বৃষ্টিভেজা কেশরাজ

‘কেতকী কেশরে কেশপাশ করো সুরভি

ক্ষীণ কটিতটে গাঁথি লয়ে পর করবী,

কদম্ব রেণু বিছাইয়া দাও শয়নে

অঞ্জন আঁকো নয়নে ॥’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মানুষের সৌন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দু হলো তার মুখমণ্ডল। আর সে মুখমণ্ডলকে দীপ্তিময় ও বিকশিত করে তোলে তার কালোকেশ বা চুল। ঘন আঁধার মাখা রাতে যেমন পূর্ণচন্দ্র বিকশিত হয় তেমনই মুখমণ্ডলের শোভা বিকশিত হয় ঘন কালো চুলের ভেতর দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেসব জানতেন। আর আমাদের মা-ঠাকুমারাও সে কথা জানতেন যে, কেশ কালো হবে কী করে? গ্রামে কন্যাদের ঘন কালো লম্বা চুল দিয়ে কেশবতী করার প্রয়াস থাকত তাদের ছোটবেলা থেকেই। সেজন্য তারা প্রায়ই একটি গাছের কাণ্ড ও পাতা ব্যবহার করতেন। সেটিই হলো কেশুটি বা কেশরাজ গাছ।

ফুল-পাতা-বৃষ্টি, এ যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি। উল্টোরথের দিন, শ্রাবণের আকাশ ভেঙে জল ঝরছে। মাঠ-ঘাট, পথ-প্রান্তর জলে থই থই। তেরছা হয়ে দমকে দমকে বৃষ্টির ঝাপটা এসে ছাতার তল দিয়ে হাঁটু অবধি ভিজিয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে হঠাৎ চোখ পড়ল বৃষ্টিভেজা ফুলগুলোর ওপর। বৃষ্টির কণা মাখা সবুজ পাতা-আহা কী আনন্দময় সে দৃশ্য! খুলনায় দৌলতপুরে এক নগর পথে শ্রাবণের সকালে ছাতা মাথায় হাঁটতে গিয়ে দেখা হলো কালো মেঘে ঢাকা বিশাল আকাশের তলে এক খুদে সাদা ফুলের সঙ্গে। নাম তার কেশুটি, কেশরাজও বলে কেউ কেউ।

গাছটাকে দেখে ছোটবেলার স্মৃতিরাও যেন ময়ূরের মতো পেখম মেলে দিল। ছোটবেলায় ঘন কালো চুল হবে বলে মা-ঠাকুরমারা কত বার যে ন্যাড়া করে দিত! তারপর বাড়ির পেছনের ডোবামতো জংলা জায়গা থেকে এক আঁটি গাছ তুলে শিলপাটায় পিষে কাইয়ের মতো করে তার রস মেখে দিত টাকের ওপর। কিছুক্ষণ থাকার পর সে রস শুকিয়ে চড়চড় করত। এরপর স্নান। পরপর কয়েক দিন ধরে চুল গজানো পর্যন্ত স্নানের আগে চলত সেই চিকিৎসা। বলত, খুদখুস্তি গাছ। এর ডালপাতার রস টাকে মাখলে চুল ঘন আর কালো হয়। বড় হয়ে কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার সময় আগাছা চিনতে গিয়ে সেই গাছটাকে আবার চিনতে হলো। কিন্তু তখন ওর নামটা বদলে গেল, হয়ে গেল কেশুটি; কেউ বললেন কেশুতি। অন্য নাম পেলাম কেশরাজ। সবই কেশের খেলা। তার মানে সে গাছের নামের সঙ্গে গুণেরও একটা সম্বন্ধ আছে। কেশ মানে চুলকে ঘন, কালো, মজবুদ করার জন্য এ গাছের রসের ব্যবহার সুপ্রাচীনকাল থেকে পল্লী অঞ্চলে প্রচলিত রয়েছে।

জানা গেছে, এ গাছের পাতা, ফুল, ফল, কাণ্ড অর্থাৎ শিকড় বাদে পুরো গাছ বেটে রস করে নিয়তিভাবে কয়েক দিন মাথায় মাখলে মাথা ঠান্ডা হয়, চুলপড়া বন্ধ হয়, চুল লম্বা ও কালো হয়। পরপর বারো দিন সে রস নাকি মাখতে হয়, তাহলে উপকারটা বোঝা যায়। যারা রোজ এ গাছ সংগ্রহ ও রস তৈরি করতে পারেন না তারা একবার বেশি করে রস তৈরি করে এক কাপ রসের সঙ্গে ২৫০ মিলিলিটার তিল বা নারকেলের তেল মিশিয়ে বোতলে ভরে রেখে দিতে পারেন ও তা পরে কয়েক দিন ধরে ব্যবহার করতে পারেন। হঠাৎ করে শরীরের কোথাও অল্প কেটে গেলে সেই কাটা জায়গায় কেশরাজের পাতা বেটে মলমের মতো লাগিয়ে দিলে রক্ত পড়া বন্ধ হয় ও ধীরে ধীরে কাটা জায়গা শুকিয়ে যায়। কয়েকটা পাতা বেটে খেলে কৃমি ও কাশির উপশম হয়। লিখতে বসে ভাবছি, এই যার গুণ সে গাছটি আসলে কেমন? কী করে চেনা যাবে তাকে?

কেশরাজ গাছের ইংরেজি নাম ফলস ডেইজি। এর ফুল দেখতে কিছুটা ডেইজি ফুলের মতো, কিন্তু ডেইজি ফুলের চেয়ে অনেক ছোট। ডেইজি ও কেশরাজ একই গোত্রের গাছ, কেশরাজের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Eclipta prostrata  ও গোত্র অ্যাস্টারেসি। এ দেশে এ গাছ আগাছা, পতিত জমি, ফসলের খেতে, নিচু ও স্যাঁতসেঁতে জায়গায় বেশ জন্মে। বর্ষজীবী বিরুৎ প্রকৃতির গাছ, উচ্চতায় ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। শাখা লতানে স্বভাবের। কাণ্ড নলাকার সরু, ভরাট, লালচে-বেগুনি, খাটো ও সূক্ষ্ম পশমাবৃত। পাতা লম্বাটে, কাণ্ডের গিঁট থেকে বিপরীত মুখীভাবে জন্মে, পাতার উভয় পিঠ খসখসে ও সূক্ষ্ম পশমাবৃত, অগ্রভাগ সুচালো, কিনারা কিছুটা খাঁজকাটা, রঙ ধূসর সবুজ। শাখা-প্রশাখার আগায় এককভাবে ফুল ফোটে, ফোটা ফুল দেখতে চক্রাকার, মাঝখানে বীজাধার থেকে সূর্যের রশ্মির মতো অনেকগুলো রৈখিক সাদা পুষ্পিকা ছড়িয়ে থাকে। বৃতি পাঁচটি। মাঝখানের বীজাধার কিছুটা উঁচু গম্বুজের মতো, সেখানে ক্ষুদ্র অনেক ফল ও বীজ থাকে। বীজ দেখতে অনেকটা কালোজিরার মতো, কালো ও শক্ত। বীজ থেকে সহজে চারা হয়।

লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