খেলাপি আদায়ে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা বাড়ানোয় জোর

খেলাপি ঋণ আদায় বাড়াতে নতুন পদক্ষেপ নিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ঋণসংক্রান্ত মামলার জট কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থায় মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির আহ্বান জানানো হয়েছে। এ জন্য একটি নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আওতায় যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাসম্পন্ন মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর)-এর জন্য মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তিকরণ সংক্রান্ত নীতিমালাটি জারি করেছে। ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারা এবং ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩-এর ৪১ ধারার প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ নীতিমালাটি জারি করা হয়েছে,  অবিলম্বে কার্যকরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে।

জানা গেছে, দেশের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশই এখন খেলাপি। প্রচলিত পদ্ধতিতে বিপুল পরিমাণের এই খেলাপি ঋণ আদায় সময়সাপেক্ষ এবং কঠিন। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন এডিআরে বাড়তি জোর দিচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্তির আহ্বান জানানো হয়েছে। যারা এই নীতিমালায় আওতায় দ্রুত খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

নীতিমালা অনুযায়ী, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে সংশ্লিষ্ট আইনে নিবন্ধিত হতে হবে। থাকতে হবে হালনাগাদ ব্যবসায়িক লাইসেন্স, আয়কর শনাক্তকরণ নম্বর এবং কমপক্ষে তিন বছরের ব্যবসায়িক বা পেশাগত অভিজ্ঞতা। প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদ, পৃথক মধ্যস্থতা ইউনিট, প্রয়োজনীয় জনবল এবং কার্যক্রম পরিচালনার নির্ধারিত পদ্ধতি থাকতে হবে।

প্রতিটি মধ্যস্থতাকারী প্যানেলে কমপক্ষে পাঁচজন সদস্য রাখতে হবে। এর মধ্যে একজন হিসাববিদ এবং একজন আইন বিশেষজ্ঞ থাকা বাধ্যতামূলক। মধ্যস্থতাকারীদের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আইন, হিসাব, নিরীক্ষা বা বিচারকাজে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তিকে মধ্যস্থতাকারী প্যানেলে রাখা যাবে না।

মধ্যস্থতা কার্যক্রমের জন্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কার্যালয়, মধ্যস্থতা কক্ষ, গোপন বৈঠক কক্ষ এবং নথি সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি অনলাইন মধ্যস্থতা, ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা এবং তথ্য সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও থাকতে হবে।

মধ্যস্থতাকারীদের দক্ষতা বাড়াতে প্রতি বছর অন্তত দুটি প্রশিক্ষণ ও একটি দক্ষতা উন্নয়ন কর্মশালা আয়োজন করতে হবে। এ ছাড়া প্রত্যেক মধ্যস্থতাকারীর জন্য বছরে ২০ ঘণ্টার ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার শর্ত দেওয়া হয়েছে। তালিকাভুক্তির জন্য আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ১০০ নম্বরের মধ্যে কমপক্ষে ৭০ নম্বর পেতে হবে। তালিকাভুক্তির মেয়াদ হবে তিন বছর। শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরবর্তী সময়ে তা নবায়ন করা যাবে। নীতিমালা লঙ্ঘন, অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রতারণা, গোপনীয়তা ভঙ্গ কিংবা মধ্যস্থতা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণœ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তি স্থগিত বা বাতিল করতে পারবে। 

নতুন এই নীতিমালা সম্পর্কে অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে আইনগত বিষয় নিষ্পত্তি সময়সাপেক্ষ। অর্থঋণ আদালতের কার্যক্রমও খুব বেশি গতিশীল নয়। ফলে এডিআর পদ্ধতির মাধ্যমে দ্রুত বিরোধ মীমাংসা করে ব্যাংকের আটকে থাকা অর্থ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। খেলাপি ঋণ আদায়ে এডিআর একটি সহায়ক পদ্ধতি হিসেবে কাজ করতে পারে।

তিনি বলেন, তবে ইচ্ছাকৃত খেলাপি এবং ভুয়া বা জাল কাগজপত্র দিয়ে ঋণ নেওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এডিআর কতটা কার্যকর হবে, সেটি একটি চ্যালেঞ্জ। কারণ ভুয়া দলিলপত্রের বিষয়ে আপস মীমাংসা কোনো কাজে আসে না।

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আদালতে মামলা করে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরিবর্তে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসা গেলে ঋণ আদায়ের গতি বাড়বে এবং উভয় পক্ষের সময় ও খরচ কমবে।

জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, জনতা ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ দ্রুত আদায়ে এডিআরকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। তবে শুধু এডিআর চালু করলেই হবে না, এর মাধ্যমে যাতে প্রকৃত অর্থে নগদ অর্থ আদায় হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য দক্ষ ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী, ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার আন্তরিকতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।

আমরা মনে করি, মামলা করার আগেই ঋণগ্রহীতার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ তৈরি করা গেলে অনেক ঋণ খেলাপি হওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।