সবুজ ও টেকসই অর্থায়নকে ব্যবসায়িক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করে সিটি ব্যাংক। এজন্য ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে গ্রিন ফাইন্যান্স মোট মেয়াদি ঋণ বিতরণের ৩৬.৫৭ শতাংশ এবং সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স মোট ঋণ বিতরণের ৭৯.২৭ শতাংশে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির চিফ রিস্ক অফিসার মোহাম্মদ ফিরোজ আলম।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?
মোহাম্মদ ফিরোজ আলম : বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সবুজ ও টেকসই অর্থনীতিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মতো ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতিতে এ ভূমিকা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা, পরিবেশবান্ধব ভবন, টেকসই কৃষি, বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্ন পরিবহন এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোর মতো খাতে অর্থায়ন বাড়ানো গেলে অর্থনীতির সবুজ রূপান্তর অনেক দ্রুত হবে। একই সঙ্গে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ও অধিক কার্বননির্ভর কার্যক্রমে অর্থায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও জলবায়ু ঝুঁকির যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন। ইতিবাচক বিষয় হলো বাংলাদেশের আর্থিক খাত ইতিমধ্যেই এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। ২০২৫ সালে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ৩০ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা সবুজ অর্থায়ন এবং ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা টেকসই অর্থায়ন করেছে। সবুজ অর্থায়ন ছিল মোট মেয়াদি ঋণ বিতরণের ১৩.৭৭ শতাংশ এবং টেকসই অর্থায়ন মোট ঋণ বিতরণের ৩৫.৮৭ শতাংশ। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেও এ ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। এটি প্রমাণ করে, টেকসই অর্থায়ন এখন আর ব্যাংকিং খাতের প্রান্তিক কোনো কার্যক্রম নয়; বরং ধীরে ধীরে মূলধারার ব্যাংকিংয়ের অংশ হয়ে উঠছে। তবে সামনে শুধু অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; অর্থায়নের প্রকৃত প্রভাব পরিমাপ করাও জরুরি। বিশেষ করে বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর শিল্পের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন কার্বন নিঃসরণ, জ্বালানি দক্ষতা, পানি ব্যবহার ও পরিবেশগত কর্মদক্ষতার গুরুত্ব বাড়ছে। ফলে সবুজ অর্থায়ন শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়; এটি আমাদের শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, রপ্তানি বাজার ধরে রাখা এবং ভবিষ্যৎ বাজারে প্রবেশাধিকারের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
দেশ রূপান্তর : আপনার ব্যাংকের মোট ঋণ বিতরণের কত শতাংশ বর্তমানে গ্রিন ও সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সে যাচ্ছে? আগামী দিনে এ খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর পরিকল্পনা কী?
মোহাম্মদ ফিরোজ আলম : সবুজ ও টেকসই অর্থায়ন সিটি ব্যাংকের ব্যবসায়িক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০২৫ সালে সিটি ব্যাংকের গ্রিন ফাইন্যান্স মোট মেয়াদি ঋণ বিতরণের ৩৬.৫৭ শতাংশ এবং সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স মোট ঋণ বিতরণের ৭৯.২৭ শতাংশে পৌঁছেছে। বিগত বছরগুলোতেও আমরা ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত টার্গেট অতিক্রম করেছি। তারই ফল হিসাবে গত পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবিলিটি রেটিংয়ে জায়গা করে নিয়েছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সাসটেইনেবিলিটি রেটিং এ আমরা দেশের সেরা (১ম) টেকসই ব্যাংক হয়েছি। অর্থাৎ এ খাতে আমাদের অবস্থান নিয়ন্ত্রক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় যথেষ্ট শক্তিশালী।
আমাদের লক্ষ্য শুধু অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ানো নয়, অর্থায়নের গুণগত মান ও পরিবেশগত প্রভাবও বাড়ানো। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি ও সম্পদ-দক্ষ যন্ত্রপাতি, পরিবেশবান্ধব শিল্প ও ভবন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো এবং টেকসই কৃষির মতো খাতে আমরা অর্থায়ন আরও সম্প্রসারণ করতে চাই। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমূল্যের অর্থের উৎস বাড়ানো আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ফাইন্যান্স নীতিমালা বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলো কতটা সফল?
