গ্রিন ফাইন্যান্সে বদলাবে দেশের অর্থনীতি

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, জ্বালানি সাশ্রয় এবং শিল্প উৎপাদনে পরিবেশের ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে গ্রিন ইকোনমি। বাংলাদেশও সেই পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা, গ্রিন বিল্ডিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বাড়ছে বিনিয়োগের সুযোগ। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রিন ফাইন্যান্সও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে।

সরকারের ডেল্টা প্ল্যান-২১০০, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং জাতীয় টেকসই অর্থায়ন নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবেশবান্ধব শিল্পে অর্থায়ন বাড়াতে নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গ্রিন রিফাইন্যান্স, টেকসই অর্থায়ন এবং পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ২৮৪টি লিড সার্টিফায়েড পোশাক কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে ১২১টি প্লাটিনাম এবং ১৪৪টি গোল্ড রেটেড। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর এই পরিবর্তন আনতে পদক্ষেপ নেন ব্যবসায়ীরা। দেশের পোশাক খাতের ওপর আস্থা ফেরাতে সহযোগিতার উদ্যোগ নেয় ব্যাংকগুলো।

একটি লিড সার্টিফায়েড বা পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি আধুনিক সবুজায়ন কারখানায় রূপ দিতে ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন। সাধারণ কারখানার তুলনায় এর নির্মাণ খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। তবে অর্থায়নের পরিমাণ বাড়লেই যে অর্থনীতি সবুজ হয়ে যাবে, বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। গ্রিন বিনিয়োগের রিটার্ন পেতে দীর্ঘ সময় লাগার কারণে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে জানান খাত সংশ্লিষ্টরা।

খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, গ্রিন ইকোনমিকে অনেক সময় শুধু পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা হলেও এর প্রভাব অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতেই পড়ছে। কম জ্বালানি ব্যবহার, উৎপাদন ব্যয় কমানো, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব।

বাংলাদেশের মতে রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক বাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের চাহিদা বাড়ছে। ফলে পোশাক, চামড়া, সিরামিক, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশগত মান নিশ্চিত করতে হবে। এ কারণে গ্রিন ফাইন্যান্স এখন শুধু ব্যাংকের একটি বিশেষ ঋণ কর্মসূচি নয়; বরং ভবিষ্যতের শিল্প ও রপ্তানি সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি অর্থনৈতিক বিষয়।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও টেকসই বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন গ্রিন ফান্ড গঠন করেছে। এ তহবিল থেকে পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা ও গ্রিন বিল্ডিং নির্মাণে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যাবে, যার সুদহার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২ শতাংশ সুদে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পাবে। ঋণের মেয়াদ হবে ৩ থেকে ১০ বছর, গ্রেস পিরিয়ড সর্বোচ্চ এক বছর। প্রকল্পে উদ্যোক্তার নিজস্ব অর্থায়ন থাকতে হবে অন্তত ৩০ শতাংশ এবং গ্রিন সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক। খেলাপি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা পাবে না। তহবিলের অর্থ অপব্যবহার হলে জরিমানার পাশাপাশি পুরো অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে ফেরত দিতে হবে। 

তবে উদ্যোক্তারা মনে করেন, সাধারণ ঋণের পাশাপাশি গ্রিন ফাইন্যান্সের মাধ্যমে কম খরচে ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন পাওয়া গেলে শিল্পের প্রযুক্তিগত রূপান্তর দ্রুত করা সম্ভব।

ব্যাংক কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদ মাজেদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুধু কোনো প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব একটি উপাদান থাকলেই সেটিকে গ্রিন প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব, জ্বালানি ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করতে হয়। সবুজ অর্থনীতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক যে ঋণ সুবিধা দিয়ে আসছে এর সঠিক ব্যাবহার নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। সবুজ অর্থনীতি গড়তে হলে উদ্যোক্তাদের আরও আন্তরিক হতে হবে। বিশে^র অনেক জায়গায় দেখা যায়, গাছ না কেটে বাণিজ্যিক কার্যালয় বা অফিস তৈরি করতে কিন্তু আমাদের দেশে এমন চিন্তাশীল মানুষের অভাব রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পরিবেশবান্ধব শিল্পে অর্থায়নের জন্য ২০১৬ সালে ২০ কোটি ডলারের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড চালু হয়। পরে এতে আরও ২০ কোটি ইউরো যুক্ত করা হয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডলার অংশ থেকে ১৪০ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলার এবং ইউরো অংশ থেকে ৭১ দশমিক ২১ মিলিয়ন ইউরো বিতরণ করা হয়েছে। এ দুই অংশে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের সংখ্যা যথাক্রমে ৩০ ও ২৬টি। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে চালু হওয়া ৫ হাজার কোটি টাকার স্থানীয় মুদ্রার জিটিএফ থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ২৫টি ব্যাংকের মাধ্যমে ৯৬ গ্রাহককে ২ হাজার ৫২৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ৬টি ব্যাংকের ৯ গ্রাহককে ২৫৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়।

অন্যদিকে, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে ১ হাজার কোটি টাকার টিডিএফ রয়েছে। এ তহবিলের আওতায় রয়েছে ৩৫টি শিল্প খাত। বর্তমানে ৩১টি ব্যাংক ও ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ তহবিলে যুক্ত রয়েছে। ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ১ হাজার ১০৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দুটি প্রকল্পে বিতরণ করা হয়েছে ১৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ৩ হাজার ৩৯৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা সবুজ অর্থায়ন এবং ১ লাখ ৫৭ কোটি ২ লাখ টাকা টেকসই অর্থায়ন করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রিন ইকোনমিতে রূপান্তরের জন্য শুধু ব্যাংকিং খাতকে দায়িত্ব দিলে হবে না। সরকারের নীতি সহায়তা, ব্যাংকের অর্থায়ন, উদ্যোক্তার বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি খাতের সক্ষমতা, সবগুলোকে সমন্বিতভাবে এগোতে হবে।

জলবায়ু অর্থায়ন ও সুশাসন বিশেষজ্ঞ এম জাকির হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রামীণ শিল্পের সবুজ রূপান্তরে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন তহবিল গঠন করলেও এর সফলতা নির্ভর করে সহজ ও কার্যকর ঋণ বিতরণের ওপর। অতিরিক্ত কাগজপত্র, জটিল শর্ত ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় বরাদ্দ থাকা অর্থও উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায় না। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে এনজিওগুলোর মাঠপর্যায়ের নেটওয়ার্ক কাজে লাগানো যেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, অংশগ্রহণকারী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ হচ্ছে। প্রতিটি আবেদন, প্রকল্প ও তহবিল ব্যবহারে নিবিড় তদারকির মাধ্যেমে ঋণ দেওয়া হয়। তিনি বলেন এই খাতের অর্থ প্রকৃত উৎপাদনমুখী ও পরিবেশবান্ধব খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।