বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান মহারণ: ঐতিহ্যের বিপরীতে শক্তির লড়াই

হকি মাঠের রোমাঞ্চ আর উত্তেজনার কথা উঠলেই ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথের সমকক্ষ দ্বিতীয় কিছু খুঁজে পাওয়া ভার। তবে সময়ের পরিক্রমায় দুই দেশের শক্তির ভারসাম্যে বিস্তর ফারাক তৈরি হলেও, হকি বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মঞ্চে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াই এখনো সমান উত্তাপ ছড়াচ্ছে। নেদারল্যান্ডসের আমস্টেলভীনের ঐতিহাসিক ওয়াগনার স্টেডিয়ামে পুল ‘ডি’-এর এই বাঁচা-মরার লড়াই কেবল একটি ম্যাচ নয়, বরং দুই দেশের সম্মান ও সেমিফাইনালের টিকিট পাওয়ার এক চূড়ান্ত লড়াই।

পরিসংখ্যানের পাতায় সাম্প্রতিক সময়ে সম্পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করে আছে ভারত। ২০১৬ সালের পর গত এক দশকে পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলা শেষ ১৯টি ম্যাচের ১৭টিতেই জয় তুলে নিয়েছে তারা। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে কিটব্যাগ ফেলে আসার মতো মাঠের বাইরের নানা অব্যবস্থাপনা ও আধুনিক হকি সংস্কৃতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে পাকিস্তান হকি দল যথেষ্ট পিছিয়ে পড়েছে। তবে এই পরিসংখ্যান ও অতীত গৌরবকে পাত্তয়া দিতে নারাজ দুই শিবিরের শিবির।

ম্যাচটির গুরুত্ব তুলে ধরে ভারতের প্রধান কোচ ক্রেগ ফুলটন বলেন, ‘আমাদের মধ্যে সবসময়ই এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে; সেটা কখনোই টেবিল থেকে মুছে যায় না। ভারতীয় দলের গর্বিত কোচ হিসেবে আপনি যখনই পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলবেন, জিততে চাইবেন। এটাই স্বাভাবিক।’ একই সঙ্গে প্রতিপক্ষকে নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি যোগ করেন, ‘একই সময়ে, তারা তাদের কোচিংয়ে আরও বেশি বিনিয়োগ করছে এবং পাকিস্তানের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা উন্নত করার চেষ্টা করছে। তবে আমাদের নিজেদের স্টাইলেই খেলে যেতে হবে, নিশ্চিত করতে হবে যেন আমরা ক্লিনিক্যাল থাকি এবং তাদের কোনো ফ্রি গিফট না দিই, কারণ তারা শূন্য থেকে গোল তৈরি করতে পারে।’ 

অন্যদিকে, খাদের কিনারায় থাকা পাকিস্তানের জন্য এই ম্যাচটি টুর্নামেন্টে টিকে থাকার শেষ সুযোগ। দলের অভিজ্ঞতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে পাকিস্তানের অধিনায়ক আবু বকর মাহমুদ ম্যাচের আগে জানিয়েছেন, ‘ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার ম্যাচে র‍্যাঙ্কিং বা অতীত পারফরম্যান্স কোনো ম্যাটার করে না। ম্যাচ ডে-তে যে দল ভালো খেলবে তারাই জিতবে, এবং আমরা জানি আমাদের হকির জন্য এই ম্যাচটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তাই আমরা কোনো ত্রুটি রাখব না।’ 

টুর্নামেন্টের সমীকরণ বলছে, দুই ম্যাচে তিন পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে থাকা ভারতকে সেমিফাইনালে এক পা বাড়াতে হলে কেবল একটি ড্র নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, এক পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তলানির দিকে থাকা পাকিস্তানকে টিকে থাকতে হলে জয়ের বিকল্প নেই। ভারতের অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার মনপ্রীত সিংও প্রতিপক্ষকে খাটো করে না দেখার হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি ভালো হবে, তবে আমরা তাদের অবমূল্যায়ন করছি না। তাদের ভালো ড্র্যাগফ্লিকারাও আছে, তাই আমাদের পেনাল্টি কর্নার দেওয়া এড়াতে হবে।’ 

৫৩ বছর আগে এই ওয়াগনার স্টেডিয়ামেই ১৯৭৩ সালের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ভারত ১-০ গোলে পাকিস্তানকে হারিয়েছিল। দীর্ঘ ৫ দশক পর সেই ঐতিহাসিক ভেন্যুতেই ফের মুখোমুখি হচ্ছে দুই পরাশক্তি। ১০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই স্টেডিয়ামের সব টিকিট এরই মধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। অতীতের তিক্ততা, বর্তমানের সমীকরণ এবং গ্যালারির উপচে পড়া দর্শকের উন্মাদনা সবমিলিয়ে হকিপ্রেমীদের জন্য এক রোমাঞ্চকর সন্ধ্যার অপেক্ষায় পুরো বিশ্ব।