গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে ‘মোবাইল সাংবাদিকতা’কে যোগাযোগব্যবস্থার মাইলফলক হিসেবে দেখা হয়। দুর্গম এলাকার তথ্য সংগ্রহ এবং তথ্যপ্রবাহকে সহজ, দ্রুত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার হাতিয়ার হচ্ছে প্রতিবেদকের স্মার্টফোন। প্রযুক্তির অগ্রগতি, সাংবাদিকতার পরিসর বিস্তৃতির কথা ছিল। কিন্তু স্মার্টফোন যেন জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট সাংবাদিকতার চেয়ে, পরচর্চাকেন্দ্রিক সাংবাদিকতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার, তথাকথিত মোবাইল সাংবাদিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্মার্টফোন, ক্যামেরা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করছে নতুন ধারার কনটেন্ট-নির্ভর গোষ্ঠী। তাদের উদ্দেশ্য সংবাদ সংগ্রহ নয় বরং কাউকে অপ্রস্তুত, বিব্রতকর বা দুর্বল অবস্থায় ফেলে মুহূর্তকে ‘ভাইরাল কনটেন্ট’-এ পরিণত করা। কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে উসকানি, ব্যক্তিগত পরিসরে অনধিকার প্রবেশ আবার কখনো অসহায়ত্বকে প্রকাশ্যে এনে, অপমান করাই কনটেন্ট তৈরির কৌশল। অথচ প্রকৃত সাংবাদিকতার সঙ্গে যার সম্পর্ক নেই।
একজন সাধারণ নাগরিক, প্রকাশ্য স্থানের নানা মুহূর্ত রেকর্ড করতে পারেন। সাংবাদিকদের জনস্বার্থে জনপরিসরের ঘটনা ধারণ করতে হবে। কিন্তু সংকট তৈরি হয় তখন, যখন ক্যামেরার উদ্দেশ্য তথ্য সংগ্রহ বা বাস্তবতা তুলে ধরা নয় বরং কাউকে হেয়, অপমান কিংবা ভাইরাল কনটেন্টে পরিণত করা। এই জায়গায়ই তথাকথিত মোবাইল সাংবাদিকতার অপব্যবহার এবং ট্র্যাপার সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উভয় ক্ষেত্রে নির্বাচিত ফ্রেম বাস্তবতাকে ব্যাখ্যার চেয়ে, মানুষকে বিব্রত করতে বেশি ব্যবহৃত হয়। ক্যাপশনে ঘটনার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করার বদলে- দর্শকের দৃষ্টি মানুষের শরীর, পোশাক, অঙ্গভঙ্গি কিংবা ব্যক্তিগত দুর্বলতার দিকে পরিচালিত হয়। ফলে একজন ব্যক্তি আর ‘সংবাদ’ বা ‘ঘটনা’র বিষয়বস্তু থাকেন না তিনি পরিণত হন ক্লিক, ভিউ এবং বিজ্ঞাপনী আয়ের উপকরণে। কারও ব্যক্তিগত মুহূর্তকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তার ব্যক্তিসত্তার চেয়ে বেশি মূল্যবান ভিডিওর ভিউ সংখ্যা। কিন্তু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একজন মানুষ তখন আর ‘ব্যক্তি’ থাকেন না, পরিণত হন ব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল পণ্যে। এসব কনটেন্ট শুধু ক্ষণিকের বিনোদন তৈরি করে না, এক ধরনের ডিজিটাল নজরদারি সংস্কৃতিকে বৈধতা দিচ্ছে। মানুষ ধীরে ধীরে এমন বাস্তবতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে যেখানে যে কেউ, যে কোনো সময়, যে কারও ক্যামেরার লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন। ফলে জনপরিসর নিরাপদ হওয়ার বদলে, অনেকের কাছে ভয়ের জায়গায় পরিণত হচ্ছে। প্রযুক্তির উদ্দেশ্য, মানুষের স্বাধীনতাকে প্রসারিত করা। কিন্তু সেই প্রযুক্তি যদি মানুষের স্বাধীন চলাফেরা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং মর্যাদার জন্য হুমকি হয়, তখন সেটি প্রযুক্তির অপব্যবহার নয়, গভীর সামাজিক ও নৈতিক সংকট। প্রযুক্তির সর্বব্যাপী উপস্থিতির অর্থ কি এই একজন মানুষ ঘরের বাইরে পা রাখলে যে কারও ক্যামেরার লক্ষ্যবস্তু হবেন? একজন নাগরিক প্রতিটি মুহূর্ত জনসমক্ষে বিচারের আশঙ্কায় বাঁচবেন? জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কহীন ব্যক্তিগত মুহূর্ত গোপনে ধারণ করে, কোটি মানুষের সামনে ইউটিউবে তা ছড়িয়ে দেওয়া, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ বা ‘সাংবাদিকতার স্বাধীনতা’র অংশ হতে পারে না।
