বিশ্বসাহিত্য

রোলাঁ বার্তের শোকের ভাষা

শোকের দিনলিপি
রোলাঁ বার্ত
অনুবাদ : তানভীর রাসেল
প্রকাশক : উজান প্রকাশন
প্রকাশকাল : এপ্রিল, ২০২৬
মূল্য : ৪০০ টাকা

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৭ পিএম

সাধারণভাবে শোককে যেমন ব্যক্তিগত পাওয়া-না পাওয়া, বিচ্ছেদ কিংবা কোনো প্রিয়জনের মৃত্যু-পরবর্তী মানসিক অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, রোলাঁ বার্তের শোকের দিনলিপি আমাদের প্রচলিত এই ধারণার ভেতরে আটকে থাকতে দেয় না। বার্তের শোক—ভাষা, সাহিত্য, শরীর এবং আত্মপরিচয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত আর সেই অভিজ্ঞতাকে লিখতে গিয়ে বার্ত নিজের চিন্তা ও ভাষার যে ভঙ্গি নির্মাণ করেছেন, শোকের দিনলিপি বহন করছে তারই সাক্ষ্য।

রোলাঁ বার্ত (১৯১৫-১৯৮০) ছিলেন ফরাসি সাহিত্যসমালোচক, সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক ও চিন্তক। ভাষা, সাহিত্য, চিহ্ন, সংস্কৃতি ও পাঠের প্রকৃতি নিয়ে তার কাজ বিংশ শতাব্দীর মানবিক বিদ্যার পরিসরকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ সমালোচনা ও সত্য-তে তিনি সাহিত্যসমালোচনার প্রকৃতি ও ভাষা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। বইটি রেমঁ পিকার্ডের সমালোচনার প্রত্যুত্তর হিসেবে রচিত হলেও তার পরিসর শেষ পর্যন্ত সেই নির্দিষ্ট বিতর্ককে অতিক্রম করে নতুন ধরনের সাহিত্যপাঠ ও সমালোচনার দিকে এগিয়ে যায়।

এই বার্তই যখন ব্যক্তিগত শোকের মুখোমুখি হন, তখন তার ভাষা কীভাবে বদলে যায়—শোকের দিনলিপি সেই প্রশ্নেরও একটি উত্তর। ১৯৭৭ সালের ২৫ অক্টোবর তার মা অঁরিয়েত বার্তের মৃত্যু হয়। পরদিন ২৬ অক্টোবর থেকে বার্ত শোকের নোট লিখতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে এই নোটের রচনাকাল ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। অধিকাংশ নোটই ছিল তারিখযুক্ত ছোট ছোট কার্ডে লেখা : পরবর্তীকালে মোট ৩৩০টি কার্ড নাথালি লেহে সংকলিত ও টীকাভাষ্যসহ গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। ফরাসি ভাষায় Journal de deuil প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালে।

শোকের দিনলিপি প্রচলিত অর্থে কোনো ধারাবাহিক দিনলিপি নয়। বিচ্ছিন্ন নোট—স্মৃতি, প্রশ্ন, আকস্মিক উপলব্ধি, আত্মসংলাপ এবং দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পর্যবেক্ষণ মিলে তৈরি হয়েছে এর শরীর। শোক কখনো তীব্র, কখনো স্তব্ধ, কখনো স্মৃতির মধ্যে ফিরে আসে, কখনো হঠাৎ কোনো শব্দ, স্থান, বস্তু কিংবা দৃশ্যের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করে। ফলে বার্তের শোকের অভিজ্ঞতা একদিকে ব্যক্তিগত, অন্যদিকে গভীরভাবে সাহিত্যিক।