মোহাম্মদ ফিরোজ আলম : বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ফাইন্যান্স নীতিমালা বাস্তবায়নে খাত হিসেবে ব্যাংকগুলো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে নির্ধারিত টার্গেট পূরণ, নিয়মিত রিপোর্টিং কাঠামো তৈরি এবং গ্রিন ট্যাক্সোনমির সঙ্গে ঋণ প্রক্রিয়া সমন্বয় করা এখন অনেক ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। যেমন যোগ্য প্রকল্প যাচাইয়ে মানসম্মত মানদণ্ডের অভাব, ‘গ্রিন’ হিসেবে চিহ্নিত ঋণের প্রকৃত পরিবেশগত প্রভাব যাচাইয়ে তথ্যের ঘাটতি এবং ছোট ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা ও বড় ব্যাংকগুলোর সক্ষমতার মধ্যে ফারাক। ফলে অনেক ক্ষেত্রে গ্রিন ফাইন্যান্সের পরিমাণগত টার্গেট পূরণ হলেও সেই অর্থায়নের প্রকৃত পরিবেশগত ফল কতটা অর্জিত হচ্ছে, তা যাচাই করা কঠিন হয়ে যায়। এ ফারাক কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর নিজস্ব সক্ষমতা বিশেষত প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন জনবল ও ডেটা অবকাঠামো তৈরি করা জরুরি, যাতে নীতিমালা শুধু কমপ্লায়েন্সের বিষয় না হয়ে বাস্তব পরিবেশগত পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
দেশ রূপান্তর : গ্রিন প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা কোথায় যোগ্য প্রকল্পের অভাব, উদ্যোক্তার সক্ষমতা, উচ্চ বিনিয়োগ ব্যয়, নাকি অর্থায়নের ঝুঁকি?
মোহাম্মদ ফিরোজ আলম : সবচেয়ে বড় সমস্যা সবুজ প্রকল্পের অভাব নয়, বরং ব্যাংকের অর্থায়নযোগ্য সবুজ প্রকল্পের ঘাটতি। অনেক প্রকল্প পরিবেশগত ও সামাজিকভাবে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়; কিন্তু সেগুলোর আয়, নগদ প্রবাহ, বিনিয়োগ ফেরতের সময় এবং ঝুঁকি এমনভাবে কাঠামোবদ্ধ নয়, যাতে একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রচলিত ঋণমানদণ্ডে সহজে অর্থায়ন করতে পারে।
সবুজ প্রকল্পে সাধারণত প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি এবং অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ফেরত পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। অন্যদিকে ব্যাংকের আমানতের বড় অংশ তুলনামূলক স্বল্পমেয়াদি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের জন্য স্বল্পমূল্যের ও দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের সীমাবদ্ধতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা।
উদ্যোক্তার সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় একটি ভালো সবুজ ধারণা থাকে; কিন্তু যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন, নির্ভরযোগ্য আর্থিক প্রক্ষেপণ বা পরিবেশগত সুফল পরিমাপের সক্ষমতা থাকে না। তখন প্রকল্পটি পরিবেশের জন্য ভালো হলেও ব্যাংকের কাছে তার ঝুঁকি ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা স্পষ্ট হয় না। এখানে ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থাও প্রয়োজন। বিশেষ করে নতুন প্রযুক্তি বা তুলনামূলক নতুন খাতে শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংকের অর্থ দিয়ে দ্রুত অর্থায়ন বাড়ানো কঠিন। স্বল্পমূল্যের জলবায়ু তহবিল, ঋণ নিশ্চয়তা, প্রথম তহবিল ক্ষতি বহনের ব্যবস্থা এবং মিশ্র অর্থায়ন ব্যবহার করা গেলে ঝুঁকি কমবে এবং অনেক প্রকল্প অর্থায়নযোগ্য হয়ে উঠবে।
দেশ রূপান্তর : নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে আপনার ব্যাংক কী ধরনের বিশেষ ঋণ সুবিধা বা প্রণোদনা দিচ্ছে?
মোহাম্মদ ফিরোজ আলম : সিটি ব্যাংক নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণীয় করতে গ্রাহকদের জন্য গ্রিন ও টেকসই ঋণে তুলনামূলক কম সুদের হার প্রদান। এ ছাড়া যোগ্য সবুজ প্রকল্পের জন্য সুবিধাজনক ঋণ সুবিধা প্রদান করা হয়, যা প্রকল্পের ধরন, পরিবেশগত প্রভাব এবং আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নির্ধারণ করা হয়। ছোট ও মাঝারি গ্রাহকদের সক্ষমতা সীমিত থাকলে তাদের জন্য ব্যাংক হ্যান্ডহোল্ডিং ও পরামর্শ সেবা প্রদান করে। প্রকল্প প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় নথিপত্র, কারিগরি ও পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ এবং অর্থায়ন প্রক্রিয়া সহজ করতে বিশেষজ্ঞ টিম সক্রিয়ভাবে সহায়তা করে।
এ ছাড়া সিটি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা ব্যবহার করে গ্রাহকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করছে।
দেশ রূপান্তর : ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সক্ষমতা কম। তাদের গ্রিন ট্রানজিশনে সহায়তা করতে কী ধরনের সহজ শর্তের অর্থায়ন প্রয়োজন?
মোহাম্মদ ফিরোজ আলম : ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি পৃথক ও নিবেদিত সবুজ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা যেতে পারে। এতে ব্যাংকগুলো কম খরচে তহবিল পাবে এবং উদ্যোক্তাদেরও তুলনামূলক কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন দেওয়া সম্ভব হবে। এ খাতের অর্থায়নের শর্ত বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের তুলনায় নমনীয় হওয়া দরকার। প্রকল্পের প্রকৃতি অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, যুক্তিসংগত অবকাশকাল এবং সহজ পরিশোধ কাঠামো রাখতে হবে, যাতে প্রযুক্তি থেকে আর্থিক সাশ্রয় শুরু হওয়ার পর ঋণ পরিশোধের চাপ আসে। একই সঙ্গে শুধু জামানতনির্ভর ঋণের পরিবর্তে উদ্যোক্তার ব্যবসার নগদ প্রবাহ, প্রকল্পের আয়-সাশ্রয়ের সক্ষমতা এবং ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য বিবেচনায় অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের পক্ষ থেকে গ্রিন ফাইন্যান্স বাড়াতে আর কী ধরনের নীতি সহায়তা, পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা বা প্রণোদনা দেওয়া উচিত বলে মনে করেন?
মোহাম্মদ ফিরোজ আলম : গ্রিন ফাইন্যান্স বাড়াতে শুধু অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ যথেষ্ট নয়; বরং স্বল্পমূল্যের দীর্ঘমেয়াদি তহবিল, ঝুঁকি ভাগাভাগি, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং প্রকল্প তৈরিতে কারিগরি সহায়তা এই চারটি ক্ষেত্রে আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া সরকার কর সুবিধা, শুল্ক সুবিধা এবং অন্যান্য প্রণোদনার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয় কমাতে পারে।
দেশ রূপান্তর : আপনার ব্যাংকের নিজস্ব কার্যক্রমে কার্বন নিঃসরণ কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার ও কাগজবিহীন ব্যাংকিং চালুর ক্ষেত্রে কী উদ্যোগ রয়েছে?