বাস্তবতা হলো, ট্র্যাপার সংস্কৃতি এবং মোবাইল সাংবাদিকতার অপব্যবহারের শিকার কেবল সাধারণ মানুষ নন পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত, সম্মানিত এবং সামাজিকভাবে পরিচিত অনেক ব্যক্তি এর শিকার হচ্ছেন। কাউকে অনুসরণ, গোপনে ভিডিও ধারণ, অপ্রস্তুত মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি এবং পরে সেই ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি কিংবা ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগও বিভিন্ন সময় সামনে এসেছে। এসব কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন নয়, এটি এক ডিজিটাল হয়রানি যা মানসিক নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে। অনেকে পারিবারিক জীবনে সুখী নাও হতে পারেন, কারও ব্যক্তিগত সম্পর্ক জটিল হতে পারে, আবার কেউ হয়তো নিছক বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কিংবা নিজের মতো করে সময় কাটাতে চান। তার ব্যক্তিগত সময়, সম্পর্ক কিংবা চলাফেরাকে কৌতূহল বা বিনোদনের উপকরণে পরিণত করার অধিকার কারও নেই। ‘জনস্বার্থ’ এবং ‘গণকৌতূহল’ এক বিষয় নয়। কোনো ভিডিও লাখ মানুষ দেখতে চায় বলেই, সেটি প্রকাশযোগ্য হয় না। সাংবাদিকতা কিংবা কনটেন্ট তৈরির নামে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে বাজারে তোলা, তাকে সামাজিক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো কিংবা ডিজিটাল জনতার আদালতে সোপর্দ করা, গণতান্ত্রিক সভ্যসমাজের গণমাধ্যম-সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না।
যেসব দেশকে উন্নত বলে জানি, সেখানে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কৌতূহল প্রদর্শনের সময় নেই। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, শিক্ষা, পরিবেশ, রাষ্ট্রনীতি কিংবা বৈশ্বিক সংকট। তারা বোঝে, সমাজের অগ্রগতি নির্ভর করে চিন্তার পরিসরের ওপর। অথচ আমাদের সমাজে অনেক সময় জাতীয় কৌতূহলের বিষয় হয়ে ওঠে একজন অপরিচিত মানুষ কার সঙ্গে চা খেলেন, কে কার পাশে হাঁটলেন, ব্যক্তিগত সময়ে কে কোথায় গেলেন, কিংবা কার ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেমন। এই অসুস্থ কৌতূহলের সুযোগ নিয়ে তথাকথিত ট্র্যাপার, হানি ট্র্যাপার এবং কনটেন্ট-শিকারিরা তাদের ব্যবসা দাঁড় করায়।
যে সমাজের মনোযোগ থাকার কথা জ্ঞান, উদ্ভাবন, গবেষণা ও জনস্বার্থের প্রশ্নে, সেই সমাজ যদি মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্তে উঁকিঝুঁকি দিতেই আগ্রহী হয়ে ওঠে তবে ক্ষতিটা শুধু একজন ব্যক্তির নয় সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক মানের। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের পাশাপাশি এমন সংস্কৃতি সামাজিক কৌতূহলকে ক্রমাগত নিম্নগামী এবং বাণিজ্যে পরিণত করে। প্রকৃত অর্থে, কোন সমাজ কী নিয়ে কৌতূহলী, তাই-ই সভ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করে।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক