লজ্জা না থাকলে যা ইচ্ছা তাই করা যায়

লজ্জা ইমানের অঙ্গ। প্রশংসনীয় মানবীয় গুণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইমানের সত্তরের বেশি শাখা রয়েছে। এগুলোর মাধ্যে সর্বোত্তম হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা এবং সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া। আর লজ্জা ইমানের একটি শাখা।

লজ্জাশীলতা মানুষের অন্তরের এমন এক অবস্থা, যা তাকে পাপকাজ থেকে বিরত রাখে এবং পরিশুদ্ধ ও সুন্দর করে। এটি মুমিনের অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি চরিত্র। এর মাধ্যমে সে রবের অধিকার আদায় করতে উদ্বুদ্ধ হয়। রবের আদেশের প্রতি যত্নশীল হয় এবং তার অবিরাম নেয়ামত ও অঢেল অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। আবার এই লজ্জাশীলতাই তাকে অন্যায় ও ভ্রষ্টতা থেকে বিরত রাখে। কারণ সে তার সেই রবের নজরদারি অনুভব করে, যিনি তাকে দেখেন এবং তার গোপন ও অন্তরের কথাও জানেন। যে ব্যক্তি লজ্জাশীলতার গুণে সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়, সে এমন অনেক কল্যাণ অর্জন করে, যা অন্যদের মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যায়।

লজ্জাশীলতা ছাড়া পূর্ণ মুসলিম হওয়া সম্ভব নয়। কারণ একজন মুসলিমকে এমন সব কাজে চেষ্টা করতে বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে তার দ্বীন ও ব্যক্তিত্ব পূর্ণতা লাভ করে এবং সে তার রবের ইচ্ছানুযায়ী ইবাদত করতে পারে। মহান আল্লাহ তাকে অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় স্বতন্ত্র করেছেন বুদ্ধি দিয়ে। তিনি তাকে নিজের পক্ষ থেকে ভালো ও মন্দের পথ চিনিয়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘শপথ প্রাণের এবং যিনি তাকে সুঠাম করেছেন তার। অতঃপর তিনি তাকে তার পাপাচার ও তার তাকওয়া সম্পর্কে জ্ঞান দিয়েছেন।’ (সুরা শামস ৭-৮)

লজ্জাশীলতা মূলত মানুষের স্বভাবের মধ্যেই সৃষ্টিগতভাবে বিদ্যমান। যে ব্যক্তি পাপে নিমজ্জিত হয়, সে ছাড়া কেউ লজ্জার স্বাভাবিক অবস্থা থেকে বিচ্যুত হয় না। পাপের কারণে তার অন্তর্দৃষ্টি নষ্ট হয়ে যায়।

অন্যদিকে মুমিনের লজ্জাশীলতা সর্বদা উপস্থিত থাকে। যখন সে এমন কোনো কাজ করার কথা চিন্তা করে, যা তার রবের অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে, তখন তার লজ্জাশীলতা তাকে থামিয়ে দেয়। এটি তার দ্বীনের জন্য অপরিহার্য। আবার মানুষের কাছ থেকেও তার লজ্জাশীলতা থাকে। এই লজ্জাশীলতা তাকে এমন কোনো কাজ প্রকাশ্যে করতে বাধা দেয়, যা মানুষ অপছন্দ করে। মানুষ যে বিষয়গুলো গোপন রাখতে চায়, সেগুলোর দিকে তাকানো থেকেও তাকে বিরত রাখে। একইভাবে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় অবহেলা করা এবং প্রয়োজনের সময় ভাইদের সহযোগিতা না করা থেকেও তাকে বিরত রাখে। এটি তার ব্যক্তিত্ব ও মানবিক মর্যাদার জন্য অপরিহার্য। আর দ্বীন ও ব্যক্তিত্বের পূর্ণতার মাধ্যমেই মানুষের মানবিকতা পূর্ণতা লাভ করে। আর যার মধ্যে লজ্জা নেই, তার মধ্যে বাহ্যিক অবয়ব ছাড়া মানবিকতার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।

প্রকৃত মুমিন তার রবের মহত্ত্ব, নাম ও গুণাবলি এবং তার কর্মের পরিপূর্ণতা সম্পর্কে জ্ঞান থাকার কারণে তার সামনে লজ্জাবোধ করে। সে লজ্জাবোধ করে যে, আল্লাহ তার ওপর যে নেয়ামত দান করেছেন, সেগুলো ব্যবহার করে সে যেন তার অবাধ্যতা না করে। সে তার সৃষ্টিকর্তার বড়ত্বের সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা ও অক্ষমতা উপলব্ধি করে নিজের প্রতি লজ্জাবোধ করে।

লজ্জাশীলতা দুটি বিষয় উপলব্ধির ফল। প্রথমটি হলো আল্লাহর নজরদারি সম্পর্কে সচেতনতা। এটি বান্দাকে দ্বীনের সর্বোচ্চ মর্যাদায় অর্থাৎ ইহসানের স্তরে উন্নীত করে। বান্দা যখন উপলব্ধি করে যে, আল্লাহ তাকে দেখছেন এবং তার সবকিছু তার জ্ঞাত, তখন সে আল্লাহর এই বাণী স্মরণে রাখে, ‘সে কি জানে না যে, আল্লাহ দেখেন?’ (সুরা আলাক ১৪) আল্লাহ আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর পর্যবেক্ষক।’ (সুরা নিসা ১)

