প্রচ্ছদ রচনা

মাহবুব সিদ্দিকী : একজন দুর্ধর্ষ গবেষকের প্রতিকৃতি

মাহবুব সিদ্দিকীর সর্বশেষ গ্রন্থ বাংলায় আফগান মোঘল অভিযান সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। এটি তার ৩৫তম গ্রন্থ। আরেকটি বই বাংলাদেশের নদ-নদী : সমস্যা, সমাধান ও সম্ভাবনা বর্তমানে যন্ত্রস্থ, যা অচিরেই প্রকাশিত হবে। মাহবুব সিদ্দিকীর প্রথম বই আম প্রকাশিত হয়েছিল ২০১০ সালে। এর মধ্যেই তিনি এতগুলো আকর গ্রন্থ লিখে ফেলেছেন। বর্তমানে আরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপির ওপর কাজ করছেন তিনি, যেগুলো ২০২৭ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হবে।

রাজশাহীবাসী মাহবুব সিদ্দিকী আজ আর অজ্ঞাতকুলশীল কেউ নন। কিন্তু যে বিপুলায়তন গবেষণাসম্ভার তিনি বাংলা সাহিত্যের জন্য রেখে যাচ্ছেন, সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা অত্যন্ত সংকীর্ণ। অগণন বিষয়ে তার অদম্য কৌতূহল রয়েছে, যার তাড়নায় তিনি দিন-রাত বুঁদ হয়ে থাকেন পুরনো বই, বিলুপ্তপ্রায় পত্রপত্রিকা, ঔপনিবেশিক আমলের রিপোর্ট আর সরকারি গেজেটিয়ারে। রাজশাহী শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত তার শিরইলের বাসস্থানটি দেশের একটি মূল্যবান ‘মহাফেজখানা’ বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না।

সরকারি চাকরি করার কারণে বই প্রকাশ করতে গেলে সরকারের পূর্বানুমোদন নিতে হয়। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে দীর্ঘকাল তার কোনো পাণ্ডুলিপি চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলস্বরূপ, তার যা কিছু প্রকাশনা, তা ২০০৩ সাল থেকে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত কিছু ক্ষুদ্রাকার নিবন্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ভেতরে পূর্ণমাত্রায় প্রস্তুতি ছিল। ফলে ২০০৮ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের অব্যবহিত পরেই গবেষণার কাজগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশের উদ্যোগ নিতে তার কোনো সমস্যা হয়নি।

তার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ আম। রাজশাহীর মানুষ হিসেবে আজন্ম নানা জাতের আমের সঙ্গে তার পরিচিতি থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। তবে বিভিন্ন রকমের আমের আকার, স্বাদ, গন্ধ, আঁশের মাত্রা ও আঁটির আকার তাকে ভীষণভাবে কৌতূহলী করে তোলে। এর পেছনে ছুটে তিনি সারা দেশ ঘুরে বিভিন্ন এলাকার বিচিত্র সব আমের তথ্য সংগ্রহ করেছেন; গভীরভাবে অবহিত হয়েছেন এদের পুষ্টিগুণ ও ভেষজগুণ সম্পর্কে। ২০১০ সালে প্রকাশিত তার আম একটি প্রামাণিক ও আকর গ্রন্থ, যেখানে ১২৫টি দেশি-বিদেশি আমের বিশদ বৃত্তান্ত তিনি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে সংগ্রন্থিত করেছেন। তবে তার নিজের সবচেয়ে প্রিয় আম হলো ‘রাণীপছন্দ’। ছোট আকারের এই আমটি গুণে-মানে ও স্বাদে তার কাছে অনন্য ও অদ্বিতীয় মনে হয়।

দেশি আম আর বিদেশি আমের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী? মাহবুব সিদ্দিকী জানাচ্ছেন, একটি ল্যাংড়া আম খেয়ে তার আঁটি যদি রান্নাঘরের পেছনে ফেলে দেওয়া হয়, তবে তা থেকে চারা হবে, গাছ হবে এবং ৬-৭ বছরের মধ্যে ফলও পাওয়া যাবে; কিন্তু তাতে মাতৃগুণ বজায় থাকবে না। তাই সে আম আর প্রকৃত ল্যাংড়া আম হবে না। প্রজননগতভাবে এই পরিবর্তিত আমগুলোকেই মূলত ‘দেশি আম’ বলা হয়।

