ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের এই সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোকে কড়া সতর্ক বার্তা দিয়েছে ইরান। দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মোহসেন রেজাই বলেছেন, ইরানের অর্থনীতি পঙ্গু করতে ওয়াশিংটনের প্রচেষ্টায় কোনো আঞ্চলিক দেশ অংশ নিলে তাদের করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে। গত শনিবার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন তিনি। রেজাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেনÑ প্রতিবেশী দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত এই ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ অংশ নেয়, তবে পারস্য উপসাগর থেকে তেল পরিবহনের বিকল্প রুটগুলোতে হামলা চালাবে ইরান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘ওই প্রতিবেশী দেশগুলোকে শত্রু হিসেবে গণ্য করা হবে এবং আমরা তাদের স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু বানাব’।
সাক্ষাৎকারে রেজাই দাবি করেন, চলমান এই সংঘাতমূলক পরিস্থিতিতে তেহরানের কাছে কৌশলগত আরও অনেক বিকল্প রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অর্থনৈতিক স্বার্থে আঘাত হানিনি’। রেজাই আরও বলেন, ‘এ পর্যন্ত আমরা কেবল তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছি। তবে তারা যদি আমাদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চায়, তবে ইরানের আশপাশে ও অন্যান্য স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব তেল কোম্পানি ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, আমরা সেগুলোতে হামলা চালাব’। ইরানের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাত গত মঙ্গলবার ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তেহরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত রাখছে।
সাক্ষাৎকারে মোহসেন রেজাই ইরানের আঞ্চলিক কৌশলকে তিন পর্যায়ের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেন। এ কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা কমানো। রেজাই বলেন, ‘প্রথমত আমরা আলোচনা করব। তারপর সুন্দর ভাষায় তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করব। কারণ, আমরা আসলে যুদ্ধ ছড়াতে চাই না। এরপরও যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়া বজায় রাখবে, তাদের পুনর্বিবেচনার জন্য কিছুটা সময় দেব। তবে তৃতীয় পর্যায়ে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’ গত সপ্তাহে ট্রাম্প ইরানের অর্থনীতিকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে এক নতুন প্রচারের ঘোষণা দেন। তেহরানকে কোনো প্রকার সহায়তা দেওয়া বা তাদের সঙ্গে ব্যবসা করা যেকোনো দেশের ওপর ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’ নামিয়ে আনার হুমকি দেন তিনি। সংঘাতের কোনো কার্যকর সমাধান ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা এই অজনপ্রিয় যুদ্ধ প্রায় ছয় মাসের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার মুখে ট্রাম্প এই হুমকি দিলেন।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরান দ্রুত এ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। ফলে বিশ্ববাজারে তেল, সারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশ আগে রপ্তানির জন্য এ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা বিকল্প বাণিজ্য পথ খুঁজতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জাতিসংঘভুক্ত সদস্যদেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এ নীতিকে ‘বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব’ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বলে মন্তব্য করেছে তারা। তেহরান এখন উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরেও তাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকা বাড়ানোর কথা ভাবছে বলে জানা গেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের অভিযানকে সমর্থন দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্রদের ওপরও আঘাত হানতে পারে ইরান।