পুলিশ-‘খুনি’র একই শার্টে ধূম্রজাল

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের হত্যাকা-ে গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এদিকে অভিযুক্ত সিদ্ধার্থের পরনের শার্ট ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) প্রধান সনাতন চক্রবর্তীর শার্ট হুবহু একই দেখা গেছে। এ নিয়ে নেটিজেনসহ ও জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনাকে পুলিশের কর্মকা-কে বিব্রত করতে একটি মহল প্রচার করছে বলে অভিযোগ পুলিশ কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তীর। অন্যদিকে এ হত্যাকা-ের বিচার দাবিতে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে।

যেভাবে আলোচনায় শার্টকা- : আলোচিত চারজনকে হত্যার ঘটনায় মরদেহ উদ্ধারের দিন একই ধরনের শার্ট পরা এক ব্যক্তিকে সিঁড়িসহ পুরো বাসায় বিচরণ করতে দেখা যায়। পরে জানা যায়, ওই ব্যক্তি রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান সনাতন চক্রবর্তী। পর দিন দুপুরে হত্যার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্তের একজন সিদ্ধার্থের পরনেও একই রঙের ও ডিজাইনের শার্ট দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমসহ সর্বত্র শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। তবে সনাতন চক্রবর্তীর দাবি, তিনি এই শার্ট আড়ং থেকে কিনেছেন। একই ধরনের শার্ট একাধিক ব্যক্তির পরনে থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই শুধু শার্টের মিলকে কেন্দ্র করে এরকম ঘটনায় আলোচনা করা ঠিক নয়। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘যারা এই শার্ট নিয়ে সন্দেহ পোষণ করছেন, তাদের উদ্দেশে বলছিÑ এটা পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল প্রচার চালাচ্ছে। আমিও লাশ উদ্ধারের দিন এই শার্ট পরেছিলাম, আজও পরেছি। এই শার্টের সঙ্গে চারজন হত্যাকা-ের ঘটনার তদন্ত কিংবা গ্রেপ্তার ব্যক্তির জবানবন্দির কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

তবে গ্রেপ্তারকৃত সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস ছেলের পরনের শার্টটি নিয়ে গভীর সন্দেহ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। গতকাল বিকালে তিনি বলেন, ‘আটকের সময় সিদ্ধার্থের গায়ে শুধু একটি কালো ঘিয়া রঙের গেঞ্জি ছিল। ওই নকশার কোনো শার্ট সিদ্ধার্থের কখনোই ছিল না।’ সেদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শনিবার রাতে গণপতির বাড়িতে পুলিশসহ অনেক লোক জড়ো হন। এরপর ভোররাতে পুলিশ আমার বাড়িতে এসে সিদ্ধার্থের খোঁজ করে। আমি ওকে চাচার বাড়ি থেকে ঘুম থেকে ডেকে এনে পুলিশের হাতে তুলে দিই। তখন তার গায়ে একটি গেঞ্জি ছিল। পরে পুলিশ তখন তাকে সাংবাদিকদের সামনে আনল তখন দেখেছি গায়ে শার্ট। ওই শার্ট কার? ওই ধরনের শার্ট কখনোই তাকে পরতে দেখিনি।’ তিনি এর সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।

দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দুজনের : শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন দুই অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে গত রবিবার রাত সাড়ে ১১টায় তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তারা। তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বলেন, গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তি দায় স্বীকার করায় রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। পরে তাদের কারাগারে নেওয়া হয়।

পাশাপাশি জ¦লল চারটি চিতা : গত রবিবার রাতে রংপুর নগরীর দখিগঞ্জ মহাশ্মশানে হত্যাকা-ের শিকার চারজনের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। পাশাপাশি চারটি চিতায় দাহ করা হয় তাদের। রাত ৮টার দিকে আনুষ্ঠানিকতা শেষে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাত ৯টার দিকে মরদেহগুলো দখিগঞ্জ মহাশ্মশানে নেওয়া হয়। রাত ১১টার দিকে শেষ হয় দাহকার্য। চারজনকে চিতায় তোলার সময় স্বজনদের কান্নায় সেখানে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। চারদিকে শুধু জ্বলতে থাকা চিতার আগুনের কুন্ডলী দেখা যায়।

যা বললেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক : শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার স্ত্রী-সন্তানদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস। তবে চোয়াল ভেঙে যাওয়া ও কেমিক্যাল ব্যবহারের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি। গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান ফরেনসিক বিভাগের এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, হত্যাকা-ের শিকার চারজনেরই শ্বাসরোধের আলামত পাওয়া গেছে। চারজনকে হত্যার ঘটনায় লাশের মুখ অ্যাসিড দিয়ে ঝলসে দেওয়ার কোনো সত্যতা মেলেনি। তবে কয়েকদিন লাশ পড়ে থাকার কারণে মুখম-ল ঝলসে যাওয়ার মতো হয়েছে। ময়নাতদন্তের সময় সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষার জন্য সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হবে।

বিচারের দাবিতে উত্তাল রংপুর : শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের হত্যার বিচার দাবিতে রংপুর জিলা স্কুলের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ ও শোক মিছিল কর্মসূচি পালন করেছে। এ সময় প্রশাসনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিন দিনের আলটিমেটাম দেয় তারা। গতকাল দুপুরে নগরীর কাচারীবাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ করে এ কর্মসূচি পালন করে তারা। এর আগে জিলা স্কুলের সামনে মানববন্ধন করা হয়। পরে সেখান থেকে একটি শোক মিছিল বের করে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। শোক মিছিল শেষে পুনরায় কাচারীবাজার জিলা স্কুলের সামনে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে।

জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সাফিয়ার রহমান বলেন, অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের হত্যার ঘটনায় নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। এই নাটক থেকে বেরিয়ে এসে সত্য উদঘাটন করতে হবে। খুনিকে আড়াল করার চেষ্টা করলে ফল ভালো হবে না। জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী চৌধুরী মাহমুদুন নবী ডলার বলেন, এই হত্যাকা-ের ঘটনায় মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ওই বাড়ির সিসিটিভির তার ও বৈদ্যুতিক তার কে কাটল। চারজনকে হত্যা করা হলো আশপাশের কেউ টের পেল না। এরকম অনেক বিষয় আছে, সেগুলো ভালো করে তদন্ত না করেই, দুজনকে ধরে বলে দিল তারা খুনের সঙ্গে জড়িত। আমরা এসব বুঝি না। আমরা সঠিক তদন্তের মাধ্যমে সত্য জানতে চাই।

এদিকে বিকেলে নগরীর রংপুর প্রেস ক্লাব চত্বরে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের হত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে মহানগর নাগরিক কমিটি। মানববন্ধন থেকে এই হত্যাকা-ের সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচারের দাবি জানানো হয়। বক্তব্য রাখেন মহানগর নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ, সদস্য বিজয় প্রসাদ তপু, রংপুর মহানগর দোকান ব্যবসায়ী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক তানবির হোসেন আশরাফী, কবি মওদুদ আহমেদসহ অন্য নেতারা। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

উল্লেখ্য, রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে গত শনিবার রাতে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও স্কুলছাত্র ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় একই এলাকার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তারা হত্যার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেয় আদালতে। মাদকসেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকা-টি ঘটেছে বলে দাবি করেছে পুলিশ।