তার বইগুলো থেকে যেসব তথ্য পাওয়া যায়, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। তার অন্য একটি আকর গ্রন্থের নাম হারিয়ে যাওয়া সোনার ধান। ৬৩৬ পৃষ্ঠার এই সুপরিসর গ্রন্থে তিনি বাংলাদেশ ও অবিভক্ত বাংলার ১০০০টিরও বেশি দেশজ জাতের ধানের নাম এবং তাদের নিখুঁত বৈশিষ্ট্য নথিভুক্ত করেছেন। মাহবুব সিদ্দিকী জানাচ্ছেন, পাকিস্তানের যে ‘বাসমতী’ চালের ঘ্রাণে আমরা আজ পাগল, তা মূলত বাংলারই আদি দেশজ ধান। এক ব্রিটিশ সাহেব একদা এই ধানের বীজ নিয়ে পাঞ্জাবের মাটিতে বপন করেছিলেন। এভাবেই সুকৌশলে সেটা বেহাত হয়ে যায়। অথচ উইলিয়াম হান্টার সাহেব বহু আগেই লিখে গেছেন বাংলার এই বাসমতীর গৌরবগাথা। এমনকি মহাকবি আলাওলের পদ্মাবতী কাব্যেও বাসমতী ধানের সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়।

আমরা এই গ্রন্থ থেকে জানতে পারি যে, ব্রিটিশ সরকার ১৯১০ সালে ঢাকা শহরের খামারবাড়িতে এশিয়া তথা বিশ্বের প্রথম ধান গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। এর প্রথম পরিচালক ছিলেন প্রখ্যাত কৃষিবিজ্ঞানী জে. পি. হেক্টর সাহেব। তার ধারণা ছিল কেবল অবিভক্ত বাংলা ও আসাম অঞ্চলেই প্রায় ১৮ হাজার দেশজ ধানের প্রজাতি রয়েছে। মাহবুব সিদ্দিকীর এই বহুমূল্য গ্রন্থটির বিষয়বস্তু ও বিস্তৃতি কত ব্যাপক, তা পাঠক নিজে হাতে না নিলে কেবল মুখে ব্যাখ্যা করে বোঝানো সম্ভব নয়। সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যাওয়ার পথে থাকা ছয়টি বিরল জাতের ধান তিনি প্রতি বছর নিজের জমিতে চাষ করেন এবং তাদের বীজ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেন। এমনকি অনেক বিলুপ্তপ্রায় ধানের বীজ তিনি জয়দেবপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের হাতেও তুলে দিয়েছেন।

ধান নিয়ে তার কৌতূহল কেবল চাষের মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা বিস্তৃত হয়েছে বাংলা সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি পর্যন্ত। তার চমৎকার একটি গ্রন্থের নাম বাংলা সাহিত্যে ধান। ২১২ পৃষ্ঠার এই বইতে বাংলার নানারকম ধানের পরিচয়ের পাশাপাশি গ্রামীণ লোকজ ছড়া এবং লোকসংগীতে কীভাবে ধানের প্রতিফলন ঘটেছে, তার প্রামাণিক দলিল তিনি হাজির করেছেন। বিশেষ করে রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের নদীভাঙা ও অভাবগ্রস্ত মানুষকে নিয়ে রচিত অনেক ভাওয়াইয়া গানের চল রয়েছে। ক্ষুধার্ত মজুরেরা নিজেদের হাড়ভাঙা খাটুনির আবাদের অর্ধেক ফসল জমিদারের গোলায় তুলে দিতে বাধ্য হতো। বইটির ১৫৭ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত একটি মর্মস্পর্শী ভাওয়াইয়া গান ঠিক এ রকম :

‘তোমরা কি কইমেন চাচি
হামরা ভোকেতে না বাঁচি
কাইল খাচি গোমের ভাত
আইজ উপাস আচি।
এলা দিনের বা গতিক ভালো নয়রে
ও মুই কেমনে বাঁচিয়া রও
ঘরে মোর ভাত নাই পেদ্দোনে কাপড় নাই
এলা মুই শরমে বাচোং নারে।
তোমার হাতে ভাইরে কোদাল কাঁচি
তবু প্যাটোত পাথর বাঁধি আছেন বাঁচিরে
আর তোমারায় জোগান ভাত সর্ব দুনিয়ার।
ওরে আধখানা ভাগ তার জমিদারের
ও আর আধখানোতে মোর চলে নারে
ও মুই কেমনেরে বাঁচিয়া রও।’

১৯৪৯ সালে রাজশাহী শহরের পদ্মাসংলগ্ন এক ঐতিহাসিক জনপদে মাহবুব সিদ্দিকীর জন্ম হয়েছিল। তার কৈশোর ও তারুণ্যের একটি দীর্ঘ সময় কেটেছে নাটোরের নারদ নদের প্রতিপার্শ্বে। আর এ কারণেই বোধহয় নদী ও তার স্রোতময় জলপ্রবাহ মাহবুব সিদ্দিকীর রক্তে আজীবন আলোড়ন তোলে। ২০১৯ সালে তিনি প্রকাশ করেন ব্রহ্মপুত্র নদ। প্রায় ৭৫২ পৃষ্ঠার এই সুবিশাল গ্রন্থে ব্রহ্মপুত্রের জন্ম, গতিপথের ঐতিহাসিক পরিবর্তন, এর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং বর্তমান সংকটের চিত্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কী গভীর অধ্যবসায় ও ক্লান্তিহীন শ্রমের ছাপ অঙ্কিত রয়েছে এই গ্রন্থটির পাতায় পাতায়, তা দেখলে বিস্ময়ের অবধি থাকে না।

প্রচলিত ব্যাকরণে নদ আর নদীর পার্থক্য কী? মাহবুব সিদ্দিকী জানাচ্ছেন, গঠনগত বা ভৌগোলিক দিক থেকে এদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। মূলত প্রাচীন টোলের পণ্ডিতরা নির্ধারণ করেছিলেন যে, যেসব নদীর নাম ‘স্বরান্ত’ (অর্থাৎ শেষে আ-কার বা ই-কার) নয়, সেগুলো হবে পুরুষবাচক বা ‘নদ’ যেমন ব্রহ্মপুত্র নদ, কপোতাক্ষ নদ ইত্যাদি। এর একমাত্র ব্যতিক্রম উ-কারান্ত নাম যেমন বালু নদ। আর বাকি সবই ‘নদী’। ১৯৬৩-৬৪ সালেও যে নারদ নদটি ছিল প্রখর স্রোতস্বিনী, আজ তা সম্পূর্ণ মৃত। মাহবুব সিদ্দিকী হেঁটে হেঁটে সেই মৃত নারদ নদের সম্পূর্ণ আদি গতিপথটি চিহ্নিত করেছেন। নদী গবেষণার কাজে দীর্ঘ দুই যুগ ধরে তিনি সারা দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত চষে বেরিয়েছেন। তার ব্যক্তিগত গণনা অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমান নদ-নদীর সংখ্যা মোট ২৪১৩টি। তার অভিমত হলো : সরকারি খাতায় বিলুপ্ত বলা হলেও সব নদীই এখনো প্রকৃতির বুকে টিকে আছে—হয়তো কোনোটি মৃত, কিংবা কোনোটি অর্ধমৃত; কিন্তু তাদের অস্তিত্বকে মুছে যায়নি।

জীবদ্দশায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের অভ্যন্তরীণ জলপথগুলোকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য যে মহাউদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, তাকে সাধারণত ‘খাল খনন কর্মসূচি’ বলে অভিহিত করা হয়। তবে এই নামকরণে মাহবুব সিদ্দিকীর ঘোর আপত্তি। তার ভাষ্যমতে, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ সালের মে মাসে অকাল মৃত্যু অবধি অত্যন্ত স্বল্প সময়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খনন ও সংস্কারের মাধ্যমে দেশের তিন শতাধিক নদীর পুনর্জীবন ঘটিয়েছিলেন। মরা গাঙ্গে আবারও প্রবাহিত হয়েছিল সচল জলস্রোত। তাই এই মহৎ জাতীয় কর্মযজ্ঞকে স্রেফ ‘খাল খনন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়, এটি ছিল মূলত নদী পুনর্জীবনের এক ঐতিহাসিক রূপরেখা।

