শামসুর রাহমানের অগ্রন্থিত গদ্য

ধূসর পাণ্ডুলিপি, চর্যাগীতিকা এবং রক্তাক্ত প্রান্তর

—‘হ্যালো?’
—‘হ্যালো?’
—‘শামসুর রাহমান আছেন?’
—‘বলছি।’
—‘আমি মঞ্জুশ্রী দাশ।’
—‘কে?’
—‘আমি মঞ্জুশ্রী দাশ বলছি। আপনি আমাকে চিনবেন না। আমি জীবনানন্দ দাশের কন্যা।’
—‘এ কি বলছেন? চিনব না কেন? কবে এলেন ঢাকায়?’
—‘একুশে ফেব্রুয়ারির আগে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’
—‘আমার সৌভাগ্য।’
—‘কোথায় আপনার সঙ্গে দেখা হতে পারে?’
—‘আপনি কোথায় উঠেছেন?’
—‘ডক্টর অজয় রায়ের বাসায়।’
—‘ঠিক আছে। ওখানেই দেখা হবে’
—‘আপনি কেন কষ্ট করবেন? আমি আসব দেখা করতে।’
—‘ঢাকায় নতুন এসেছেন আপনি। পথঘাট চিনতে মুশকিল হবে। বরং আমিই আসব।’

মঞ্জুশ্রী দাশকে কখনো দেখিনি। জানতাম, এই নামে জীবনানন্দ দাশের এক কন্যা আছে। ব্যস, এই পর্যন্ত। কোনো দিন দেখিনি, অথচ টেলিফোনে কণ্ঠস্বর শুনে মনে হলো, অনেক দিনের চেনা। পরের দিন গেলাম ভার্সিটি পাড়ায়, মঞ্জুশ্রী দাশের সঙ্গে দেখা করার জন্য। একটি নমস্কারে তিনি স্বাগত জানালেন আমাকে।

ড্রইংরুমে বসলাম। একটু পরেই চা আর সন্দেশ। মুখোমুখি মঞ্জুশ্রী দাশ, পেছনে বইয়ের আলমারি। হঠাৎ ঘরটা যেন জীবনানন্দের মুখ হয়ে গেল এবং আমরা দুজন তার অক্ষিগোলকের ভেতর বসে আলাপে মগ্ন। মঞ্জুশ্রী দাশ, মনে হলো, কথা বলেন কম। আমারও খ্যাতি নেই বাকপটু হিসেবে। জীবনানন্দের বিষয়ে কথাবার্তা হলো টুকরো টুকরো। মঞ্জুশ্রী জানালেন, আমাদের কবিতা ভালো লাগে তার। ঢাকা শহর তার খুব পছন্দ হয়েছে বললেন। বাংলাদেশের নদী তাকে আকর্ষণ করে। নদীপথে বেড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করলেন এক সময়। নদীর কথা বলার সময়, লক্ষ করলাম, তার কণ্ঠে ধানসিড়ি নদীর শব্দ জেগে উঠল।

ঘণ্টাখানেক পর বিদায় নিলাম। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে মনে পড়ল জীবনানন্দের কথা, মনে পড়ল কলকাতার ল্যান্সডাইন রোডের কথা, যেখানে থাকতেন বনলতা সেনের কবি। মনে পড়ল কোনো এক সকালে গিয়েছিলাম তার সঙ্গে দেখা করার জন্য। সকালের তাজা রোদ, উঠোনে একটা নিমগাছ। জীবনানন্দ দাশকে দেখলাম প্রথমবারের মতো। বারান্দায় বসলাম আমরা। আমার সঙ্গে ছিলেন নরেশ গুহ এবং কায়সুল হক। কী কী কথা হয়েছিল আজ আর তা স্পষ্ট মনে নেই। জীবনানন্দ দাশ, তার সত্তায় নির্জনতম কবির লেবেল আঁটা হয়ে গেছে ততদিনে, বেশি কথা বলেননি। শুনেছিলাম, তিনি স্বল্পভাষী। তাই তাকে বেশিরভাগ সময় নীরব দেখে বিস্মিত হইনি। বরিশালের কথা বললেন, বললেন তার হারিয়ে যাওয়া কিছু পাণ্ডুলিপির কথা। কথার ফাঁকে এক সময় হেসে উঠলেন আদিম দেবতার মতো হো হো করে। তার সেই বিখ্যাত হাসি শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল সেদিন।

মনে পড়ল আমার ধূসর পাণ্ডুলিপি প্রথম পাঠের অভিজ্ঞতার কথা। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি নবাগত, কবিতাপাগল। আমতলায়, করিডরে, মধুর ক্যান্টিনে কবিতা আওড়াই কখনো মনে মনে, কখনো মৃদু স্বরে। কেউ কেউ হঠাৎ ফিরে তাকায়, অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি। তখনো জীবনানন্দ দাশের কোনো কবিতা পড়িনি। একদিন বন্ধুবর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর হাতে একটা কবিতার বই দেখলাম। বইয়ের মলাটটি, যদ্দূর মনে পড়ছে, ফিকে খাকি রঙের, ধূসরিমার তীরঘেঁষা। বইয়ের নাম ধূসর পাণ্ডুলিপি, কবির নাম জীবনানন্দ দাশ। কেন জানি, বইটা পড়তে ভারি ইচ্ছে হলো। বইটা ধার দেওয়ার জন্য জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর কাছে ব্যাকুল আবেদন জানালাম। সে মৃদু হেসে বলল, ‘এক শর্তে দিতে পারি, কালই ফেরত দিতে হবে। অন্যের বই।’ আমি তক্ষুনি রাজি হয়ে গেলাম লোভী বালকের মতো। জীবনানন্দীয় জগতে সেই আমার প্রথম অভিসার। সারা রাত জেগে পড়লাম ধূসর পাণ্ডুলিপি। কে এক মায়াবী আমার অজান্তেই দখল করে ফেললেন আমাকে। রাত কখন ভোর হয়ে গেল, টেরই পেলাম না। কবিতার পঙ্‌ক্তিগুলো জলের মতো ঘুরে ঘুরে কথা বলতে শুরু করল। ধূসর পাণ্ডুলিপির ঘুমে ভরা সুর আমাকে জাগিয়ে তুলল। বারবার একটি প্রশ্নই সোচ্চার হয়ে উঠল সেদিন—কে এই কবি, যিনি আগেভাগেই বলে দিয়েছেন যা আমি বলতে চেয়েছি অ্যাদ্দিন? কে এই পরম মিত্র আমার? কে এই মায়াবী শত্রু?

মনে পড়ল সেই ভয়ংকর দিনটির কথা, যেদিন জীবনানন্দ দাশ মহাপ্রস্থান করলেন পৃথিবী থেকে। কল্লোলিনী কলকাতার এক ঘাতক ট্রাম রক্তাক্ত করল তার শরীরকে। তারপর হাসপাতাল। শুভার্থী ও কবিদের মৃদু ভিড়। তারপর ছায়াচ্ছন্ন অবসান। ঢাকায় ছড়িয়ে পড়ল সেই মর্মান্তিক সংবাদ। মনে পড়ে, সেদিন আকাশ ছিল মেঘলা। কিছুই ভালো লাগছিল না। মনে পড়ে, সেই দিনটি শহীদ কাদরী আর আমি হেঁটে হেঁটে কাটিয়ে দিয়েছিলাম।

ভার্সিটি পাড়া ছেড়ে চলে আসার সময় মনে পড়ল এসব কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কজন ছাত্রী তখন রাস্তায়। হেঁটে যাচ্ছে নিরিবিলি। একজনের হাতে এক কপি চর্যাগীতিকা লক্ষ করলাম। কাইয়ুম চৌধুরীর আঁকা সুন্দর প্রচ্ছদ ঝলমল করছিল রোদে। জানি, চর্যাগীতিকার প্রচ্ছদপটে যে দুটি নাম মুদ্রিত রয়েছে তার একটির অধিকারী ছিলেন আনোয়ার পাশা। এই ‘ছিলেন’ শব্দটি যে আজ আমাকে ব্যবহার করতে হবে আনোয়ার পাশা সম্পর্কে, কখনো ভাবিনি। মনে পড়ল আনোয়ার পাশার মুখ। বিশেষ করে তার চোখ দুটো বারবার ভেসে উঠছে আমার সামনে এই মুহূর্তে। কাগজের ওপর ভেসে উঠছে একজোড়া চোখ। কথা বলার সময় তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত। আনোয়ার পাশার কথা শুনলে মনে হতো, তিনি যেন সমগ্র সত্তা দিয়ে কথা বলছেন। খুব সিরিয়াস ধরনের মানুষ ছিলেন তিনি, সাহিত্যে সমর্পিত। যখনই দেখা হয়েছে, এগিয়ে দিয়েছেন হাত করমর্দনের জন্য। কবিতা বিষয়ে সানন্দ আলোচনা করেছেন কতদিন। নিজেও ছিলেন কবিমনের অধিকারী। নদী নিঃশেষিত হলে নামে একটি কবিতার বইও আছে তার।

