দেশের অর্থনীতিতে সমস্যা অনেক। এর স্পষ্ট প্রভাব পড়েছে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে। নতুন বিনিয়োগ নেই, কর্মসংস্থান স্থবির। বিশেষ করে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্পের গতি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি এখন জ্বালানি সংকট অর্থনীতির নয়া বিষফোড়া হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে বাজেটে নেওয়া পদক্ষেপ ইতিবাচক বিবেচিত হলেও জ্বালানি সংকট ও ব্যাংকিং খাতের সমস্যা নিরসন করতে না পারলে সরকার অভীষ্ট লক্ষমাত্রা অর্জন করতে পারবে না। পুরো জাতিকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্ভোগে পড়তে হবে। তখন সরকারের জন্য পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ আরও চ্যালেঞ্জিং হবে।
গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠন করা বিএনপি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত লুণ্ঠিত অর্থনীতি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা জাতির সামনে উপস্থাপন করে। সরকারের ৬ মাস বা ১৮০ দিনের সার্বিক ওই অগ্রাধিকার পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় গত জুনে একটি গণমুখী বাজেট পেশ করে, অর্থনীতিবিদরাও তার প্রশংসা করেন। তবে একইসঙ্গে তারা মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতেও সতর্ক করেন। এ ছাড়া শিল্পে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ ও সুযোগ সৃষ্টি করে কর্মসংস্থান ও সাধারণের আয়বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে না পারলে বাজেট অর্থবহ হবে না জানান তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা যায়, রপ্তানি আয়ে উন্নতি না হওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। সরকারের চলতি মূলধন হিসেব বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স ১৫৬ কোটি মার্কিন ডলার নেতিবাচক হয়ে পড়েছে। তবে, গত ৬ মাসে প্রবাসী আয় কিছুটা বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও উন্নতি হয়েছে। কিন্তু জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে। চব্বিশের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর এবং বিএনপি সরকারের ৬ মাসে জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সঠিক পরিকল্পনা জাতি পায়নি। পরিণতিতে জ্বালানি সংকট এখন প্রায় শিল্পের চাকা পুরো বন্ধ করে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক শিল্প-কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।
বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. একে এনামুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি ও ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাটের পর একটি পর্যুদস্ত অর্থনীতি পেয়েছে বিএনপি সরকার। তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাজেটে অনেক ইতিবাচক নীতিমালা ও কর্মসূচি আছে। তবে অর্থনীতিতে বাজেটে গৃহীত কর্মসূচির প্রভাব দৃশ্যমান হতে আরও ৩ মাস সময় লাগবে। কিন্তু দুশ্চিন্তার বিষয় হলো অর্থনীতিতে একটি নয়া বিষফোঁড়া দেখা দিয়েছে, তা হলো জ্বালানি সংকট। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাত পূর্ণ সচল করতে সরকারের আর্থিক সহায়তার কর্মসূচি থাকলেও এই জ্বালানি সংকটের কারণে ইকোনোমি মুভ করবে না। কারণ, বিনিয়োগকারীরা দেখবে যে, জ্বালানি না থাকলে বিনিয়োগ ব্যর্থ হবে।
বিআইডিএস মহাপরিচালক বলেন, এই মুহূর্তে জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকারকে একটি পরিষ্কার স্বল্পমেয়াদি নীতি ঘোষণা করতে হবে যাতে বিনিয়োগকারীরা অন্তত ভরসা করতে পারে যে, সংকট নিরসনে সরকার কাজ করছে। অর্থনীতি সচল করতে হলে রাজনৈতিক বক্তব্য না দিয়ে সরকারকে একটি অর্থবহ পরিকল্পনা প্রকাশ করে বিনিয়োগকারীদের স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যেন হতাশ না হয়।
এ প্রসঙ্গে ড. এনামুল হক আরও বলেন, ব্যাংক খাতে মানুষের আস্থা নেই। ফলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থসংকট তৈরি হতে পারে। তখন বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকের কাছে অর্থ পাওয়া যাবে না। এখানে রেগুলেটর (বাংলাদেশ ব্যাংকের জনবল) দিয়ে ব্যাংক চালানো হচ্ছে। এই ‘এডহক ব্যবস্থা’র অবসান করে পেশাদার ব্যাংকার দিয়েই ব্যাংক চালাতে হবে। ব্যাংকের আমানতকারীর গোপনীয়তাসহ সবধরনের সুরক্ষা দিতে হবে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ব্যবসা ও বিনিয়োগের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। তাই এ খাতের অসুস্থতা নিরাময়ে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানও জ্বালানি সংকট নিরসনে একটি স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট একটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে, এই সংকট উত্তরণে সরকার চেষ্টা করছে। স্পট প্রাইস দিয়ে জ্বালানি কিনছে। যদিও এ প্রক্রিয়া খুবই ব্যয়বহুল। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি দেশ থেকে এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়াও হাতে নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিও করা হয়েছে।
অধ্যাপক মোস্তাফিজ আরও বলেন, জ্বালানির এই তীব্র সংকট বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। কারণ, বহুদিন বাপেক্স কাজ করেনি। অফশোর, অনশোর, নিয়ারশোর ড্রিলিং করা হয়নি। আমরা আগে দেখেছি, ড্রিলিং করতে আন্তর্জাতিক বিডিংয়ে কোনো কোম্পানি অংশ নেয়নি। এবার কিছু কিছু কোম্পানি এসেছে। এটিকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে হবে যেন নিজস্ব তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সাফল্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা না থাকলে দেশের অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব গভীর হবে। ভোক্তা থেকে শুরু করে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, উৎপাদক সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সরকারকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিতে হবে। স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা সবসময়ই ব্যয়বহুল হয়। সেজন্য মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদের কথা ভাবতে হবে। প্রয়োজনে ভারত ও নেপাল থেকে আরও বেশি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, জ্বালানি সংকটে শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে রপ্তানি আয়ে ধস নামবে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।