ভবিষ্যতের অজানা বিষয় জানতে মানুষ আগ্রহী হয়। এ কারণে কেউ কেউ জ্যোতিষী, গণক, বালুতে রেখা টেনে ভাগ্য গণনাকারী এবং রাশিচক্রের ভাগ্যের সঙ্গে নিজেদের জীবনকে সম্পৃক্ত করে। ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হয় এবং অন্যদেরও পথভ্রষ্ট করে। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে গিয়ে তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করল, সে মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর নাজিল করা বিষয়ের সঙ্গে কুফরি করল।’ (মুসনাদে আহমদ ৯৫৩২)
ইমাম তাহাবি (রহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি এমন কোনো বিষয় অনুসন্ধান করতে চায়, যার ব্যাপারে তাকে সতর্ক করা হয়েছে এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের কাছে আত্মসমর্পণে সন্তুষ্ট হয় না, তার সেই অনুসন্ধানের আকাক্সক্ষা তাকে বিশুদ্ধ তাওহিদ ও জ্ঞান থেকে আড়াল করে দেয়।’
হে মুসলিম সম্প্রদায়! এর বিপরীতে রয়েছে সত্য স্বপ্ন। এটি নবুয়তের ৪৬ অংশের এক অংশ। আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) থেকে এ বিষয়ে বিশুদ্ধ বর্ণনা এসেছে। জাগ্রত অবস্থায় যার কথা যত বেশি সত্য, তার স্বপ্নও তত বেশি সত্য। নবী (সা.) তার সাহাবিদের বলতেন, ‘তোমাদের কেউ কি কোনো স্বপ্ন দেখেছে?’ এরপর যার স্বপ্ন বর্ণনা করার ইচ্ছা হতো, সে তার কাছে তা বর্ণনা করত।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, সাহাবিদের কাছে নবীজি (সা.)-এর এ প্রশ্নের উদ্দেশ্য ছিল তাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা শেখানো এবং স্বপ্নের মর্যাদা ও এতে আল্লাহর ইচ্ছায় গায়েবের সংবাদ থাকার বিষয়টি বোঝানো।
ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, এতে স্বপ্নের বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া, তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যার মর্যাদার বিষয়টি রয়েছে।
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, স্বপ্নে বিভিন্ন উপমা ও দৃষ্টান্তের বিষয় থাকে। স্বপ্নে যে দৃষ্টান্ত দেখানো হয়েছে, ব্যাখ্যাকারী তার অনুরূপ কোনো বিষয়ের মাধ্যমে অর্থ বুঝতে চেষ্টা করেন এবং এক বিষয় থেকে তার সাদৃশ্যপূর্ণ অন্য বিষয়ের দিকে অর্থকে নিয়ে যান। এ কারণেই স্বপ্নের ব্যাখ্যাকে ‘তাবির’ বলা হয়।
শায়খ ইবনে সাদি (রহ.) বলেন, স্বপ্নের ব্যাখ্যার জ্ঞান শরিয়তসম্মত জ্ঞানগুলোর অন্তর্ভুক্ত এবং এটি ফতোয়ারও অন্তর্ভুক্ত। কারণ নবী ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘এভাবেই তোমার রব তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেবেন এবং তোমার ও ইয়াকুবের বংশধরদের ওপর তার নেয়ামত পূর্ণ করবেন।’ (সুরা ইউসুফ ৬)
অতএব, স্বপ্নের ব্যাখ্যার জ্ঞান শরিয়তসম্মত একটি জ্ঞান, যার নিজস্ব শরিয়তসম্মত নীতিমালা রয়েছে। দলিলগুলো এর যথার্থতার প্রমাণ দেয়। তাই জ্ঞান ছাড়া স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে যাওয়া বৈধ নয়। কারণ স্বপ্নের ব্যাখ্যা এক ধরনের ফতোয়া। এ বিষয়ে জ্ঞান ছাড়া কারও কথা বলা উচিত নয়।
ইমাম মালেক (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘প্রত্যেকেই কি স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পারে?’ তিনি বলেছিলেন, ‘তাহলে কি নবুয়ত নিয়ে খেলা হবে?’ স্বপ্নের ব্যাখ্যার বিষয়ে ইমাম মালেকের বক্তব্যের মূল মর্ম হলো, এটি এমন বিষয় নয়, যা নিয়ে যে কেউ জ্ঞান ও যোগ্যতা ছাড়া ব্যাখ্যা করতে পারে। কারণ স্বপ্ন নবুয়তের একটি অংশ। তাই এর সঙ্গে খেলাচ্ছলে আচরণ করা উচিত নয়।
স্বপ্ন তিন ধরনের হয়ে থাকে। প্রথম প্রকার হলো সত্য স্বপ্ন। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে। এটি নবুয়তের ৪৬ অংশের এক অংশ। এটি সত্য স্বপ্ন এবং সত্য সুসংবাদ।
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যদি এমন স্বপ্ন দেখে, যা সে পছন্দ করে, তবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। সুতরাং সে যেন এর জন্য আল্লাহর প্রশংসা করে এবং অন্যের কাছে তা বর্ণনা করে। আর যদি এর বিপরীত অপছন্দনীয় কিছু দেখে, তাহলে তা শয়তানের পক্ষ থেকে। তাই সে যেন এর ক্ষতি থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায়। আর কারও কাছে যেন তা বর্ণনা না করে। তাহলে এ স্বপ্ন তার কোনো ক্ষতি করবে না।’ (সহিহ বুখারি ৬৯৮৫)
সৎ স্বপ্ন মুমিনকে আনন্দিত করে এবং তাকে বিস্মিত করে। কিন্তু তাকে প্রতারিত করে না। এটি কল্যাণ ও প্রশান্তির বার্তা হয়ে আসে, যখন তা সত্য ও শরিয়তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। আর সৎ স্বপ্নে মানুষ আনন্দিত ও আশাবাদী হতে পারে। কিন্তু এর ওপর নির্ভর করা যায় না।
ইবনে আবদুল বার (রহ.) বলেন, সত্য স্বপ্নকে সত্য বলে গ্রহণ করা যথার্থ। এর মধ্যে মহান আল্লাহর প্রজ্ঞা ও অনুগ্রহের এমন নিদর্শন রয়েছে, যা মুমিনের ইমান আরও বাড়িয়ে দেয়। আল্লাহ তার রাসুলের স্বপ্নকে সত্য করে দেখিয়েছেন।
সত্য স্বপ্ন অবশিষ্ট সুসংবাদগুলোর অন্তর্ভুক্ত। এতে কল্যাণের সুসংবাদ থাকতে পারে এবং অকল্যাণ থেকে সতর্কবার্তাও থাকতে পারে। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আমার পরে নবুয়তের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, শুধু সুসংবাদগুলো ছাড়া।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘সুসংবাদগুলো কী?’ তিনি বললেন, ‘ভালো স্বপ্ন।’ (সহিহ বুখারি ৬৯৯০)
যে ব্যক্তি তার স্বপ্ন সত্য হওয়ার প্রত্যাশা করে, তার উচিত সত্যবাদিতা অবলম্বন করা, হালাল খাবার গ্রহণ করা, আল্লাহর নির্দেশগুলো মেনে চলা, তার নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকা এবং অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করা।
কোনো মুসলিম যদি এমন স্বপ্ন দেখে, যা সে পছন্দ করে, তাহলে সে আল্লাহর প্রশংসা করবে এবং তাতে আনন্দিত হবে। সে তার প্রিয়জনদের মধ্য থেকে এমন মানুষকে তা বলতে পারে, যারা তার আপনজন এবং জ্ঞান, মর্যাদা ও কল্যাণকামিতার অধিকারী। আলেম ব্যক্তির কাছে বলা হলে তিনি যথাসম্ভব তার জন্য কল্যাণকর ব্যাখ্যা করবেন এবং তাকে এমন বিষয়ের দিকে পথ দেখাবেন, যা তার উপকারে আসবে। আর প্রিয়জন যদি স্বপ্নের অর্থ জানেন, তাহলে তিনি তা বলবেন। আর যদি না জানেন, তাহলে নীরব থাকবেন।
এ কারণেই ইয়াকুব (আ.) তার পুত্র ইউসুফ (আ.)-কে বলেছিলেন, ‘হে আমার পুত্র! তুমি তোমার স্বপ্ন তোমার ভাইদের কাছে বর্ণনা করো না। তাহলে তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে।’ (সুরা ইউসুফ ৫)
আলেমরা বলেন, এই আয়াতের মধ্যে এ বিষয়ের মূলনীতি রয়েছে যে, স্বপ্ন এমন কারও কাছে বলা উচিত নয়, যে স্নেহশীল ও কল্যাণকামী নয়। এমন ব্যক্তির কাছেও বলা উচিত নয়, যে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানে না।
হাদিসে এসেছে, ‘তোমাদের কেউ যদি কোনো স্বপ্ন দেখে, তবে সে যেন তা কোনো আলেম অথবা কল্যাণকামী ব্যক্তির কাছেই বর্ণনা করে।’
স্বপ্নের দ্বিতীয় প্রকার হলো শয়তানের পক্ষ থেকে আসা স্বপ্ন। আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘সত্য স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং দুঃস্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে।’ (সহিহ বুখারি ৬৯৮৪)
সুতরাং কোনো মুসলিম যদি এমন স্বপ্ন দেখে, যা সে অপছন্দ করে, তাহলে সে স্বপ্নের অনিষ্ট থেকে তিনবার আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে। সে তার বাম দিকে তিনবার হালকা থুতু ফেলবে। এরপর উঠে নামাজ পড়বে। যে পাশে শুয়ে ছিল, সেই পাশ পরিবর্তন করে অন্য পাশে ফিরে শুবে। আর সে স্বপ্নটি কারও কাছে বর্ণনা করবে না।
অতএব, অপছন্দনীয় ও ভীতিকর স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। এ ধরনের স্বপ্ন নিয়ে কারও সঙ্গে কথাও বলা উচিত নয়।
স্বপ্নের তৃতীয় প্রকার হলো অন্তরের কথাবার্তা বা মনের চিন্তার প্রতিফলন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘স্বপ্ন তিন প্রকার। একটি সত্য (সৎ) স্বপ্ন। একটি হলো মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের কথাবার্তার প্রতিফলন। আর একটি হলো শয়তানের পক্ষ থেকে দুঃখ ও ভয় সৃষ্টি করার স্বপ্ন।’ (সুনানে তিরমিজি ২২৭০)
মানুষ জাগ্রত অবস্থায় জীবনের নানা বিষয় নিয়ে চিন্তা করে। পড়াশোনা, ব্যবসা, পরিবার কিংবা জীবনের অন্য কোনো বিষয় তাকে ভাবিয়ে তুলতে পারে। এরপর সে যখন বিছানায় যায়, তখন ঘুমের মধ্যে এসব বিষয়ই দেখতে পারে। আলেমরা এটিকে এলোমেলো স্বপ্ন বা অগোছালো স্বপ্ন বলে থাকেন।
স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ ইজতিহাদি বিষয়। এতে ভুলও হতে পারে, সঠিকও হতে পারে। তাই কোনো স্বপ্নের ব্যাখ্যা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়। কোনো ব্যাখ্যাকারীর ব্যাখ্যাও নিশ্চিত ও অকাট্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
নবীজি (সা.) যখন আবু বকর (রা.)-কে একটি স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে দিয়েছিলেন, তখন ব্যাখ্যার পর তিনি আবু বকর (রা.)-কে বলেছিলেন, ‘তুমি কিছু অংশ সঠিক বলেছ এবং কিছু অংশ ভুল করেছ।’
স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারীর কিছু গুণ থাকা প্রয়োজন। তাকে হতে হবে চরিত্রের দিক থেকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন। তাকে হতে হবে আমানতদার, সত্যবাদী ও সুদৃঢ় জ্ঞানের অধিকারী। তার জীবনযাপন সুন্দর হতে হবে। তার চিন্তাভাবনা সঠিক হতে হবে। তার পথ হতে হবে প্রশংসনীয়।
তাই অজ্ঞদের কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া উচিত নয়। যার জ্ঞান অল্প কিংবা যার দ্বীন দুর্বল, তার কাছেও স্বপ্নের ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত নয়।
স্বপ্ন কোনো কিছু গ্রহণ করার উৎস নয়। এটি শরিয়তের বিধান প্রণয়নের উৎসও নয়। স্বপ্নের মাধ্যমে কোনো বিষয়কে হালাল বা হারাম সাব্যস্ত করা যায় না। স্বপ্নের মাধ্যমে শরিয়তের কোনো বিধান প্রতিষ্ঠিত হয় না। কারণ মহান আল্লাহ দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছেন এবং ওহি বন্ধ হয়ে গেছে। মুহাম্মদ (সা.) পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার আগে সুস্পষ্টভাবে আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
১৪ আগস্ট শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান।