প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু গানের মূল প্রাণ লুকিয়ে আছে শেকড়েই

সা  ক্ষা  ৎ  কা  র

সজীব দাশ

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা গানের ভুবনে নীরবে সুরের জাদু ছড়িয়ে যাচ্ছেন গুণী সংগীত পরিচালক সজীব দাশ। সুরের পরিচ্ছন্নতা ও মেলোডির বৈচিত্র্যের কারণে সংগীতাঙ্গনে তার রয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি। কিংবদন্তি সুরস্রষ্টা লাকী আখন্দের স্নেহধন্য এই মিউজিশিয়ান ইতিমধ্যে পাঁচ শতাধিক মৌলিক গান, নাটক ও বিজ্ঞাপনের সুর করেছেন। দুই যুগের দীর্ঘ সংগীতজীবন ও বর্তমান ব্যস্ততা নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারেক আনন্দ

সংগীত পরিচালক হিসেবে দুই দশকের পথচলা। পেশাদার সূচনাটা কীভাবে হয়েছিল?

সংগীতে সিরিয়াস চর্চা শুরু নব্বইয়ের দশকে। সংগীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ২০০৫ সালে। শুরুতে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত ও কিছু রিমেক গান করতাম। এরপর ২০০৭ সালে সাউন্ড গার্ডেনের পরিমল দাদার প্রস্তাবে প্রথম মৌলিক সুরের অ্যালবাম ‘পেন্সিলে আঁকা ছবি’ (সংগীতা থেকে প্রকাশিত) তৈরি করি। মহসিন মেহেদির লেখায় ও নীরবের কণ্ঠে ‘ভালোবাসি তোমার ওই রোদ্দুর হাসি’ গানটি দিয়ে সুরকার হিসেবে যাত্রা শুরু। গানটি তখন এফএম রেডিও ও নাটকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কোনো মিউজিক ভিডিও ছাড়াই শ্রোতাদের ভালোবাসা কুড়িয়েছিল গানটি।

ক্যাসেট, সিডি থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সংগীতের সেরা সময় কোনটা বলে মনে করেন?

গান তো কেবল সাউন্ড, টেকনোলজি নয়, এটি অনুভূতির আদান-প্রদান। সুরের মেধা, লিরিক্সের গভীরতা ও ভালোবাসার বিচারে ক্যাসেট ও সিডির যুগটাই ছিল আমাদের সংগীতাঙ্গনের স্বর্ণযুগ। তখন পুরো অ্যালবাম শোনার যে আনন্দ ছিল, তা শ্রোতার সঙ্গে গানের আত্মার সম্পর্ক গড়ে তুলত। অন্যদিকে, বর্তমান ডিজিটাল যুগের বড় সুবিধা হলো স্বাধীনতা। ঘরে বসেই নিজের সৃষ্টি বিশ্বের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু গানের মূল প্রাণ লুকিয়ে আছে শেকড়েই।

আপনার সংগীতে কিংবদন্তি লাকী আখন্দের প্রভাব স্পষ্ট। তার সান্নিধ্য পাওয়ার গল্পটা শুনতে চাই।

আমার সংগীতজীবনের সবচেয়ে বড় ভাগ্য, সংগীত গুরু লাকী আখন্দের ছাত্র হতে পেরেছি। আজিমপুর সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টারে থাকার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই তার পরিবেশনা দেখার সুযোগ হতো। ১৯৯৬ সাল থেকে তার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে শেখা শুরু। ১৯৯৯ সালে তার ‘হ্যাপি টাচ’ ব্যান্ডের হয়ে গিটার বাজাতে শুরু করি। দীর্ঘ দেড় যুগ তার সহকারী হিসেবে কাজ করেছি। ড্রামস লাইন, বেস লাইন বা কর্ড সেকশন কীভাবে সাজাতে হয়, তিনি আমাকে ধরে ধরে শিখিয়েছেন। মঞ্চেও গান গাওয়ার সুযোগ দিতেন। এমনকি আমার নিজস্ব স্টুডিওর শুভ উদ্বোধনও তিনি করেছিলেন।

আপনার সুর ও সংগীতে লাকী আখন্দের ধারার যে ছোঁয়া পাওয়া যায়, তা কতটা সচেতনভাবে এসেছে?

দেড় যুগের বেশি সময় গুরুর কাছে চর্চা করেছি, তার গান নিয়ে গবেষণা করেছি। প্রথম ৭-৮ বছর তিনি আমাকে গিটার ছাড়া অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্রে হাত দিতে দেননি। তিনি অফিসে গেলে লুকিয়ে তার কিবোর্ডে পিয়ানো বাজানোর চেষ্টা করতাম। পরে অনুমতি পেলেও পিয়ানো ছাড়া অন্য কিছু বাজানো বারণ ছিল। অবচেতনভাবেই হয়তো তার মেলোডির দর্শনটা আমার মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে। যদিও তার সৃষ্টির এক শতাংশও রপ্ত করতে পেরেছি কি না সন্দেহ!

চমৎকার গাইতে পারেন, অথচ সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে নেপথ্যেই রয়ে গেলেন, কেন?

গুরুর কাছে যখন সংগীত শিখতাম, তখন তার ডিরেকশন দেওয়ার স্টাইল আমাকে মুগ্ধ করত। তখনই মনে হতো, একদিন আমিও এভাবে মিউজিক ডিরেকশন দেব। সোজা হিসাব, সবাই যদি গায়ক হয়ে যায়, তবে গান লিখবে ও সুর করবে কে? তবে নিজের আনন্দের জন্য মাঝে মাঝে দু-একটি গানে কণ্ঠ দিয়ে থাকি।

এ পর্যন্ত সুর ও সংগীত পরিচালনা করা কাজের সংখ্যা কত? প্রিয় কাজ কোনটা?

মৌলিক গান, নাটক, বিজ্ঞাপন ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক কাজ করা হয়েছে। এত কাজের মধ্যে নির্দিষ্ট করে এগিয়ে রাখা কঠিন। তবে গুণী শিল্পী ও গীতিকবিদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়াটাই আমার বড় প্রাপ্তি। শ্রদ্ধেয় শিল্পী ফাহমিদা নবী ও গীতিকবি গোলাম মোর্শেদ ভাইয়ের অবদান এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। ফাহমিদা আপার জন্য প্রায় ৪০টি গান সুর করেছি।

বর্তমানে কী নিয়ে ব্যস্ততা যাচ্ছে?

‘গান জানালা’র ব্যানারে গীতিকবি গোলাম মোর্শেদের লেখায় এবং আমার সুরে ফাহমিদা নবী, সাব্বির জামান, সৈয়দা শম্পা, অপু আমান ও অয়ন চাকলাদারের বেশ কিছু গান আসছে। পাশাপাশি লাকি ভাইয়ের কিছু অপ্রকাশিত সুরের সংগীত পরিচালনা করছি। রাইসা খানের কণ্ঠে একটি গান আসবে, যা নিয়ে আমি বেশ আশাবাদী। এছাড়া আসিফ ইকবাল বিদ্যুতের লেখায় মৌটুসি খানের সঙ্গে আমার একটি দ্বৈত গান ‘বিরহের কাব্য’, আরজে রাজুর লেখা ও কণ্ঠে গান, আবদুল্লাহ আল মামুনের লেখায় প্রিয়ঙ্কা দাসের গান এবং সুরকার তানিম হায়াৎ খান রাজিতের সুর করা ১৫টি গানের সংগীত পরিচালনার কাজ সম্পন্ন করেছি।