একদিনের একটি ঘটনা মনে পড়ছে। আমরা দুজনই এক প্রকাশকের দোকানে হাজির। সেই প্রকাশক আমাদের দুজনেরই বই ছেপেছেন। তিনি প্রকাশকের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে তার সদ্য প্রকাশিত একটি উপন্যাস আমাকে উপহার দিলেন। আমিও তখন তাকে উপহার দিলাম আমার একটি কবিতার বই অনুরূপ প্রক্রিয়ায়। তার সেই উপন্যাসের নাম নীড়সন্ধানী। আনোয়ার পাশা পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। পদ্মার এপারে এসেছিলেন নতুন করে নীড় বাঁধার জন্য, বেঁধেওছিলেন নীড় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পাড়ায়। কিন্তু সেই নীড়ে বজ্রপাত হলো—নীড়সন্ধানী আনোয়ার পাশা খুন হলেন আলবদরের পৈশাচী হাতে বাংলাদেশের রক্তাক্ত প্রান্তরে। 

রক্তাক্ত প্রান্তর? হ্যাঁ, এই নামে একটি নাটক লিখছিলেন মুনীর চৌধুরী, আমাদের মুনীর ভাই। প্রতিভাবান লেখক, অসাধারণ বক্তা, অসামান্য অধ্যাপক, নিপুণ কথক—মুনীর চৌধুরী প্রসঙ্গে এতগুলো বিশেষণ ব্যবহার করতে আমি বিন্দুমাত্র দ্বিধান্বিত নই। কিছুতেই ভুলতে পারি না তার কথা। তাকে হারিয়ে আমরা একটা অবলম্বন হারিয়ে ফেলেছি। মনে পড়ে, আমরা যখনই বিরোধী সমালোচকদের আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে পড়তাম, তখনই মুনীর ভাই আমাদের পক্ষ সমর্থন করতেন নির্দ্বিধায়। নতুন লেখকদের সম্পর্কে তার উৎসাহ ছিল অপরিসীম। এবং আশ্চর্যের বিষয়, কারুর সম্পর্কে তাকে কোনো কর্কশ মন্তব্য করতে আমি অন্তত শুনিনি কখনো। তার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল, যদ্দূর মনে পড়ে, গত জুন মাসে। তখন ঢাকা শহর শত্রুকবলিত। তখন ঢাকা এক মৃত্যুপুরী, প্রেতায়িত নগর। তিনি সান্ধ্য পত্রিকার খোঁজে এসেছিলেন স্টেডিয়াম এলাকায়। আমি তাকে দেখতে পেয়ে ছুটে গেলাম। সেই কালবেলায় তাকে দেখলাম একেবারে ভেঙে পড়া, বুড়োটে। কথা বললেন, কাটা কাটা, প্রায় অসংলগ্ন। খবর জানতে চাইলেন সাগ্রহে, যদিও জানতেন এমন কোনো খবরই আমি দিতে পারব না যা শুনে তিনি আশ্বস্ত বোধ করবেন। তাকে দেখলাম, ভীষণ ভয়-পাওয়া। যেন একটা জালে আটকা পড়ে গেছেন, যার হাতে জাল সে যেকোনো মুহূর্তে গুটিয়ে নিতে পারে সেটি। বস্তুত আমরা সবাই তখন জালে আটকা-পড়া পশুর মতো। ভয়ার্ত, অসহায়। 

তিনিও আলবদরের শিকার হলেন আনোয়ার পাশার মতো, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর মতো, ডক্টর আবুল খায়েরের মতো, ডক্টর গিয়াসউদ্দিন আহমদের মতো, সন্তোষ ভট্টাচার্যের মতো। আর কত নাম করব? মুনীর চৌধুরী যখন রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকটি লিখেছিলেন, তখন কি তিনি জানতেন যে একদিন সারা বাংলাদেশই রক্তাক্ত প্রান্তর হয়ে যাবে? তিনি কি জানতেন, বেওয়ারিশ শেয়াল-কুকুরের দঙ্গলে হারিয়ে যাবেন মুনীর চৌধুরী নামক উজ্জ্বল ব্যক্তিটি? তিনি কি জানতেন, এমন কি রক্তাক্ত প্রান্তরেও খুঁজে পাওয়া যাবে না তার লাশ?

দৈনিক বাংলা, ১২ মার্চ ১৯৭২