নাজুক জ্বালানি পরিস্থিতিতে ঢাকায় ফিরেছে লোডশেডিং

জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ায় দীর্ঘদিন পরে রাজধানীতে ফিরেছে লোডশেডিং। দিনে-রাতে নিয়ম করে ঢাকার সব এলাকায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা লোডশেডিং করা হচ্ছে। আগে গ্রামীণ অঞ্চলে লোডশেডিং করা হলেও রাজধানীকে আওতামুক্ত রাখা হতো। এখন এর উল্টো ঘটছে। ঢাকায় লোডশেডিং করে গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। অন্তত গত দুদিনের বিদ্যুৎ বিতরণ চিত্র সে কথাই বলছে। সহসা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট থেকে মুক্তি মেলার আশা না থাকলেও আজ রবিবার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।

মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনালে গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর সংকট শুরু হয়। টার্মিনালটি ক্ষতি সারিয়ে উৎপাদনে ফিরলেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। এর প্রধান কারণ, টার্মিনাল দিয়ে খালাস করার জন্য গ্যাস আনতে পারেনি সরকার। আবার গ্যাস এলেই সংকট পুরোপুরি কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানার চাকা যেমন ঘুরছে না, তেমনি বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান থেকে শুরু করে বিদ্যুৎমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী এ পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

আশার খবর হচ্ছে আজ রবিবার এক কার্গো এলএনজি আসার কথা ছিল। দেশে সংকটের কথা জানিয়ে দ্রুত আসার অনুরোধ করায় সেই কার্গোটি গতকাল বিকেলে মহেশখালীতে পৌঁছেছে। এরপর বিকেল ৪টায় এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি গ্যাস সরবরাহ করার জন্য তাদের বয়লার চালু করে। এতে সরবরাহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে বলে জানান পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে দৈনিক চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হতো। এখন একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় সরবরাহ আরও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমেছে। এতে করে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। চাহিদার ৪৫ ভাগই সরবরাহ করা যাচ্ছে না। দুটি টার্মিনাল ঠিক থাকলেও মোট চাহিদার ৬৭ ভাগের বেশি গ্যাস সরবরাহ সম্ভব নয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোনোভাবেই গ্যাস সংকটের দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়। আগামী দুই বছর বা তারও বেশি সময়ের মধ্যে দেশে গ্যাসের উৎপাদন উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ দেশের স্থলভাগে এত বিপুল গ্যাসের আধার কোনো জরিপে পাওয়া যায়নি। কেবল গভীর ও অগভীর সমুদ্রে গ্যাস পাওয়া গেলে সংকট কাটতে পারে। তবে সাগরে অনুসন্ধান শুরুর পর গ্যাস পাওয়া গেলে অন্তত আট থেকে ১০ বছর সময় লাগতে পারে তা গ্রিডে যোগ করতে।

এর চেয়ে চটজলদি সমাধান হচ্ছে মহেশখালীতে আরও একটি টার্মিনাল নির্মাণ করে গ্যাসের আমদানি বাড়ানো। তবে সেই কাজ করতেও দুই বছরের মতো সময় প্রয়োজন হবে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৬ ও ২০২৭ সালে গ্যাসের সংকটের কথা চিন্তা করে দুটি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দিয়েছিল। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার সেই কাজ বাতিল করে দেয়। এতে করে এখনকার সংকট থেকে বের হওয়ার দ্রুত কোনো উপায় সরকারের হাতে নেই। বর্তমান সরকার চীনের একটি প্রতিষ্ঠানকে মহেশখালীতে একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এখনো তাদের সঙ্গে চুক্তি করতে পারেনি। চীনা কোম্পানিটি চুক্তি সই হওয়ার ২২ মাসের মধ্যে টার্মিনাল স্থাপনের কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ঢাকায় লোডশেডিং করে গ্রামে বিদ্যুৎ : শুক্রবার পিক আওয়ার (রাত ৯টায়) সারা দেশে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চাহিদা ছিল ১০ হাজার ৩৩৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ৯ হাজার ৭৪১ মেগাওয়াট। অর্থাৎ লোডশেডিং করা হয়েছে ২৫৮ মেগাওয়াট। মূলত ঢাকায় লোডশেডিং করে গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। সরকারি হিসাবে শুক্রবার রাত ৯টায় লোডশেডিং ছিল ৫৪০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে আরইবি এলাকায় ৮০টি সমিতিতে লোডশেডিং করা হয়েছে ২৫৮ মেগাওয়াট এবং সারা দেশের অন্য সব গ্রাহকের লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ২৮২ মেগাওয়াট।

