দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে শিক্ষার রূপান্তর ও আধুনিকায়নের বিষয়টি সংগতই ফের প্রত্যাশার নাভিকেন্দ্রে নতুনভাবে উঠে এলেও তা যেন ক্রমেই ফিকে হয়ে যাচ্ছে। এরই বিবর্ণ চিত্রের প্রতিফলন ঘটেছে ২৪ আগস্ট দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে। ‘আধিপত্যের রাজনীতি ফিরছে ক্যাম্পাসে’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের গর্ভে শুধু উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার তথ্য মেলেনি, একই সঙ্গে জিজ্ঞাসা দাঁড়িয়েছে; আবার কি শিক্ষাজীবনে বৈরী স্রোত বেগবান হচ্ছে? ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর বদলেছে রাজনৈতিক সমীকরণ। আমরা দেখছি, জাতীয় নির্বাচনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘাত-সহিংসতার অনেক ঘটনা ঘটেছে। নিকট অতীতে সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা বলেছি, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে কলেজ পর্যায়ে সংঘাত-সহিংসতার যে আলামত ক্রমেই পুষ্ট হচ্ছে, ত্বরিত এর প্রতিবিধান করতে না পারলে ভবিষ্যৎ বহুমুখী বিরূপতার ছায়াতলে যাবে। ছাত্ররাজনীতির নামে চর দখলের মতো ক্যাম্পাস দখলের হীন মানসিকতার যে পর্যন্ত না অবসান হবে, সেই পর্যন্ত উৎকর্ষ ছাত্ররাজনীতি তো দূরের কথা জাতীয় রাজনীতিও সংক্রামক ব্যাধির মতো আক্রান্ত হবে।
ছাত্র রাজনীতির ঔজ্জ্বল্য ফেরানোর দায়, প্রত্যেক ছাত্র সংগঠনের মাতৃ-সংগঠন রাজনৈতিক দলগুলোর। ছাত্র সংগঠনগুলোকে যদি ভ্রাতৃ-মাতৃ সংগঠনের পেশিশক্তির ওপরে দাঁড়ানোর প্রেক্ষাপট কোনো রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করে, তাহলে আখেরে এর ফল ভালো হবে না হতে পারে না। শিক্ষাঙ্গনে সংঘাত-সহিংসতায় সম্ভাবনাময় প্রাণ অকালে হারিয়ে যাওয়ার বেদনকাতর অধ্যায় আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে । এমন মর্মস্পর্শিতায় শুধু একেকটি পরিবারে ক্ষত নিরাময়যোগ্য হয়ে ওঠেনি, রাষ্ট্র এবং সমাজে এর চরম নেতিবাচকতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। আমরা বহুবার বলেছি, সেই মর্মন্তুদ অধ্যায়ের যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে কারও অপরিণামদর্শিতায়। কিন্তু সবই যেন অরণ্যে রোদনে পরিণত হয়েছে। এ ভূখ-ের ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্য অতীত হলো এর উত্তর অনুসন্ধানের তাগিদ আমরা দিই জাতীয় রাজনীতির নীতিনির্ধারকদের। আমরা ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে নই, কিন্তু লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি অবশ্যই পরিত্যাজ্য মনে করি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ উন্নয়ন এবং জাতীয় রাজনৈতিক চেতনায় নেতৃত্ব তৈরির উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীদের পরিচালিত কার্যক্রমই হলো, ছাত্র রাজনীতির চেতনার মূল ভিত্তি। আমরা চাই সহাবস্থানও।
কিন্তু অতীত থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার, দলীয় লেজুড়বৃত্তি ও সহিংসতার কারণে ছাত্র রাজনীতি পথ হারিয়েছে, ভবিষ্যৎ নিপতিত হয়েছে কঠিন প্রশ্নের মুখে। দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শিক্ষাঙ্গনে আধিপত্যের রাজনীতির পরিসর বেড়ে চলার প্রেক্ষাপট তৈরির যে তথ্য উঠে এেেসছ তা জাতীয় রাজনীতির নীতিনির্ধারকরা যে জানেন না, তা নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, বিষয়গুলো অনেকেই আত্মস্থ করতে অনাগ্রহী হীনস্বার্থ চরিতার্থকরণের পথ উন্মুক্ত রাখতে। আমাদের আশা তাদের সম্বিত ফিরবে, শুভবোধের উদয় হবে। শিক্ষার মতো রাষ্ট্রের অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আত্মঘাতী কর্মকা-ের বৃত্তমুক্ত করে দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে শিক্ষাঙ্গনে স্থিতিশীলতা ও বিদ্যমান পরিবেশ উন্নত করতে হবে। এ লক্ষ্যে কলুষতার ছায়া সরাতে তারা যূথবদ্ধভাবে যেন মনোযোগী হন। নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হোক, এই জনপ্রত্যাশা পূরণের দায় রাজনীতি সংশ্লিষ্ট সবার। আমরা শুধু স্বেচ্ছাচারী রাজনীতির নির্বাসন ও ক্ষমতার পালাবদল চাইনি আমরা চেয়েছি, বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। ক্ষমতার হস্তান্তর এ পর্যন্ত বহুবার ঘটেছে, কিন্তু রূপান্তর ঘটেনি এবং ব্যবস্থারও পরিবর্তন হয়নি। আশা করি, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি পূরণে দৃঢ় থাকবে এবং শিক্ষাঙ্গনসহ সমাজের সব স্তরে নিরাপত্তা-স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে জনপ্রত্যাশা পূরণে সাফল্য দৃশ্যমান করবে।
শিক্ষাঙ্গন যুদ্ধক্ষেত্র বা আধিপত্যে বিস্তারের লড়াইয়ের জায়গা নয়। শিক্ষাঙ্গন মননশীল-সৃজনশীল জাতি গঠনের ঊর্বর ক্ষেত্র। এটি যেন ছাত্র রাজনীতি সংশ্লিষ্ট কেউ ভুলে না যান। আমরা চাই, ছাত্ররাজনীতির উজ্জ্বল ইতিহাস সামনে রেখে অনুজ্জ্বল অধ্যায় মুছে ফেলতে ছাত্রনেতারা কর্মীদের অনুশীলনের মধ্য দিয়ে সবার আগে শিক্ষাজীবন পরিশীলিত করার পথে ব্রতী হবেন। সবার দায় নির্দিষ্ট। অন্যের ওপর দায় চাপানো কিংবা এড়ানোর অবকাশ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ দম্পতি, উইল ডুরান্ট ও এরিয়েল ডুরান্ট যথার্থই বলেছেন ‘শিক্ষা হলো সভ্যতার রূপায়ণ। শিক্ষাঙ্গনে যদি বৈরিতার ছায়া ছড়িয়ে থাকে, তাহলে সভ্যতার রূপায়ণ অসম্ভব।’