এল নিনোর ভয়াবহ রূপ

২০২৭ হতে পারে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর

প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া এল নিনো চলতি শতকের অন্যতম শক্তিশালী, এমনকি স্মরণকালের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোতে পরিণত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর (মেট অফিস)। শক্তিশালী এই প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রবাহ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ানোর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। খবর বিবিসির।

মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হওয়ায় ২০২৭ সাল রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার সম্ভাবনা ‘খুব বেশি’ বলে জানিয়েছে মেট অফিস।

ইতোমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ধরনে এল নিনোর প্রভাব দেখা যাচ্ছে বলে প্রমাণ মিলছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতে স্বাভাবিকের তুলনায় কম মৌসুমি বৃষ্টি এবং আটলান্টিক মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের কার্যক্রম কমে যাওয়া।

যুক্তরাজ্যও এর প্রভাবে শরৎকালে আরও বেশি বৃষ্টি ও ঝড়ের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ইতোমধ্যে অস্থির আবহাওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের মেট অফিসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অ্যাডাম স্কেইফ বলেন, ‘আমাদের পরিষ্কারভাবে বলা উচিত, এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পূর্বাভাসে এল নিনোর সংকেত এতটা তীব্র আমি কখনো দেখিনি।’

এল নিনো কী?

এল নিনো একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত প্রবণতা। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এটি দেখা যায় এবং প্রায় এক বছর স্থায়ী হয়।

প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর সাধারণত পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত বাণিজ্যিক বায়ু দুর্বল হয়ে যেতে পারে, এমনকি কখনো কখনো দিকও পরিবর্তন করতে পারে। এর ফলে উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

সমুদ্রের সেই তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ার ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ে এবং বৃষ্টিপাতের ধরনেও পরিবর্তন আসে।

প্রশান্ত মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় অন্তত ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হলে বিজ্ঞানীরা সাধারণত এল নিনো ঘোষণা করেন।

বর্তমান পরিমাপে সেখানে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বেড়েছে।

মেট অফিসের সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, চলতি বছরের শেষ দিকে এল নিনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সময় এই উষ্ণতা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে।

১৯৫০ সাল থেকে সংরক্ষিত রেকর্ডে এমন ঘটনা আগে দেখা যায়নি। মেট অফিসের মতে, এটি সম্ভবত উনিশ শতকের পর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে।

এর পেছনে সমুদ্রের গভীরে থাকা অস্বাভাবিক উষ্ণ পানিও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু এলাকায় ১০০ মিটার গভীরে পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। এই বিপুল পরিমাণ উষ্ণ পানি এল নিনোকে আরও শক্তিশালী করার জন্য এক ধরনের তাপের ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান বার্কলে আর্থের জলবায়ুবিজ্ঞানী ড. জেক হাউসফাদার বলেন, এল নিনোর বিকাশ অব্যাহত রাখতে এখনও অনেক মাস বাকি। এ কারণেই এটি রেকর্ড সৃষ্টি করতে পারে—এমন আত্মবিশ্বাস বাড়ছে।

কিছু জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠান মেট অফিসের পূর্বাভাসের চেয়েও শক্তিশালী এল নিনোর আশঙ্কা করছে। তাদের কেউ কেউ সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়েছে।

এমনটি হলে এটি ৫০০ বা এমনকি ১ হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন হাউসফাদার।

জলবায়ু পরিবর্তন কি এল নিনোকে আরও ভয়াবহ করছে?

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর ঘটনা বেশি ঘনঘন ঘটছে বা এর শক্তি বাড়ছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে গবেষণা ও বিতর্ক এখনও চলছে।

আন্তঃসরকারি জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেলের (আইপিসিসি) ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রায় ১৪০০ সাল থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ সময়ের তুলনায় ১৯৫০ সালের পর এল নিনোর তীব্রতা বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে।

তবে ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, গত কয়েক হাজার বছরে এল নিনোর শক্তিতে বড় ধরনের ওঠানামা হয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে এর শক্তি বাড়ার সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—বর্তমানে এল নিনো এমন এক পৃথিবীতে ঘটছে, যে পৃথিবী আগের চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণ। ফলে এর আবহাওয়াগত প্রভাবও আরও চরম হতে পারে।

বিশ্বজুড়ে কী প্রভাব পড়তে পারে?

সমুদ্রের তাপের বণ্টন বদলে যাওয়া এবং ওপরের বায়ুমণ্ডলে বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিটি এল নিনোর বৈশিষ্ট্য এক নয়। ফলে এর প্রভাবও সব জায়গায় একই রকম হয় না। তবে ইতোমধ্যে এর প্রভাব অনুভূত হওয়ার প্রমাণ মিলছে।

এল নিনোর বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি দিতে পারে। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম রয়েছে। ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের কাছাকাছি অঞ্চলগুলোতে এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চল ও অস্ট্রেলিয়ায় খরা এবং দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে পেরু, ইকুয়েডর ও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের মতো কিছু দেশে বন্যার আশঙ্কা বাড়তে পারে।

অতীতের এল নিনো পর্বগুলোতে আবহাওয়ার এমন পরিবর্তন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ফসল উৎপাদনেও আঘাত করেছে। কফি, চাল ও কোকোর মতো কৃষিপণ্যের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফসল নষ্ট হওয়া এবং বাণিজ্যব্যবস্থায় বিঘ্নের প্রভাব সরবরাহব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে খাদ্যের দাম বাড়িয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে শত শত বিলিয়ন ডলারের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ক্ষতির সঙ্গে এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

চলতি মাসের শুরুতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সতর্ক করেছে, এই এল নিনো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর কয়েক কোটি মানুষকে সংকটপূর্ণ মাত্রার তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে ফেলতে পারে। তবে বিশ্বের সব জায়গায় এল নিনোর প্রভাব একই রকম নয়। অনেক অঞ্চলে চরম আবহাওয়া বাড়লেও কোথাও এর বিপরীত প্রভাব দেখা দিতে পারে।

ক্যারিবীয় অঞ্চল ও ক্রান্তীয় আটলান্টিকে বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের কার্যক্রম কমে যেতে পারে। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত সেখানে মাত্র তিনটি নামযুক্ত ঝড় তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে কী হবে?

ক্রান্তীয় অঞ্চলের তুলনায় যুক্তরাজ্যের আবহাওয়ায় এল নিনোর প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম। চলতি গ্রীষ্মে রেকর্ড ভাঙা যে তাপপ্রবাহ দেখা গেছে, তার ওপর এল নিনোর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব ছিল বলে মনে করা হচ্ছে না। তবে শরৎ ও শীতের শুরুর দিকে এর প্রভাব বাড়তে পারে। উত্তর-পশ্চিম ইউরোপ, যুক্তরাজ্যসহ বিস্তৃত অঞ্চলে বৃষ্টি ও ঝড়ো আবহাওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে।

আশ্চর্যজনকভাবে, শীতের শেষ দিকে এল নিনো ঠান্ডা আবহাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়াতে পারে। যদিও এ ক্ষেত্রে এল নিনো ও ঠান্ডার মধ্যে সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

২০২৭ সালেই কি ভাঙবে উষ্ণতার রেকর্ড?

মানব কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে উনিশ শতকের শেষ দিকের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এর সঙ্গে এল নিনোর সময় সমুদ্র থেকে বিপুল পরিমাণ তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রায় সাময়িকভাবে আরও বড় উল্লম্ফন দেখা যায়।

মেট অফিসের জলবায়ুবিজ্ঞানী ড. নিক ডানস্টোন বলেন, এল নিনোর শীতকালীন সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরের ক্যালেন্ডার বছরেই এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

তাঁর ভাষায়, ‘তাই ২০২৭ সালে ২০২৪ সালের রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ উষ্ণ বছরের নতুন রেকর্ড হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।’