নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার জন্য অস্বাভাবিক কম দাম দিতে চাইছে বাংলাদেশে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন গঠিত কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে প্রতি ইউনিটের দাম ৬ টাকা ৪৮ পয়সা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বলা হচ্ছে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২০ ভাগ বিদ্যুৎ কিনবে সরকার। বাকি বিদ্যুৎ নিজস্ব গ্রাহকের কাছে বিক্রি করবে উদ্যোক্তা।
সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। নির্দিষ্ট ট্যারিফ দিয়ে সঞ্চালন এবং বিতরণ লাইনও ব্যবহার করে নিজস্ব গ্রাহকের কাছে বিক্রি করবে।
সূত্র বলছে নিজেদের আহ্বান করা সব শেষ দরপত্রে প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুতের দাম পায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সর্বনিম্ন ৭ দশমিক ৪৯ সেন্ট। প্রতি ডলারের দর ১২২ টাকা ৩২ পয়সা ধরে হিসাব করলে এক ইউনিট বিদ্যুতের দাম দাঁড়ায় ৯ টাকা ১৬ পয়সা। কিন্তু বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্রর প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রির জন্য পিডিবি দাম দিতে চাইছে ৬ টাকা ৪৮ পয়সা। দরপত্রে পাওয়া মূল্যের চেয়ে যার পরিমাণ প্রতি ইউনিটে ২ টাকা ৬৮ পয়সা কম।
নতুন এই বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২০ ভাগ বিদ্যুৎ কিনে নেবে পিডিবি। একই সঙ্গে যদি সাময়িকভাবে কোনো গ্রাহক বিদ্যুৎ না নেয় তাহলেও পিডিবির ওই বিদ্যুৎ কিনে নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ শিল্পকারখানার কাছে বিক্রি করে গ্রাহকভেদে শিল্পকারখানার জন্য বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ১২ টাকা ৭৩ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৮৫ পয়সা এমনকি পিডিবির গড় বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়ও ১০ টাকার কাছাকাছি। বেশি দামে উৎপাদন করে কম দামে বিক্রি করতে উদ্যোক্তারা আগ্রহী হবে কি না সেটি এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। এরপর আবার বিদ্যুৎ সঞ্চালন এবং বিতরণে বিতরণ কোম্পানিকে নির্দিষ্ট মাশুল দিতে হবে। যদিও শুনানিতে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ভারত এবং পাকিস্তানে ৩ টাকা ৮০ পয়সা এবং ৩ টাকা ৯০ পয়সা দরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। তবে সেখানে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে উদ্যোক্তাদের কী কী সুবিধা দেওয়া হয় তা তিনি উল্লেখ করেননি। তিনি বলেন, বেসরকারি খাত সরাসরি গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করলে বিতরণ কোম্পানিগুলোর ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের প্রস্তাবে এমন ধারণাই প্রতিফলিত হয়েছে। অথচ ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিতরণ কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে।
শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত বাড়তি ব্যয় বা ভর্তুকির দায় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের ওপর চাপানো উচিত নয়। মার্চেন্ট পাওয়ারের জন্য প্রস্তাবিত ট্রান্সমিশন ও মনিটরিং চার্জের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারীদের সংগঠন (বিজিএমইএ) এর ভাইস প্রেসিডেন্ট বিদ্যা অমৃত খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে বাংলাদেশের শিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে ২০৩০ সালের পর রপ্তানি ধরে রাখতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রমাণ দিতে হবে। এজন্য ওপেন-অ্যাকসেস চার্জে অন্তত ১০ বছরের জন্য ছাড় দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ডেফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, জ্বালানি খাতের অতীতের অনিয়ম ও অদক্ষতার দায় নতুন বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ওপর চাপানো উচিত নয়। কম দামে বিদ্যুৎ দিতে প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বুয়েটের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী বলেন, ওপেন-অ্যাকসেস চার্জ নির্ধারণে যথাযথ ও যাচাইযোগ্য বেঞ্চমার্ক দরকার। অবকাঠামো ও পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে ক্রস-সাবসিডি এক করে দেখা উচিত নয়। অতীতের ক্যাপাসিটি চার্জের দায়ও নতুন মার্চেন্ট পাওয়ারের ওপর চাপানো ঠিক হবে না।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিনিধি উপসচিব মো. সুলাইমান বলেন, বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা তৈরি করা যাবে না। সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জামের দাম কমলে মার্চেন্ট পাওয়ারে ব্যবসার সুযোগ আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন চেয়ারম্যান মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মার্চেন্ট পাওয়ারে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তত ১০ বছরের জন্য ওপেন-অ্যাকসেস চার্জে ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।
শুনানিতে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন আমরা সবার মতামত শুনলাম। এরপরও যদি কেউ আর কোনো মতামত দিতে চান, তাহলে লিখিত আকারে দিতে পারেন। আমরা যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত দেব।