মাহবুব সিদ্দিকীর যে বইটি অচিরেই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, সেটির শিরোনাম বাংলাদেশের নদ-নদী : সমস্যা, সমাধান ও সম্ভাবনা। তিনি তথ্যপ্রমাণসহ জানাচ্ছেন যে, ভারতের সঙ্গে আমাদের অভিন্ন নদীর সংখ্যা ৫৪টি—এই বহুল প্রচারিত তথ্যটি আদতে সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে এই আন্তর্জাতিক নদীর সংখ্যা ২২১টি! এসব স্পর্শকাতর বিষয়ে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। তিনি এমন একটি তথ্য সামনে এনেছেন, যা আমরা সাধারণ মানুষেরা জানি না বা কখনো বলি না; আর তা হলো : বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রায় ৪০টি নদীর পানি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গিয়ে প্রবেশ করে, যার ফলে ভারতের অন্তত ১ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হয়। মাহবুব সিদ্দিকী লিখেছেন, দেশের অসংখ্য নদ-নদীর মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়েছে মূলত অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ এই ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসেই শেষ হতে যাচ্ছে। ফলে এখনই আমাদের অত্যন্ত দূরদর্শী ও উদ্যোগী হয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। তার সুস্পষ্ট অভিমত : নদী নিয়ে আলোচনা আর দ্বিপক্ষীয় ফ্রেমে আটকে রাখা যাবে না; এবার চীন, নেপাল এবং ভুটানকে অন্তর্ভুক্ত করে বহুপাক্ষিক আঞ্চলিক চুক্তির মাধ্যমে আমাদের জাতীয় ও প্রাকৃতিক স্বার্থ সংরক্ষণের যথাযথ বৈশ্বিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

দেশের এই সার্বিক অবস্থা, বিশেষ করে বাংলাদেশের বিপন্ন প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্র নিয়ে মাহবুব সিদ্দিকী সদা দুশ্চিন্তায় ভোগেন। এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী ছিল মূলত পুকুরের শহর। দুর্ভাগ্যবশত, আশির দশক থেকে শুরু করে পরবর্তী ২০ বছরের মধ্যে এই বিভাগীয় শহরের অধিকাংশ ঐতিহাসিক পুকুর ও জলাশয় ভরাট করা হয়ে যায়। মাহবুব সিদ্দিকী নির্বিবাদে ঘরে বসে থাকার লোক নন। শহরের ঐতিহ্যবাহী পুকুর ভরাট চিরতরে বন্ধ করার লক্ষ্যে তিনি নিজে বাদী হয়ে ২০১০ সালে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনে একটি জনস্বার্থমূলক রিট পিটিশন দাখিল করেন। তার এই আবেদনটি আদালত কর্তৃক গৃহীত হয় এবং মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ ২০-০২-২০১১ তারিখে এক ঐতিহাসিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে আদেশ প্রদান করেন যে, রাজশাহী মহানগরের অভ্যন্তরে আর কোনো প্রাকৃতিক জলাশয় বা পুকুর কোনো অবস্থাতেই ভরাট করা যাবে না। 

‘নদী বাঁচলে তবেই বাংলাদেশ বাঁচবে’—এটিই মাহবুব সিদ্দিকীর জীবনের মূল চেতনা। নদীকে কেন্দ্র করে তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা এক কথায় বিস্ময়কর। তার ভাবনার গভীরতা ও প্রসারতা নির্দেশ করে এমন কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের নাম হলো—তিস্তার মহাপ্লাবন: যমুনা নদীর সৃষ্টি, বরেন্দ্র-কৈবর্ত বিদ্রোহ ও রামাবতী নগরী, সুন্দরবন ও গাঙ্গেয় বদ্বীপের মোহনা, করতোয়া নদীর তীরবর্তী জনজীবন : অতীত ও বর্তমান, বড়াল নদের ইতিকথা এবং গঙ্গাধারা : শাখানদী ও উপনদী। ১৭৮৭ সালে তিস্তা নদীতে এক প্রলয়ঙ্কারী মহাপ্লাবন হয়েছিল এবং সেই ভৌগোলিক ওলটপালটের ফলশ্রুতিতেই আজকের যমুনা নদীর জন্ম—এই ঐতিহাসিক সত্যটি সুবিদিত নয়। এই চাঞ্চল্যকর ভৌগোলিক ঘটনাটি অকাট্যভাবে প্রমাণের জন্য তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তৎকালীন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কর্মচারী, ইতিহাসবিদ এবং সমকালীন ভূগোলবিদদের লেখা অসংখ্য গোপন ঐতিহাসিক চিঠি, মানচিত্র ও রিপোর্টের সাহায্য নিয়েছেন। 

বিচিত্র তার এই গবেষণা-কৌতূহল, যার অকাট্য প্রমাণ মেলে তার ভিন্নধর্মী সব গবেষণা গ্রন্থের শিরোনামে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত তার একটি অনন্য গ্রন্থের নাম বাংলাদেশের বিলুপ্ত দীঘি-পুষ্করিণী-জলাশয়। আবার ২০২০ সালে তিনি প্রকাশ করেন সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের বই বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ইতিহাসবাংলাদেশের বিলুপ্ত দীঘি-পুষ্করিণী-জলাশয় গ্রন্থটি আদ্যন্ত মৌলিক গবেষণার ফসল। দেশের বৃহত্তর জেলা শহরগুলোর হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন জলাশয়গুলোর তথ্য সংগ্রহের জন্য তিনি একাদিক্রমে জীবনের প্রায় ৭টি বছর ব্যয় করেছেন। প্রতিটি জেলা সদরের প্রেসক্লাবে গিয়ে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের সহায়তা নিয়ে অঞ্চলের প্রবীণ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার ও লোকগাথা সংগ্রহ করে অবলুপ্ত জলাশয়গুলোর আদি বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করেছেন। 

বাংলার রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়েও মাহবুব সিদ্দিকীর গবেষণা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। ২০২০ সালে তিনি প্রকাশ করেছেন বরেন্দ্র-কৈবর্ত বিদ্রোহ ও রামাবতী নগরী। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে আঠারো শতকের ব্রিটিশ বাংলা : কোম্পানির গভর্নর ও গভর্নর জেনারেলদের শাসন। এ ছাড়া তিনি প্রকাশ করেছেন নির্বাসিত সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর : রেঙ্গুন যাত্রাপথে বাংলাদেশ ও তার কাব্যশৈলী। ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে তার মাঠপর্যায়ের কাজ তানোরের কৃষক বিদ্রোহ। তার আরও দুটি গ্রন্থ হলো শহর রাজশাহীর আদিপর্ববৃহত্তর সিলেটের আদিপর্ব। আর অতি সম্প্রতি বাজারে এসেছে তার আরেকটি অনন্যসাধারণ গ্রন্থ বাংলায় আফগান-মোঘল অভিযান : বারো ভূঁইয়ার প্রতিরোধ

আরও অনেক নতুন গবেষণা এবং গবেষণালব্ধ তথ্য দিয়ে নতুন গ্রন্থ রচনার এক তীব্র আকুল তাড়নায় তিনি সদা উদ্দীপ্ত। ১৯৪৯ সালে জন্ম নেওয়া এই প্রাজ্ঞ মানুষের বয়স এখন ৭৭ চলছে। বয়সজনিত সব প্রকার শারীরিক অসামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাহবুব সিদ্দিকী তার স্বপ্নের কাজগুলো একে একে বাস্তবায়ন করে চলেছেন। যেকোনো মানদণ্ডেই বিবেচনা করা হোক না কেন, তাকে একজন ‘দুর্র্ধর্ষ গবেষক’ বললে অত্যুক্তি হয় না। দিন-রাত তিনি অবিরাম ব্যস্ত থাকেন মাঠের তথ্যগুলো টেবিলে সাজিয়ে নতুন গ্রন্থের ভূমিকা লেখায় এবং পাণ্ডুলিপির মুদ্রিত প্রুফ সংশোধনের কাজে।