দিয়েই আমরা উত্তরের এলাকা নাটোরের সিংড়া, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ সহ চলনবিলের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় পণ্য ও যাত্রী আনা নেওয়া করে থাকি। এতে করে খরচ ও সময় দুটোই কম লাগে। তবে এখানে যে উচ্চতায় ব্রিজের ঢালাই বা কাজ হচ্ছে, তাতে পানি একটু বাড়লেই ছৈ তোলা নৌকা বা পর্যটকদের পিকনিকের বড় ট্রলার ব্রিজের নিচে আটকে যাবে। ব্রিজ যদি আমাদের যাতায়াতের পথই বন্ধ করে দেয়, তাহলে এই ব্রিজ দিয়ে আমরা কী করব?
স্থানীয় বাসিন্দা রাহিম বলেন, আমাদের এই অঞ্চলটা কৃষি ও গবাদিপশু পালনের জন্য বিখ্যাত। মাঠ থেকে ধান ও গরুর খড় বোঝাই করে নৌকায় করে হাটে-বাজারে নিয়ে যেতে হয়। খড়ের নৌকা অনেক উঁচু থাকে। ব্রিজের উচ্চতা না বাড়ালে নৌকায় খড় পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। তখন বিকল্প রাস্তায় যাতায়াত করতে গেলে খরচ দ্বিগুণ বেড়ে যাবে।
হান্ডিয়ালের স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আলীম বলেন, আমরা ব্রিজের বিরোধী নই, এই এলাকার ফসলি জমি নদীর ওপার হওয়ায় নৌকায় করে ফসল আনা নেওয়া করতে হয়, এতে করে খরচ আর ভোগান্তি দুটোই বেড়ে যায়। এছাড়াও এই নদীর ওপারে নবীন চড় নবীন সহ কয়েকটি গ্রামের মানুষ চলাচল করে থাকে। বর্ষা মৌসুমে তারা নৌকায় চলাচল করলেও বিল থেকে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাদা মাটির সড়ক দিয়ে মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া সহ স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী সহ পথচারীদের চলাচলে নানান ভোগান্তির সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, আমাদের এলাকায় এই ব্রিজটি খুবই প্রয়োজন, তবে আমরা টেকসই উন্নয়ন চাই। নদীর নাব্যতা আর নৌ-চলাচল বন্ধ করে এমন নিচু ব্রিজ নির্মাণ করা হলে চলনবিলে নৌ চলাচল হুমকির মধ্যে পরবে।
এলজিইডি কর্মকর্তারা বলছেন এটা নৌ চ্যানেল না, কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এই নদী দিয়ে শত শত নৌকা চলছে এটা কি তারা এসে দেখেননি? তাই অবিলম্বে ব্রিজের নকশা বদলে উচ্চতা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হালিম বলেন, চলনবিলের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া গুমানী, আত্রাই, বড়াল, কাটা নদী সহ যে কয়েকটি নদী আছে সব-কটি নদীর ব্রিজ অনেক উঁচু হয়েছে শুধু এই ব্রিজটিই নিচু হয়েছে। তাই নৌকা চলাচলের উপযোগী করে ব্রিজটি নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
ওহি কনস্ট্রাকশনের সাইড ইঞ্জিনিয়ার হৃদয় হোসেন বলেন, ব্রিজের কাজটি নকশা অনুযায়ী করা হচ্ছে। ব্রিজটি দুই বছর নজরদারিতে থাকবে। যদি নৌকা চলাচলে সমস্যা হয় তাহলে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্রিজটি উঁচু করার সুযোগ রয়েছে।
তবে ব্রিজের উচ্চতা নিয়ে স্থানীয়দের আপত্তির কথা স্বীকার করলেও এলজিইডির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এতে কোনো নিয়ম ভঙ্গ করা হয়নি।
এলজিইডির উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দল সরেজমিনে পরিদর্শন করে নকশা ও উচ্চতা সঠিকভাবে বাস্তবায়নের সবুজ সংকেত দিয়েছেন তারা।
এবিষয়ে পাবনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, কাটা নদীর এই নৌ পথটি বিআইডব্লিউটিএর স্বীকৃত কোনো নৌ চ্যানেল নয়। এলজিইডির নির্ধারিত পরিমাপ ও নীতিমালা মেনেই কাজটি সম্পূর্ণ হচ্ছে। এর পরেও আমরা স্থানীয়দের দাবির বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলে পরবর্তীতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।