রাষ্ট্রপতির শপথ

ক্রান্তিকালে অভিভাবকের ভূমিকা চায় মানুষ

গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রায় ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের অবসানের পর বাংলাদেশ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর প্রস্তুতির পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরছে, তবে ধীরে। বৈদেশিক মুদ্রায় বিপুল অর্থ পাচার হওয়ায় দেশের অর্থনীতি নানামুখী সংকটে পড়েছে। জ্বালানি সংকটে শিল্প ও রপ্তানি খাত ঝুঁকিতে। সংসদীয় গণতন্ত্র ও বিচারব্যবস্থায় আস্থা ফেরানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। দেশের এমন কঠিন সময়ে গতকাল শুক্রবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলেন প্রথিতযশা রাজনীতিক মির্জা ফখরুল ইসলামগীর। আমরা তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিকভাবে সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী তার ওপর অর্পিত ‘সকল ক্ষমতা প্রয়োগ এবং কর্তব্য পালন’ করার কথা। সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি ‘সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন’ হিসেবে নিজের কাছে প্রতীয়মান হয়, এমন সংসদ সদস্যকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। তিনি সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করেন এবং প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে অন্যান্য বিচারক নিয়োগ দেন।

রাষ্ট্রপতি পদটি ‘আলংকারিক,’ এমন ধারণা রাজনৈতিক পরিসরে বিরাজমান থাকলেও বাস্তবে এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সে দায়িত্বটি হলো রাষ্ট্রের অভিভাবকের। আমরা মনে করি, সংবিধানের বিধানের আওতায়, এমনকি সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং সুবিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিকভাবে ভূমিকা পালনের সুযোগ রাষ্ট্রপতির আছে। কীভাবে? সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮ এর দফা (৫) অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত বিষয়াদি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত রাখবেন এবং ‘রাষ্ট্রপতি অনুরোধ করলে যেকোনো বিষয় মন্ত্রিসভায় বিবেচনার জন্য পেশ করবেন’। সংবিধানের এই বিধানের আওতায় দেশের অভিভাবক হিসেবে আলংকারিক দায়িত্ব পালনের বাইরেও রাষ্ট্রপতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ আছে। 

পদের সাংবিধানিক ‘সীমাবদ্ধতায়’ নিজেকে আটকে ফেলা এবং দেশ ও মানুষের বৃহত্তর স্বার্থে অভিভাবকের দায়িত্ব পালনের সুযোগ কাজে লাগানোর মধ্যে কোনটি বেছে নেওয়া হবে তা অনেকটা নির্ভর করে রাষ্ট্রপতি পদটি অলংকৃত করার সুযোগ যাকে দেওয়া হলো এবং যারা দিলেন, তাদের উভয়ের ওপর। এখানেই নতুন রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে মানুষের আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে। একইসঙ্গে আগামী দিনগুলোয় সেই আশাবাদ বাস্তবায়নের সুযোগ আমরা দেখতে পাচ্ছি।

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের আগে মির্জা ফখরুলের রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে তৈরি করা, ধাপে ধাপে তার ওপরে উঠে আসা এবং ক্রান্তিকালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন এই আশাবাদের কারণ। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে তিনি প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে সরকারি চাকরিতে যেতে পারতেন। কিন্তু হলেন অর্থনীতির শিক্ষক। এরপর নিজের শহরে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রথম ধাপ পৌরসভায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনবার। মন্ত্রিসভায় ছিলেন। নিজ দলের দুঃসময়ে টানা ১৫ বছর মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১১১টি মামলা মোকাবিলা করতে হয়েছে তাকে। ১১ বার গ্রেপ্তার হয়েছেন। জেলে ছিলেন প্রায় সাড়ে তিন বছর। ৭৮ বছরে বয়সের এ মানুষটির অভিজ্ঞতা বিপুল। বিভক্তির রাজনীতির চর্চা যখন সর্বব্যাপী, তখন দলনির্বিশেষে প্রায় সবার পছন্দের মানুষ হয়েছেন প্রজ্ঞা, শালীনতা, সৌজন্যবোধ এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার জন্য।

আলংকারিক দায়িত্ব পালনের বাইরে গিয়ে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে রাষ্ট্রপতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারবেন, এর অনেকটা নির্ভর করে রাষ্ট্রের তিন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ নির্বাহী বিভাগ তথা সরকারের প্রধানমন্ত্রী, বিচার বিভাগ এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার ও সংসদ নেতার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির বোঝাপড়ার ওপর। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনানুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা দেওয়ার সুযোগ রাষ্ট্রপতির আছে। পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধার সম্পর্কের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে ও সংসদের বাইরের বিরোধী দল এবং নাগরিক সমাজ প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির কাছে গেছেন, এমন নজির নিকট অতীতেই আছে।

আমাদের আশা, মানুষের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনায় রেখে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগামী দিনে রাষ্ট্রের প্রকৃত অভিভাবকের ভূমিকা সূচারুভাবে পালন করবেন। আমরা তার সুস্বাস্থ্য ও সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করছি।