শোকের দিনলিপিকে শুধুমাত্র একজন পুত্রের মা হারানোর ব্যক্তিগত বিলাপ হিসেবে পড়লে এর ব্যাপ্তি ধরা পড়ে না। বার্ত তার মাকে হারিয়েছেন, সেই হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি স্মৃতি, অনুপস্থিতি, একাকিত্ব এবং লেখার অর্থকে নতুনভাবে অনুভব করেছেন। শোক তাকে নিজের ভেতরের এমন এক অঞ্চলে নিয়ে যায়, যেখানে চিন্তা আর অনুভূতি পরস্পর ভিন্ন থাকে না।

তার একটি নোটে আমরা পড়ি : ‘এখনো অন্য অনেকেই আমাকে ভালোবাসে, কিন্তু এখন থেকে আমার মৃত্যু আর কাউকে নিঃশেষ করবে না। এটাই হলো নতুন খবর। (কিন্তু মিশেল?)’

এখানে শোকের ভাষাটি লক্ষ করার মতো। বার্ত সরাসরি আবেগের ঘোষণা না নিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে অন্যের সম্পর্কের একটি নতুন বাস্তবতা আবিষ্কার করছেন। নিজের মৃত্যু আর কাউকে ‘নিঃশেষ’ করবে না—এই উপলব্ধির মধ্যে ব্যক্তিগত শোক যেমন আছে, তেমনি আছে সম্পর্কের অস্তিত্বগত অর্থ নিয়ে এক গভীর চিন্তা। শেষের বন্ধনীর ‘কিন্তু মিশেল?’ আবার সেই স্থির সিদ্ধান্তকেও ভেঙে দেয়। অর্থাৎ শোক কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না পৌঁছে একটি বাক্যের ভেতরেই নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।

এই ভঙ্গিই বার্তের লেখার অন্যতম শক্তি। তার ভাষা একই সঙ্গে সংক্ষিপ্ত, দার্শনিক এবং আবেগঘন। কখনো একটি মাত্র বাক্য একটি দীর্ঘ স্মৃতির সমান ভার বহন করে। কখনো একটি শব্দই হয়ে ওঠে সমগ্র শোকের সংকেত। এই কারণে শোকের দিনলিপি পড়তে গেলে মনে হয়, বার্ত যেন শোককে ব্যাখ্যা করছেন না; বরং শোক কীভাবে ভাষার মধ্যে এসে বসে, সেটিই দেখাচ্ছেন।

২৮ নভেম্বরের একটি নোটে আছে—‘অর্থাৎ আমাকে বেঁচে থাকতে হবে “অনুপস্থিতির উপস্থিতি”র সঙ্গেই।’ এই ছোট্ট বাক্যটি শোকের দিনলিপির অন্যতম কেন্দ্রীয় অনুভূতিকে ধারণ করে। অনুপস্থিতিই এখানে উপস্থিতির এক নতুন রূপ। মা নেই, কিন্তু তার অনুপস্থিতিই হয়ে উঠেছে প্রতিদিনের জীবনের দৃশ্যমান বাস্তবতা। শোকের সবচেয়ে গভীর পরস্পরবিরোধিতা বোধহয় এখানেই—যাকে হারানো হয়েছে, তার অনুপস্থিতিই তাকে সবচেয়ে বেশি উপস্থিত করে রাখে।

তবে বার্তের শোক স্থির কোনো অনুভূতি নয়। এক ধরনের চলমান অবস্থা। কখনো তিনি রাস্তায় হাঁটছেন, কখনো কোনো ঘরে, কখনো কোনো স্মৃতির মধ্যে, কখনো কোনো বই, চলচ্চিত্র কিংবা শিল্পের প্রসঙ্গে আর সেসব বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যে মায়ের অনুপস্থিতি ফিরে আসছে। ফলে ব্যক্তিগত শোক ধীরে ধীরে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক জগতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

এ কারণেই শোকের দিনলিপি বার্তের চিন্তার জগতেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা। তার পরিচিত বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তা এখানে নিষ্ক্রিয় নয়। বরং আশ্চর্যের বিষয়, ব্যক্তিগত বেদনার মধ্যেও সেই তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা সক্রিয় থাকে। তবে তা আগের মতো কেবল তত্ত্ব নির্মাণ করে না, এবার নিজের অভিজ্ঞতার ভেতর তত্ত্বের অনুরণনও শুনতে থাকে।

