দেশ রূপান্তর : ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার থেকে নতুন করে বড় পরিসরে রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশে তাদের আশ্রয়ের ৯ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। সম্প্রতি মিয়ানমারের তরফে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে তিন লাখের কিছু বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে। অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলে ফেরত নেওয়া হবে। মিয়ানমারের এই অবস্থানের ব্যাখ্যা কী?
রাহমান নাসির উদ্দিন : মিয়ানমারের এ সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই। কারণ হচ্ছে বাংলাদেশ ২০১৮ সালে যে ৮ লাখের কিছু বেশি রোহিঙ্গাদের তালিকা দিয়েছিল, তার মধ্যে ৪ লাখের একটু বেশি যাচাই-বাছাই করেছে। মিয়ানমার চার লাখ রোহিঙ্গার তালিকা যাচাই-বাছাই করে, তার মধ্যে তিন লাখকে রাখাইনের রেসিডেন্টস হিসেবে শনাক্ত করেছে। মিয়ানমার যে তিন লাখ রোহিঙ্গার তালিকা দিয়েছে, সেটা নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার একটি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আরও যে বাকি ৪ লাখ আছে সেগুলোকে যাচাই-বাছাই করে সেখান থেকে যদি আরও তিন লাখের অধিককে শনাক্ত করা হয়, তাহলে মন্দ নয়। এরপর বাংলাদেশ বাকি রোহিঙ্গার তালিকা দেবে। এভাবে প্রথম ৩ লাখের তালিকা ধরে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বাংলাদেশ নিতে পারে। তাই একে ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই।
দেশ রূপান্তর : বিদ্যমান সংকট নিরসনে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মহলে দেনদরবারও কম করেনি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে কোন ধরনের জটিলতা বিদ্যমান মনে করেন? এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থান কীভাবে দেখছেন? এমন প্রেক্ষাপটে বর্তমানে বাংলাদেশের করণীয় কী?
রাহমান নাসির উদ্দিন : মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যে ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ সম্পৃক্ত আছে এর বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের কথা চিন্তা করে, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে এটা মনে করার কারণ নেই। ফলে, ২০১৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখা হয়নি কিন্তু মিয়ানমারের অনাগ্রহ, অনিচ্ছা বা আন্তরিকতার অভাবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আলোর মুখ দেখেনি। তবু প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করতে হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করেই করতে হবে। কেননা, মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করা যাবে না। তবে আমি মনে করি, মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালানোর পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রত্যাবাসনের সপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করানোর জন্য প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করতে হবে। কেননা, শুধু বাংলাদেশ চাইলেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে না; আবার শুধু মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা দিয়েও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের কোনো পথ দেখি না। তাই যতই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বার্থ থাকুক না কেন, তাদের সম্পৃক্ত করেই সমস্যার সমাধান করতে হবে।
দেশ রূপান্তর : রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বিশেষ করে- কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের কারণে পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর অভিঘাত লাগছে। বিষয়গুলো কীভাবে দেখছেন?
রাহমান নাসির উদ্দিন : প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থানের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে; বিশেষ করে উখিয়া ও টেকনাফের পরিবেশ-প্রতিবেশ এবং সামাজ জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, এ কথা অনস্বীকার্য। তবে মিডিয়া যেভাবে উপস্থাপন করে, সেখানে খানিকটা সত্যের অপালাপ আছে। ক্যাম্পে গিয়ে দেখেন, সেখানে প্রচুর গাছ লাগানো হয়েছে এবং ফরেস্ট্রি তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় পুরো ক্যাম্পে পরিবেশ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হয়েছে। বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতির কারণে শরণার্থী শিবিরের পরিবেশের ওপর অভিঘাত এসেছে সত্য, কিন্তু রিস্টোরের প্রক্রিয়াও সেখানে চলমান।
দেশ রূপান্তর : মিয়ানমারে চরম মানবিক সংকটে নিপতিত হয়ে যে রোহিঙ্গারা এখানে আশ্রয় নিল, তারা এখন ভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে জড়াচ্ছে। অভিযোগ আছে- অবৈধ অস্ত্র, মাদকসহ অপরাধজনক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে অনেকে। এই বিষয়গুলো কীভাবে দেখছেন?
রাহমান নাসির উদ্দিন : রোহিঙ্গাদের মধ্যে কিছু ছোট ছোট গ্রুপ নিজেদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বে জড়াচ্ছে এবং দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কারণে ক্যাম্পের ভেতর এবং বাইরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির খানিকটা যে অবনতি হয়েছে, সেটা অনস্বীকার্য। কিন্তু তা বাংলাদেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে সেটা মনে করি না। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথ ও সমন্বিত চেষ্টায় অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে বলে মনে হয়েছে। বিশেষ করে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখছে। তাই মনে করি না যে, রোহিঙ্গাদের মধ্যকার গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং দ্বন্দ্ব-সংঘাত স্থানীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
দেশ রূপান্তর : আমরা জানি, প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। শিবিরগুলোতে প্রতি বছর ৬০ হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করছে এ তথ্য একটি বেসরকারি জরিপের। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য দেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, এর প্রভাব আরও বহুমুখী হবে এমনটি অনেকে বলছেন। আপনি কী মনে করেন?
রাহমান নাসির উদ্দিন : রোহিঙ্গার জন্মহারের কারণে প্রতি বছর রোহিঙ্গার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এই বিপুলসংখ্যক জনসংখ্যা স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের সেবা এবং সুযোগের যে ব্যবস্থা সেখানে এক ধরনের ভাগ বসাচ্ছে, এটা অনস্বীকার্য। পাশাপাশি বিপুল জনসংখ্যার কারণে, উখিয়া এবং টেকনাফের মানুষ জনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে এও সত্য। বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতি স্থানীয়ভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে, এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এও আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারণে শরণার্থী ব্যবস্থাপনার বিপুল আয়োজনের ফলেই স্থানীয় অসংখ্য লোকজনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ ভালো করছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বেসরকারি সংস্থাগুলোর নানা ধরনের সম্পৃক্ততার কারণে, স্থানীয় জনগণের দ্বারা উপকৃত হচ্ছে। তবে স্থানীয় জনগণের জায়গা থেকে এটা স্বীকার করি, লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ বেশি।
দেশ রূপান্তর : এ ব্যাপারে ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কথা বললেও, তাদের অনেকের বাণিজ্য সম্পর্ক বেশ জোরালো। এর ব্যাখ্যা কী হতে পারে? আমাদের পররাষ্ট্রনীতির আলোকে নতুন করে ভাবার কিছু আছে?
রাহমান নাসির উদ্দিন : এখানে যে বিষয়টা জরুরি তা হচ্ছে, ২০১৭ সালের পর থেকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যখনই কোনো পর্যায়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উঠেছে কিংবা জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যখনই কোনো অবস্থান নেওয়ার কথা উঠেছে চীন, রাশিয়া, জাপানসহ (যেমন ভারত প্রায় সময় ভোটদানে বিরত থাকে) পৃথিবীর অনেক বড় বড় পরাশক্তি মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নেয়। আবার যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারের কথা বলে। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কোনো ধরনের কার্যকর চাপ প্রয়োগ করে না। আবার এর সঙ্গে যুক্ত আছে তাদের নিজস্ব স্ট্র্যাটেজিক, অর্থনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ। ফলে, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে আমরা গত ৯ বছরে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি না। তারা রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিয়ে যতটা সোচ্চার এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে ততটা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে না। ফলে, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। এখানে মনে রাখা জরুরি, সব দেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজের রাষ্ট্রের স্বার্থ সুরক্ষা করা। তাই বাংলাদেশকে এ সত্য মেনে নিয়েই কীভাবে দেশের স্বার্থে এবং রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের স্বার্থে এসব রাষ্ট্রকে বাংলাদেশের পক্ষে আনা যায় এবং রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে তাদের সক্রিয় করা যায়, সে জন্য কাজ করতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশকেও অত্যন্ত কার্যকর, বাস্তবসম্মত, সময়োপযোগী এবং আউট-কাম-বেইসড ফরেন পলিসি গ্রহণ করতে হবে যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের পাশে সক্রিয়ভাবে পাওয়া যায়।
দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য
আপনাকে ধন্যবাদ।
রাহমান নাসির উদ্দিন : আপানাকেও ধন্যবাদ। দেশ রূপান্তরের জন্য শুভকামনা।