মোহাম্মদ ফিরোজ আলম : সিটি ব্যাংক নিজস্ব কার্যক্রমে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং পরিবেশগত প্রভাব হ্র্রাসকে টেকসই ব্যাংকিং কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এ লক্ষ্যে ব্যাংকের শাখা ও কার্যালয়ে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও পানি সাশ্রয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং কাগজের ব্যবহার কমানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সিটি ব্যাংক ২০২২ সাল থেকে দেশের প্রথম ব্যাংক হিসেবে জাতিসংঘের নেট-জিরো ব্যাংকিং উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। এই অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে আমরা ব্যাংকের নিজস্ব কার্যক্রমের পাশাপাশি ঋণ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে গ্রাহকদের কার্যক্রম থেকে সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণ পরিমাপ ও পর্যবেক্ষণ করে আসছি। একই সঙ্গে এসব নিঃসরণ পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ এবং গ্রাহকদের কম-কার্বন ও পরিবেশবান্ধব ব্যবসায়িক কার্যক্রমে রূপান্তরে উৎসাহিত করছি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে উপযুক্ত শাখা ও কার্যালয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ সম্প্রসারণের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, দক্ষ আলোকব্যবস্থা ও অন্যান্য জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খরচ ও সংশ্লিষ্ট কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ রয়েছে।
কাগজবিহীন ব্যাংকিং আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। গ্রাহকসেবা ও অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে ডিজিটাল নথি, ইলেকট্রনিক অনুমোদন, অনলাইন সেবা ও ডিজিটাল যোগাযোগের ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে কাগজের ব্যবহার কমানো হচ্ছে। এর ফলে শুধু কাগজের ব্যবহারই কমছে না, নথি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সময় ও ব্যয়ও কমছে।
আমাদের লক্ষ্য হলো শুধু গ্রিন প্রকল্পে অর্থায়ন করা নয়; বরং ব্যাংকের নিজস্ব কার্যক্রমকেও ধাপে ধাপে আরও জ্বালানি-সাশ্রয়ী, কম-কার্বন ও পরিবেশবান্ধব করা। এর মাধ্যমে আমরা গ্রাহকদের জন্য যেমন সবুজ অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করছি, তেমনি নিজেদের কার্যক্রমের মাধ্যমেও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই।
দেশ রূপান্তর : আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে গ্রিন ফাইন্যান্স কোথায় দেখতে চান? আপনার ব্যাংকের এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য কী?
মোহাম্মদ ফিরোজ আলম : আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে গ্রিন ফাইন্যান্সকে একটি নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক অর্থায়ন থেকে মূলধারার ব্যাংকিংয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে চাই। আমার প্রত্যাশা হলো আগামী পাঁচ বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা, পরিবেশবান্ধব শিল্প, বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোর মতো খাতে গ্রিন অর্থায়নের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
সিটি ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের সবুজ ও টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা। এ লক্ষ্যে আমরা গ্রিন ফাইন্যান্সের পাশাপাশি ট্রানজিশন ফাইন্যান্স, জলবায়ু অর্থায়ন এবং টেকসই অর্থায়নকে আরও সম্প্রসারিত করতে চাই। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের সবুজ রূপান্তরে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে আমরা অর্থায়নের পরিমাণের পাশাপাশি প্রকৃত পরিবেশগত ফলকে গুরুত্ব দিতে চাই; যেমন কত জ্বালানি সাশ্রয় হয়েছে, কত কার্বন নিঃসরণ কমেছে এবং কতটা নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে গ্রিন ফাইন্যান্স শুধু একটি নিয়ন্ত্রক লক্ষ্যমাত্রা পূরণের বিষয় না হয়ে বাস্তব অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।
সবশেষে, আমার বিশ্বাস আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের গ্রিন ফাইন্যান্স খাতের সাফল্য শুধু কত টাকা গ্রিন ফাইন্যান্স দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে পরিমাপ করা হবে না; বরং অর্থায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনীতিকে কতটা কম-কার্বন, জলবায়ু-সহনশীল এবং ভবিষ্যৎ বাজারের জন্য প্রতিযোগিতামূলক করা গেছে, তার ভিত্তিতেই সাফল্য মূল্যায়ন করা হবে। সিটি ব্যাংক এ রূপান্তরে নেতৃত্বদানকারী ব্যাংকগুলোর একটি হতে চায়।