বান্দা যখন এই বিষয়টি উপলব্ধি করে এবং প্রতিটি কথা ও কাজের সময় আল্লাহকে নিজের সামনে উপস্থিত মনে করে, তখন তার রবের প্রতি লজ্জাশীলতা জন্ম নেয়। ফলে সে এমন কাজই করে, যা তাকে আল্লাহর নৈকট্য এনে দেয় এবং তার কাছে প্রিয় করে তোলে। আর এমন কোনো কাজ করে না, যা তাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং তার অসন্তুষ্টির কারণ হয়। সে এমন জায়গায় থাকে না, যেখানে তার রব তাকে থাকতে নিষেধ করেছেন এবং এমন জায়গাতেও তাকে পাওয়া যায় না, যেখানে তিনি তাকে যেতে নিষেধ করেছেন।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো নিজের ত্রুটি ও অপূর্ণতা সম্পর্কে সচেতনতা। বান্দা আল্লাহর অধিকার আদায় এবং তার আদেশ পালনে যতই চেষ্টা করুক না কেন, তবু সে নিজেকে অপর্যাপ্ত মনে করবে। কারণ তার রবের অধিকার তার ওপর আরও অনেক বেশি। বিশেষ করে সে যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে নিজের ওপর অর্পিত অগণিত নেয়ামতের কথা চিন্তা করে, তখন সে বুঝতে পারে, বান্দার জন্য যে পরিমাণ আনুগত্য ও দাসত্ব করা উচিত, সে তার তুলনায় যা করতে পারে, তা বহুগুণ কম।

যখনই আল্লাহর কোনো অধিকার কিংবা তার কোনো বান্দার অধিকার আদায়ের সময় আসে, তখন মুমিনের সামনে লজ্জাশীলতা উপস্থিত হয়। এটি তাকে তাড়িত করে এবং উৎসাহ দেয়, যতক্ষণ না সে তার ওপর অর্পিত অধিকার আদায় করে। আবার যখন কোনো ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি তাকে কোনো কামনার দিকে আহ্বান করে, তখনও লজ্জাশীলতা তার কাছ থেকে দূরে সরে যায় না। বরং তাকে সেই কামনা থেকে বিরত রাখে এবং তার ও সেই কামনার মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সে সেটার গভীর খাদে পতিত হয় না।

লজ্জাশীলতা কখনো মানুষের মধ্যে জন্মগতভাবে বিদ্যমান থাকে। আল্লাহ কোনো বান্দাকে এই স্বভাবের ওপর সৃষ্টি করেন। এটি বান্দার প্রতি আল্লাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। আবার লজ্জাশীলতা আত্মসংগ্রামের মাধ্যমেও অর্জন করা যায়। মানুষ নিজেকে লজ্জাশীলতার ওপর অভ্যস্ত করতে চেষ্টা করতে থাকে। এক সময় তা তার স্বভাবের অংশ হয়ে যায়। তখন তার অন্তর সব ধরনের অশোভন কাজ থেকে সংকুচিত হয় এবং সে সেগুলো পরিত্যাগ করে। একই সঙ্গে সে সব ধরনের উত্তম কাজের দিকে অগ্রসর হয় এবং সেগুলোকে নিজের অভ্যাস ও চরিত্রে পরিণত করে।

যার কাছ থেকে লজ্জাশীলতা ছিনিয়ে নেওয়া হয়, সে যা ইচ্ছা তাই করতে থাকে। সেসব ধরনের অশোভন কাজে লিপ্ত হয় এবং সব ধরনের অশ্লীলতায় জড়িয়ে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ পূর্ববর্তী নবীদের সর্বসম্মত উক্তিগুলো যা লাভ করেছে, সেগুলোর মধ্যে একটি হলো, যখন তোমার লজ্জা-শরম না থাকে, তখন তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পারো।’ (সহিহ বুখারি)

লজ্জাশীলতা এমন একটি চরিত্র, যা মানুষকে পাপ ও গুনাহ থেকে বিরত রাখার জন্য যথেষ্ট। ইমাম মুজাহিদ ইবনে জাবের (রহ.) বলেছেন, ‘মুমিনের মধ্যে যদি লজ্জাশীলতা ছাড়া আর কোনো গুণ না থাকে, তবুও তা তাকে পাপ থেকে বিরত রাখবে।’

যে ব্যক্তি নিজের লজ্জাশীলতা সংরক্ষণ করে, সে তার দ্বীনকেও সংরক্ষণ করে এবং নিজের মর্যাদা ও ব্যক্তিত্বের প্রতিও যতœশীল থাকে। ফলে আনন্দময় জীবন, সম্মানজনক জীবিকা এবং মানুষের সুন্দর প্রশংসা পাওয়ার জন্য সেই সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত।

আর যে ব্যক্তি নিজের লজ্জাশীলতা সংরক্ষণ করে না, সে তার দ্বীনকে নষ্ট করে, নিজের মর্যাদা ও ব্যক্তিত্বকে নষ্ট করে এবং তার স্বাভাবিক প্রকৃতি বিপর্যস্ত হয়ে যায়। তখন তার ক্ষতি পূর্ণতা লাভ করে।

১৪ আগস্ট শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান