বার্ধক্যে শরীর দুর্বল হয়ে আসে। কর্মক্ষমতা কমে যায়। অনেক কিছু আগের মতো সহজ থাকে না। যে মানুষটি একসময় পরিবারের সবার প্রয়োজন পূরণ করেছেন, বয়সের ভারে একসময় তিনিই অন্যের সহযোগিতার মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েন। তখন তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় ভালোবাসা, সম্মান, নিরাপত্তা ও আপনজনের সঙ্গ।
ইসলাম প্রবীণদের এই প্রয়োজনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের সম্মান করা, তাদের প্রতি কোমল আচরণ করা এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ দিয়েছে। বিশেষ করে প্রবীণ বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্বের বিষয়টি কোরআনে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন, তোমরা তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের উহ শব্দও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না। তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা ইসরা ২৩)
লক্ষ করার বিষয় হলো, আল্লাহ শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে নিষেধ করেননি। এমনকি বিরক্তি প্রকাশের সামান্যতম শব্দ ‘উহ’ বলতেও নিষেধ করেছেন। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে মানুষের শারীরিক দুর্বলতার পাশাপাশি মানসিক সংবেদনশীলতাও বেড়ে যেতে পারে। তাই তাদের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রেও সন্তানের দায়িত্ব হলো কোমলতা ও সম্মান বজায় রাখা।
প্রবীণদের প্রতি সম্মান শুধু বাবা-মায়ের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষদের প্রতিও ইসলামের বিশেষ শিক্ষা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের প্রতি সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সুনান আবু দাউদ)
এই হাদিসে ছোটদের প্রতি দয়া এবং বড়দের প্রতি সম্মানকে একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। মুসলিম সমাজে প্রজন্মগুলোর মধ্যে সম্পর্ক হবে মমতা ও সম্মানের। ছোটরা বড়দের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা গ্রহণ করবে। বড়রা ছোটদের প্রতি স্নেহশীল হবে। এভাবেই পরিবার ও সমাজে ভারসাম্য তৈরি হবে।
প্রবীণদের প্রতি সম্মানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। বয়সের কারণে কারও কথা অপ্রয়োজনীয় মনে করা উচিত নয়। জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা একজন প্রবীণকে এমন অনেক বাস্তব শিক্ষা দেয়, যা কেবল বই পড়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রবীণদের পরামর্শ নেওয়া তাদের মর্যাদা বাড়ায় এবং নতুন প্রজন্মকেও অভিজ্ঞতার আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয়।
প্রবীণদের আরেকটি বড় প্রয়োজন হলো সঙ্গ। বয়স বাড়লে অনেকেই কর্মজীবন থেকে অবসর নেন। সামাজিক যোগাযোগও কমে যায়। সন্তানরা নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তখন একই ঘরে থেকেও একজন প্রবীণ মানুষ নিজেকে একা মনে করতে পারেন। তার প্রয়োজন শুধু খাবার, পোশাক ও ওষুধ নয়। তার প্রয়োজন কেউ পাশে বসুক, কথা শুনুক, কুশল বিনয় করুক এবং তাকে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ হিসেবে অনুভব করাক।
আমাদের মনে রাখা দরকার, বার্ধক্য কারও জীবনের বাইরে থাকা কোনো বিষয় নয়। আজ যে বাবা-মা বৃদ্ধ হয়েছেন, একদিন আমরাও সেই বয়সে পৌঁছাব। আজ আমরা প্রবীণদের সঙ্গে যে আচরণ করছি, আগামী প্রজন্ম আমাদের কাছ থেকেও তেমন আচরণ শিখবে।
লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক