দেশের অর্থনীতির ৩১টি সূচকের মধ্যে গত ছয় মাসে মাত্র ১২টিতে উন্নতি হয়েছে, বিপরীতে ১৯টি সূচকেই অবনমন ঘটেছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। একই সঙ্গে গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের তিন প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বলে জানায় সংস্থাটি।
গতকাল সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে নিজ কার্যালয়ে সিপিডির আয়োজনে ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস : একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্র্য। সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানসহ সংস্থাটির গবেষণা সহযোগীরা উপস্থিত ছিলেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। তবে ইতিহাসে রাজস্ব আদায়ে এত বেশি প্রবৃদ্ধির নজির নেই। ভালো সময়েও সাধারণত রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১৪ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি হয়নি। ফলে চলতি অর্থবছরে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় দেড় লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে, যা সরকারের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২০ শতাংশ।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সরকারের চুক্তি অনুযায়ী বাজেট ঘাটতি ৩ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে। ফলে রাজস্ব ঘাটতি পূরণে বাজেট ঘাটতি বাড়ানোর অবনমন, ১২টিতে উন্নতি সুযোগ সীমিত। এ অবস্থায় সরকারকে ব্যয় সংকোচনের পথে যেতে হবে। ব্যয় সংকোচনের বড় সুযোগ রয়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাইরে পরিচালন ও অনুন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে। সেখান থেকে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় কমানো সম্ভব হতে পারে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অর্থনীতিতে সরকারের সামনে বড় দুটি চাপ রয়েছে। এর একটি হলো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি এবং অন্যটি ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির চাপ। ফলে রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যয়ের চাপ সামলে সরকার কীভাবে অর্থনীতি পরিচালনা করবে, সেটিই আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ।
সিপিডির মূল্যায়নে : সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার সাত সূচকের মধ্যে তিনটিতে উন্নতি এবং চারটিতে অবনমন হয়েছে। উন্নতি হয়েছে করবহির্ভূত রাজস্ব, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে। অন্যদিকে অবনমন হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব, মোট কর, ব্যাংক ঋণ এবং নিট বৈদেশিক সহায়তায়। এ ছাড়া মুদ্রানীতির পাঁচটি সূচকের মধ্যে তিনটিতে উন্নতি এবং দুটিতে অবনমন হয়েছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ও মজুরি হার সূচকে উন্নতি দেখা গেছে। বিপরীতে ব্রড মানি এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্যে অবনমন হয়েছে।
সিপিডি জানায়, বৈদেশিক খাতের ১০টি সূচকের মধ্যে চারটিতে উন্নতি এবং ছয়টিতে অবনমন হয়েছে। রপ্তানি, আমদানি, মধ্যবর্তী পণ্যের ঋণপত্র (এলসি) এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে উন্নতি হয়েছে। অন্যদিকে রেমিট্যান্স, বিদেশে কর্মসংস্থান, বিনিময় হার, বাণিজ্য ভারসাম্য, চলতি হিসাবের ভারসাম্য এবং সামগ্রিক ভারসাম্যে অবনমন হয়েছে। অন্যদিকে শিল্প উৎপাদনের দুটি সূচকের দুটিতেই অবনমন হয়েছে। সাধারণ শিল্প উৎপাদন সূচক এবং উৎপাদনশীল শিল্পের উৎপাদন সূচকে নেতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে।
সিপিডির তথ্য মতে, বিনিয়োগের চারটি সূচকের মধ্যে একটি সূচকে উন্নতি এবং তিনটিতে অবনমন হয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে উন্নতি হলেও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই), মূলধনি যন্ত্রপাতির ঋণপত্র খোলা এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে অবনমন হয়েছে। এদিকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের তিনটি সূচকের মধ্যে একটিতে উন্নতি এবং দুটিতে অবনমন হয়েছে। খনিজ শিল্পের উৎপাদন সূচকে উন্নতি হলেও বিদ্যুৎ শিল্পের উৎপাদন সূচক এবং শিল্প খাতে গ্যাসের ব্যবহার কমেছে।