বইচিত্র

হুমায়ুন আজাদকৃত ‘মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্
হুমায়ুন আজাদ
সংগ্রহ : মুহিত হাসান
প্রকাশক : আগামী
প্রথম প্রকাশ : জুন ২০২৬
প্রচ্ছদ : সব্যসাচী মিস্ত্রী
মূল্য : ২০০ টাকা
পৃষ্ঠা : ৭১

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৪ পিএম

হুমায়ুন আজাদের প্রথম উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে চিহ্নিত করলে অলৌকিক ইস্টিমার কাব্যগ্রন্থটির নাম নিতে হয়। কবিতার প্রতি তার আকর্ষণ ও মনোযোগ ছিল সহজাত। এর কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যাবে, প্রতিভাবান চিত্তের গোপনতম এবং গভীরতম প্রকোষ্ঠে রয়েছে কবিতার সাংকেতিক আহ্বান। আজাদ জাত কবি। কবিতা লিখে বাংলাদেশের কাব্যজগতে ব্যাপক গ্রাহ্যতা পেয়েছেন তিনি। বলা বাহুল্য তার সড়গড় রয়েছে সাহিত্যের অন্যান্য আঙ্গিকেও। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় পরিলক্ষিত হয় তার প্রকর্ষ বিচরণ। বাংলাদেশে প্রবন্ধচর্চার সংকীর্ণ প্রবাহের মধ্যেও তিনি এনেছেন নতুন স্রোত। ভাষায়-ভাবনায়-বিন্যাসে-ব্যঞ্জনায় তার প্রবন্ধগুলো কবিতার মতোই জীবন্ত। জীবনী রচনাতেও সিদ্ধহস্ত তিনি। ১৯৭১ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত তার ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ শীর্ষক জীবনীগ্রন্থটি বুননের সান্দ্রতা ও ভাবনার স্বকীয়তায় ঋদ্ধ। দীর্ঘদিন গ্রন্থটির হদিস পাননি পাঠক-গবেষকরা। আজাদের দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে বইটির কোনো কপি সংরক্ষিত নেই। ব্যাপক খানাতল্লাশি চালিয়ে গবেষক-সংকলক মুহিত হাসান গ্রন্থটির একটি কপি আবিষ্কার করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে। পাঠকের চমক জাগবে গ্রন্থটির প্রকাশ সাল দেখে। এটিই আজাদের প্রথম ছাপা হওয়া গ্রন্থ!

‘প্রবেশক’ অংশে মুহিত গ্রন্থটির সদর-অন্দর ও এর নেপথ্যের কাহিনি নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। সেখান থেকে জ্ঞাত হওয়া যায়, ‘সাহিত্য-সাধক-পরিচিতি গ্রন্থমালা’ প্রকাশের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয় এই গ্রন্থটি। প্রকাশক ছিলেন প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক ও বাঙলা উন্নয়ন বোর্ডের প্রকাশনা বিভাগের তৎকালীন প্রধান প্রকাশনাধ্যক্ষ আবদুল হক। মুদ্রণের দায়িত্বে ছিল ঢাকার ৪ নম্বর রমাকান্ত নন্দী লেনের জহীর আর্ট প্রেস; মুদ্রাকর জনৈক সুলতান আহমদ। প্রচ্ছদবিহীন, পেপারব্যাক বাঁধাইয়ের ৪+৪৪ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য ছিল মাত্র এক টাকা। একই সময়ে গ্রন্থমালার আরও কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়। আজাদ তার জীবদ্দশায় গ্রন্থটির উল্লেখ করেননি। কেন তিনি এই প্রসঙ্গ এড়িয়েছেন সে ব্যাপারে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ হাজির করেছেন মুহিত। তার মূল্যায়ন : ‘নিজের চিন্তাচেতনার ধারা ও সাহিত্যবোধের গড়ন পরবর্তীকালে অনেকটাই বদলে যাওয়ায় তরুণ বয়সে লেখা এ পুস্তিকাটিকে তিনি আর সামনে আনতে চাননি।’

গ্রন্থটি জীবনীসাহিত্যকে পূর্ণতা দান করেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। অল্প কথায় পাঠককে মোহিত করে তার চেতনাকে স্পন্দিত করা আজাদের লেখার শক্তিশালী গুণ। সাধারণ পাঠক মাত্রই অবগত আছেন যে, সাহিত্যের ইতিহাস লিখতে গিয়ে শানিত ও প্রাণিত গদ্যে অল্প কথায় তিনি ইতিহাসকেও বশ মানিয়েছেন। জীবনীগ্রন্থটির ক্ষেত্রেও এ কথা পরিপূর্ণভাবে প্রযোজ্য। সংক্ষেপে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র জীবন ও কর্মের ফিরিস্তি রয়েছে এতে। আজাদের গবেষণাপ্রতিভার তীক্ষ্ণ যতিরেখা পাঠককে সচকিত করবে বারংবার। চিন্তাবৃত্তির পথে প্রশ্নানুশীলনকে সাথি করে অনবদ্য গদ্যভাষার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন তিনি। অকল্পনীয় নিবিড়পাঠে সংবেদনশীল গদ্যে কখনো কখনো নির্মম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ভক্তিতে গদগদ না হয়ে প্রথার বাইরে হেঁটেছেন। স্বজ্ঞাপ্রসূত স্বতঃপ্রণোদনার তাগিদে নির্মোহভাবে লিখেছেন : ‘ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র জীবন দুই শতকে বিস্তৃত। ঊনবিংশ শতকে তিনি জন্মেছেন, লোকান্তরিত হয়েছেন বিংশ শতকের সপ্তম দশকের শেষাংশে। তার দীর্ঘজীবনের বৃত্তে সংঘটিত হয়েছে এ দেশের ইতিহাসের বিভিন্ন তাৎপর্যমণ্ডিত ঘটনা, যার তালিকা এখানে দেওয়া একান্ত প্রয়োজনীয় নয়।... তবু বহু ভাষায় সুপণ্ডিত, অমিত জ্ঞানের আধার ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ঊনবিংশ শতকেরই সন্তান। তার মানসিকতার মধ্যে বিংশ শতাব্দীর দ্বন্দ্ব স্থান লাভ করেনি, যুগের অস্থির চাঞ্চল্য তাকে বিচলিত করতে পারেনি।’ বাঙালিত্ব ও মুসলমানত্বের যে চিরায়ত দ্বন্দ্ব সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প উৎপাদন করে, শহীদুল্লাহ্‌র মধ্যে তা একেবারেই ছিল না।

আজাদের মূল্যায়নে শহীদুল্লাহ্ বহুমাত্রিক জ্ঞান ও সৃজনশীলতার এক বিরল সমন্বয়। গবেষণার পাশাপাশি অনুবাদ, শিশুসাহিত্য ও কবিতায় তার অনুরাগ তার মননের ব্যাপ্তিকে প্রকাশ করে। বিভিন্ন ভাষা ও শাস্ত্রে গভীর দখলের কারণে তিনি দুরূহ বিষয়কেও সহজ, সংক্ষিপ্ত ও বোধগম্য করে উপস্থাপন করতে পারতেন। আজাদের দৃষ্টিতে শহীদুল্লাহ্‌র রচনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল সারল্য—ভাব ও ভাষা উভয় ক্ষেত্রেই। তার গবেষণার ভাষা ছিল নিরাবেগ, স্বচ্ছ, ধীর ও প্রাঞ্জল। অলংকার, অতিরঞ্জন কিংবা দুর্বোধ্য শব্দের ভারে তা কখনো জটিল হয়ে ওঠেনি। জটিল তত্ত্ব ও তথ্যকে সহজে প্রকাশ করার অসাধারণ ক্ষমতাই তার ভাষাকে গবেষণার উপযোগী ও স্বতন্ত্র করে তুলেছিল। সাধুভাষায় তার গদ্য ছিল সহজ ও স্বাভাবিক; আবার চলিত বাংলায় তার রচনা পূর্ববঙ্গীয় ভাষার বিকাশেও পথপ্রদর্শক। ফলে আজাদের মূল্যায়নে শহীদুল্লাহ্‌র ভাষা বাংলা গবেষণা গদ্যের অনন্য দৃষ্টান্ত।

আবার শহীদুল্লাহ্‌র কবিতাগুলোকে তিনি সরাসরি ‘মূল্যবান নয়’ বলে খারিজ করেছেন। তার মতে, ছন্দকে রক্ষা করতে পারাই শহীদুল্লাহ্‌র একমাত্র সাফল্য। ‘এখানে তত্ত্বকথা, ভালো কথা, সাধারণ আবেগ ও বিশ্বাস ছন্দোবদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হয়েছে।’ বেশ কিছু কবিতার উদাহরণও যুক্ত করেছেন লেখক। বিশ্লেষণ ও জীবনকথার পাশাপাশি আজাদ পরম নিষ্ঠা, শ্রম ও মেধায় নিজ হাতে প্রস্তুত করেছিলেন শহীদুল্লাহ্‌র গ্রন্থাবলির বিশদ বিবরণ এবং গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত সব রচনার বিস্তৃত পঞ্জি। এই অনন্য সংযোজন গ্রন্থটিকে গবেষণার এক মূল্যবান আকরগ্রন্থে পরিণত করেছে। নিঃসন্দেহে ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য এটি হবে অমূল্য আধার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত