ঋণ করে ঘি খাওয়ার নামান্তর

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ,  চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার দেওয়া ঋণে ৮০০ বৈদ্যুতিক বাস কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যা ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের জন্য এ বাস কেনা হবে। যার প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে, ৪ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাস ক্রয় বাবদ ব্যয়, ৩ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। বাকিটা ৫০টি চার্জিং স্টেশন, ওয়ার্কশপ, গ্যারেজ ইত্যাদি স্থাপন এবং ভ্রাম্যমাণ চার্জার ক্রয় ও অন্যান্য কাজে ব্যয় হবে। প্রতিটি বাসের দাম পড়বে, ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এখানে প্রশ্ন অনেক।

এক. দেশে যখন চরম বিদ্যুৎ ঘাটতি চলছে এবং খোদ অর্থমন্ত্রী ও সরকারের অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ যখন জানাচ্ছেন, জ্বালানি পরিস্থিতি স্থিতিশীল হতে আরও অন্তত দুই বছর লাগবে। তখন কোন হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে সরকার, বৈদ্যুতিক বাস ক্রয়ের উদ্যোগ নিচ্ছে? বিদ্যুৎ খাতের বাস্তব পরিস্থিতি ও সরকারের বক্তব্য এবং এসবের বিপরীতে বিআরটিসির বাস কেনার উদ্যোগ, পরস্পরবিরোধী হয়ে গেল না? বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাতে কোনো দায়িত্ববোধসম্পন্ন মানুষ এ মুহূর্তে বিদ্যুৎচালিত বাস কেনার প্রস্তাব সমর্থন করবেন? অসমর্থনীয় এ প্রস্তাব যদি শেষ পর্যন্ত অনুমোদিত হয় অর্থাৎ সরকার ৮০০ বাস যদি কিনেই, তাহলে এগুলো রাস্তায় চালানোর জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বিআরটিসি পাবে? যদি না পায়, তাহলে বাসগুলো তখন পথে বসবে?  দুই. বিআরটিসি দীর্ঘকাল ধরে একটি চরম অলাভজনক লোকসানি প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ব্যাপক নীতিগত সমর্থন ও বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ সহায়তা নিয়ে সড়ক পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি, কখনো পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেনি। বরং চরম অদক্ষতা ও ব্যাপক মাত্রার দুর্নীতির অভিযোগ আগাগোড়া। সহজ-সরল সাধারণ নাগরিদের অভিমত এমনটি যে, দেশের কোনো মানুষ নেহায়েত বিপদে না পড়লে পারতপক্ষে কেউ বিআরটিসি বাসের যাত্রী হতে চান না। তাহলে এমন পরিস্থিতিতে লাভজনক হবে না জেনেও, ঋণ করে বাস কেনার প্রস্তাব কি কোনো মানুষ সমর্থন করবেন? যদি না করেন, তাহলে সবকিছু জেনেশুনে সরকার এ লোকসানি উদ্যোগ নিয়ে কেন এগুচ্ছে? এর পেছনে কোনো পক্ষের কি বিশেষ স্বার্থ রয়েছে?

তিন. বিআরটিসির ৮০০ বাস কেনার পর, তা অনিবার্যভাবে লোকসানি কার্যক্রমে রূপান্তরিত হবে। তখন ঐ ঋণের কিস্তি বিআরটিসি কোত্থেকে, কীভাবে পরিশোধ করবে? চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে এ ঋণ যেহেতু সরকারি জিম্মায় নেওয়া হবে, তখন বাধ্য হয়ে সরকারকেই রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ভর্তুকি দিয়ে অর্থের জোগান দিতে হবে। যা শেষ পর্যন্ত বর্ধিত কর দিয়ে জোগাতে হবে দেশের অসহায় দরিদ্র সাধারণ জনগণকে। আর অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে এ ধরনের আশঙ্কা পোষণ করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। সেই ঋণের সুদের হার হবে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি এবং এরসঙ্গে যুক্ত থাকবে নানা কঠিন শর্ত। আর এটি যদি শেষ পর্যন্ত সাপ্লায়ার্স ঋণ হয়, তাহলে তো কথাই নেই ঋণের ভারে বিআরটিসিকে শুধু কাবু নয়, কুঁজো হয়ে যেতে হবে। চার. বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সরকার ইতিমধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা আপাতত যৌক্তিক। কিন্তু যে যুক্তিতে দরিদ্র রিকশাচালকের ক্ষুধার্ত পেটে আঘাত করে হলেও ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেই একই যুক্তি যদি সমহারে অন্যত্র প্রয়োগের প্রশ্ন আসে, তাহলে বিআরটিসির আওতায় ব্যাটারিচালিত বাস কেনার বিষয়কে কি যৌক্তিক বলে প্রমাণ করা যাবে?

পাঁচ. গণমাধ্যমকে বিআরটিসি জানিয়েছে, প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক পর্যয়ে রয়েছে। অন্যদিকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ জানিয়েছে, প্রকল্পটির জন্য ঋণ সংগ্রহের লক্ষ্যে ইআরডি (অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ) কাজ করছে। ইআরডি সচিব এ বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি। তবে ইআরডির কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এ প্রস্তাবে ইতিমধ্যে সম্মতি প্রদান করেছেন। বিভিন্ন সূত্রের এসব বক্তব্য ও রাখঢাক থেকে, বিষয়টিকে অনেকটা রহস্যজনক বলে মনে হয় না? অবশ্য রাষ্ট্র এবং বিভিন্ন দলীয় সরকার, সাধারণ জনগণের কাছে বরাবর এক রহস্যের আধার। যে রহস্যের উন্মোচন দেশের সাধারণ নাগরিকের পক্ষে কোনোদিন করা সম্ভব হয় না। ভবিষ্যতে কেনোদিন করা সম্ভব হবে কি না, তাও অজানা। 

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে এমনিতেই চরম নাজুক অবস্থায়। যার জন্য বহুলাংশে দায়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বর্তী সরকারের নানা কর্মকাণ্ড। অন্তর্র্বর্তীকালে কয়েকজন উপদেষ্টা ও তাদের অন্যান্য সুহৃদ ১৮ মাসে লুটেপুটে দেশের অর্থনীতিকে প্রায় ফোকলা করে গিয়েছেন। এ অবস্থায় সবে দায়িত্ব নিয়ে নির্বাচিত নতুন সরকার যদি ঋণ করে বৈদ্যুতিক বাস কেনার মতো অলাভজনক প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে চরম বিচক্ষণহীনতা দেখায়, তাহলে সেটি শুধু দুর্ভাগ্যজনক হবে না আত্মঘাতী হবে বলে মনে করি। দেশের অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে, সরকার বৈদেশিক ঋণে ৮০০ বৈদ্যুতিক বাস ক্রয় থেকে বিরত থাকবে এমনটি প্রত্যাশা।

লেখক : সাবেক পরিচালক,বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন।

atkhan56@gmail.com