তবে রাতের বেলা এবং দিনের বেলা এখন পিক আওয়ারের (রাত ৯টা) চেয়ে বেশি লোডশেডিং করা হয়। বিদ্যুৎ বিতরণকারী কর্র্তৃপক্ষ মনে করছে, রাত ১১টার আগে মানুষ রাতের খাবার খায় এবং ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়। এ সময় লোডশেডিং বিরক্তিকর হতে পারে বলে তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা বেশি করা হয়। এরপর মানুষ ঘুমিয়ে গেলে লোডশেডিং করা হয়।

শুক্রবার ঘণ্টাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ঘাটতির কারণে ভোররাতে লোডশেডিংয়ের চাপ ছিল সবচেয়ে বেশি। শুক্রবার রাত ১টায় চাহিদা ১৬ হাজার ৩৩৪ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ২১৬ মেগাওয়াট, ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ২ হাজার ১১৮ মেগাওয়াট, যা দিনের সর্বোচ্চ। রাত ২টা ও ৩টায়ও ঘাটতি ছিল যথাক্রমে ২ হাজার ৯৯ ও ২ হাজার ৩৫ মেগাওয়াট।

তবে পরদিন সকালের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির উন্নতি হয় এবং বেলা ১১টায় চাহিদা ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ হয় ১৪ হাজার ৩৮৯ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি নেমে আসে মাত্র ১১ মেগাওয়াটে। শনিবার দুপুরে আবার ঘাটতি বাড়লেও বিকেল পর্যন্ত তা ভোররাতের তুলনায় কম ছিল। শুক্রবার রাত ৯টায় (পিক আওয়ারে) চাহিদা ১৬ হাজার ১০৭ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৫ হাজার ৫৬৭ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৫৪০ মেগাওয়াট।

গ্যাসের তীব্র সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া, ময়মনসিংহের ভালুকা ও গাজীপুরের শ্রীপুরের শিল্পাঞ্চল। এসব এলাকার বহু কারখানা জ্বালানি সংকটে বন্ধ রয়েছে। সূত্র বলছে, এর মূল কারণ হচ্ছে পর্যাপ্ত গ্যাসের সরবরাহ না পাওয়া। পিজিসিবির হিসাবে, শুরুতে গত ২১ জুলাই এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন অন্তত ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট কমানো হয়। তবে সারা দেশে তীব্র লোডশেডিং শুরু হলে সরকার সমালোচনার মুখে পড়ে। তখন বিদ্যুতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে শিল্পে সরবরাহ বাড়ানো হয়। এরপর লোডশেডিং শুরু হলে শিল্পে সরবরাহ কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হয়। এখন গ্যাস থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এতে শিল্পে সংকট দেখা দিচ্ছে। সরকারের হাতে বিকল্প তরল জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ থাকলেও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে তা করা হচ্ছে না।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশীয় গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আমরা সরকারকে অনেক আগে থেকে সতর্ক করে আসছিলাম। কিন্তু সরকার সে অনুযায়ী কাজ করেনি।’

সাবেক আওয়ামী লীগের সরকারের সময়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালে প্রথম এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পর তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দিতেও ওই সরকার দেরি করেছে। যেহেতু আমাদের দেশে গ্যাস নেই, তাই আমদানির বিকল্পও নেই। তাহলে আমরা কি আমদানি না করে শিল্পকারখানা ধ্বংস করব?’

অন্যদিকে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যে বিপুল পরিমাণ ঘাটতি রয়েছে, তা কোনো সরকার স্বীকার করে না। এটাই বড় সমস্যা। আমরা দেশীয় জ্বালানি সংস্থানের চেষ্টাও করিনি। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানও সেভাবে শুরু করতে পারিনি। এখন তাই সংকট আমাদের ঘিরে ধরেছে।’