এই গ্রন্থের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর টীকাভাষ্য। মূল নোটগুলোর ভেতরে যে ব্যক্তি, স্থান, বই, চলচ্চিত্র, পুরাণ, সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গ কিংবা ব্যক্তিগত স্মৃতির উল্লেখ এসেছে, সেগুলোকে পাঠকের সামনে উন্মোচন করার জন্য নাথালি লেহে বিস্তৃত টীকা ও ব্যাখ্যা যুক্ত করেছেন। ফলে বইটি কেবল বার্তের বিচ্ছিন্ন নোটের সমষ্টি হয়ে থাকেনি; তার সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলেরও একটি মানচিত্র তৈরি হয়েছে। বাংলা অনুবাদে যুক্ত হয়েছে অনুবাদকের প্রযুক্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ টীকা।

এখানে অনুবাদের প্রসঙ্গটি অনিবার্যভাবে আসে। কারণ বার্তের এই সংক্ষিপ্ত, সাংকেতিক এবং কখনো প্রায় সূত্রের মতো বাক্যকে অন্য ভাষায় নিয়ে আসা সহজ কাজ নয়। ফরাসি মূলের পর ২০১০ সালে রিচার্ড হাওয়ার্ডের ইংরেজি অনুবাদে বইটি প্রকাশিত হয়; তানভীর রাসেল সেই ইংরেজি সংস্করণ অবলম্বনে বাংলায় শোকের দিনলিপি অনুবাদ করেছেন। ইংরেজি সংস্করণে নাথালি লেহের সংকলন ও টীকাভাষ্য এবং হাওয়ার্ডের অনুবাদ ও পরবর্তী আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তানভীর রাসেলের অনুবাদের সাফল্য সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় বার্তের এই সংক্ষিপ্ত অথচ বহুস্তরীয় ভাষাকে বাংলায় ধরে রাখার জায়গায়। তিনি বার্তের বাক্যের অন্তর্নিহিত আবহ, বিরতি, দ্ব্যর্থতা এবং ভাবগত টানটিও ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। অনুবাদটি আক্ষরিক ভাষান্তর না হয়ে বাংলা ভাষায় বার্তের শোকের একটি নতুন পাঠযোগ্য রূপ তৈরি করেছে।

বিশেষত ‘অনুপস্থিতির উপস্থিতি’র মতো অভিব্যক্তিতে শব্দ নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে শুধু একটি ধারণার অনুবাদ করা হয়নি, একই সঙ্গে একটি অনুভূতিও নির্মিত হয়েছে। অনুপস্থিতি এবং উপস্থিতি—দুটি আপাতবিরোধী শব্দকে পাশাপাশি বসিয়ে যে মানসিক অবস্থাটি তৈরি হয়, তা শোকের প্রকৃতির সঙ্গেই মিলে যায়। তানভীর রাসেলের অনুবাদে এই ধরনের জায়গাগুলো বাংলা ভাষায় স্বাভাবিক থেকেও যথেষ্ট কাব্যিক হয়ে উঠেছে।

একই কথা টীকাভাষ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পাঠক বার্তের ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক জগতের বহু অপরিচিত প্রসঙ্গের মুখোমুখি হন। চলচ্চিত্র, শিল্প, সাহিত্য, ব্যক্তি কিংবা স্থান—এসবের সঙ্গে বার্তের শোকের সম্পর্ক কখনো সরাসরি, কখনো পরোক্ষ। টীকাগুলো সেই সম্পর্কের সূত্রগুলো পাঠকের সামনে খুলে দেয়। আর অনুবাদক হিসেবে তানভীর রাসেলের কাজ হলো সেই সূত্রগুলোকে এমনভাবে বাংলায় পৌঁছে দেওয়া, যাতে মূল পাঠের সঙ্গে টীকার দূরত্ব তৈরি না হয়। এই জায়গায় তার শ্রম ও যত্ন স্পষ্ট।

তবে শোকের দিনলিপির সবচেয়ে বড় আবিষ্কার আমার কাছে এর সাহিত্যিকতা। বার্ত নিজেই যে বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের মানুষ, সেখানে ‘সাহিত্য’ নিয়ে তার দীর্ঘ সংশয় ও ভাবনা ছিল। অথচ মায়ের মৃত্যুর পর লেখা এই বিচ্ছিন্ন নোটগুলো শেষ পর্যন্ত এমন এক সাহিত্যিক রূপ গ্রহণ করে, যাকে কেবল ব্যক্তিগত নোট বলে পাশ কাটানো যায় না।

২৪ জুলাই ১৯৭৮-এর একটি নোটে তিনি লিখেছেন, ‘সকাল। ঝলমলে রোদ, একটি পাখির বিশেষ ধরনের ও খানিকটা সাহিত্যিক আবহের গান, গ্রামীণ আওয়াজ (মোটরের শব্দ), নির্জনতা, প্রশান্তি; কোনো উপদ্রব নেই। তবুও—এই নির্মল বাতাসেও, আমি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি কাঁদতে শুরু করি, যখন মায়ের সেই কথাগুলো মনে পড়ে।’

শোকের দিনলিপি একই সঙ্গে অন্তরঙ্গ এবং বহির্মুখী। যেমন একজন মানুষের মাকে হারানোর ব্যক্তিগত কাতরতা, তেমনি একজন অসামান্য চিন্তকের জীবনের শেষ পর্যায়ের বৌদ্ধিক ও সাহিত্যিক মানসেরও দলিল। বার্ত ১৯৮০ সালে মারা যান, অর্থাৎ মায়ের মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তার নিজের জীবনও শেষ হয়ে যায়। এ সময়ের ব্যবধানের কথা জানলে শোকের দিনলিপির পাঠে মৃত্যুর উপস্থিতি আরও ঘনীভূত হয়। তবে বইটির মূল্য এই জীবনীসংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে নয়, বরং কীভাবে একজন চিন্তক নিজের ব্যক্তিগত শোককে ভাষার মধ্যে ধারণ করেন, তার মধ্যেই এর স্থায়ী গুরুত্ব।

এই জায়গায় তানভীর রাসেলের অনুবাদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি ভাষার ব্যক্তিগত, দার্শনিক ও কাব্যিক অভিজ্ঞতাকে আরেক ভাষায় নিয়ে আসা শব্দান্তরমাত্র নয়। বিশেষ করে বার্তের মতো লেখকের ক্ষেত্রে অনুবাদককে একই সঙ্গে ধারণা, ছন্দ, বিরতি, সাংকেতিকতা ও আবেগের ভার বহন করতে হয়। শোকের দিনলিপির বাংলারূপে তানভীর রাসেল সেই কঠিন কাজটিই করার চেষ্টা করেছেন। তার অনুবাদে বার্তের ভাষা বাংলা হয়ে উঠেছে, কিন্তু তার অন্তর্গত অস্বস্তি, সংক্ষিপ্ততা ও চিন্তার ঘনত্ব অনেকখানি অক্ষুণ্ণ থেকেছে।

শোকের দিনলিপি একটি সুপাঠ্য অনুবাদগ্রন্থ তো বটেই রোলাঁ বার্তকে নতুন করে পড়ারও একটি সুযোগ। একজন তাত্ত্বিক ও সমালোচককে তার সবচেয়ে ব্যক্তিগত, সবচেয়ে ভঙ্গুর এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে সাহিত্যিক অবস্থায় দেখার সুযোগ। আর সেই কারণেই বইটি শেষ পর্যন্ত শোকের বই হয়েও কেবল শোকের বই হয়েই থাকে না—হয়ে ওঠে ভাষা ও মানুষের বেঁচে থাকার এক মূল্যবান সাহিত্যকর্ম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত