সুরা দোহায় মুমিনের জন্য ৩ শিক্ষা

মানুষের জীবন বৈচিত্র্যময়। কখনো থাকে সুখ। কখনো আসে দুঃখ। এর কোনোটিই স্থায়ী নয়। আবার কখনো জীবনে এমন সময় আসে, যখন মানুষ নিজের চারপাশে শুধু অন্ধকার দেখতে পায়। দোয়া করছে, কিন্তু কবুল হচ্ছে না। চেষ্টা করছে, কিন্তু ফল আসছে না। অপেক্ষা করছে, কিন্তু পরিস্থিতি বদলাচ্ছে না। এমন সময় মানুষের মন দুর্বল হয়ে যায়। মনে হয়, হয়তো আল্লাহ আমার প্রতি অসন্তুষ্ট। হয়তো আমার দোয়া কবুল হবে না।

ঠিক এমন একটি সময়ে সুরা দোহা মুমিনের সামনে আশার দরজা খুলে দেয়। এই সুরায় নবীজি (সা.)-কে সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেওয়া হয়েছে এমন কিছু শিক্ষা, যা প্রতিটি মুমিনের কাজে লাগে।

কঠিন সময়ে হতাশ না হওয়া : মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনার রব আপনাকে পরিত্যাগ করেননি এবং তিনি অসন্তুষ্টও হননি।’ (সুরা দোহা ৩)

এই আয়াত নাজিলের পেছনে ছিল ওহি অবতীর্ণের সাময়িক বিরতি। তখন মুশরিকরা নবীজি (সা.)-কে কটূক্তি করেছিল। তারা বলেছিল, তার রব তাকে ছেড়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন, বিষয়টি এমন নয়। আল্লাহ তার প্রিয় নবীকে পরিত্যাগ করেননি।

এখানেই মুমিনের জন্য বড় শিক্ষা রয়েছে। জীবনে কোনো কিছু বিলম্বিত হলেই মনে করা যাবে না, আল্লাহ আমাদের ছেড়ে দিয়েছেন। দোয়া কবুল দেরিতে হতে পারে। সমস্যার সমাধান সময় নিতে পারে। কোনো দরজা বন্ধও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু মুমিনের বিশ্বাস থাকবে, আল্লাহ সব জানেন। তিনি বান্দার অবস্থা সম্পর্কে অবগত। তাই কঠিন সময়ে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধরতে হবে। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে।

আল্লাহর নেয়ামত স্মরণ করা : মহান আল্লাহ নবীজি (সা.)-এর জীবনের কয়েকটি নেয়ামত স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি কি আপনাকে এতিম অবস্থায় পাননি? অতঃপর আশ্রয় দিয়েছেন। আপনাকে পথহারা পেয়েছেন, অতঃপর পথনির্দেশ দিয়েছেন। আর আপনাকে অভাবগ্রস্ত পেয়েছেন, অতঃপর অভাবমুক্ত করেছেন।’ (সুরা দোহা ৬-৮)

মানুষ বিপদের সময় শুধু বর্তমানের কষ্টের দিকে তাকায়। সে ভুলে যায়, এর আগেও মহান আল্লাহ তাকে বহু বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন।

তাই হতাশার মুহূর্তে নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকানো উচিত। কত বিপদ থেকে আল্লাহ রক্ষা করেছেন। কত সংকট সহজ করে দিয়েছেন। কত দোয়া কবুল করেছেন। কত অদৃশ্য বিপদ থেকে বাঁচিয়েছেন। এসব স্মরণ করলে অন্তরে কৃতজ্ঞতা জন্ম নেয়। আল্লাহর প্রতি আস্থা বাড়ে।

নেয়ামত পেয়ে দয়া করা : সুরা দোহার শেষাংশে মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং এতিমের প্রতি কঠোর হবেন না। ভিক্ষুককে ধমক দেবেন না। আর আপনার রবের নেয়ামতের কথা বর্ণনা করুন।’ (সুরা দোহা ৯-১১)

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখানো হয়েছে। মহান আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া অনুগ্রহ শুধু নিজের জন্য নয়। যে মানুষ নিজে আশ্রয় পেয়েছে, সে যেন আশ্রয়হীন মানুষের পাশে দাঁড়ায়। যে নিজে অভাবের কষ্ট বুঝেছে, সে যেন অভাবীকে অবহেলা না করে। যে আল্লাহর দয়া পেয়েছে, সে যেন অন্যের প্রতি দয়া দেখায়। এখানেই ইসলামের মানবিক সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা শুধু মুখে প্রকাশ করার বিষয় নয়। মানুষের প্রতি আচরণেও সেটার প্রকাশ থাকা উচিত। সুরা দোহা একজন মুমিনের জীবনের পথনির্দেশনা। এই শিক্ষাগুলো স্মরণ রাখা জরুরি। এগুলো কঠিন সময়ে সান্ত্বনা হবে।

মহান আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া দয়া মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া উচিত। যেমন এতিমের প্রতি কোমল হওয়, সাহায্যপ্রার্থীকে অপমান না করা, মানুষের প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো ইত্যাদি মানবকল্যাণমূলক কাজ করা।

জীবনের কঠিন সময়ে সুরা দোহার এই বার্তাগুলো মনে রাখা জরুরি। যত বিপদই আসুক, মহান আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। মুমিনের পথ হতাশার পথ নয়। তার পথ মহান আল্লাহর ওপর ভরসার পথ।

লেখক : ইসলামি গবেষক