মিয়ানমার সামরিক জান্তার জাতিনিধনমূলক আক্রমণের মুখে প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লাখ লাখ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশের পর্যটন জেলা কক্সবাজারে। এর মধ্যে এ দেশে সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা ঢল শুরু হয় ৯ বছর আগে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। ওই বছরেই রোহিঙ্গাদের পাঠাতে মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ। সেই চুক্তি অনুসারে যেসব রোহিঙ্গা গত ১০ বছরে এসেছে, তাদের এবং তাদের উত্তরসূরি হিসেবে আশ্রয়শিবিরগুলোয় যাদের জন্ম হয়েছে, তাদের সবাইকে ফেরত নেবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। সব মিলিয়ে তাদের সংখ্যা এখন ১২ লাখের বেশি। চুক্তিগুলো সই হওয়ার পর ৯ বছর পার হলেও একজনও এখনো মিয়ানমারে ফেরত যায়নি।
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশ নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করলেও সহসা তাদের রাখাইনে ফেরত পাঠানো যাবে কি না, সে বিষয়ে সরকারের অনেকের মধ্যে সংশয় রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং করোনাসহ নানাবিধ কারণে তাদের ফেরত পাঠাতে মিয়ানমারের সঙ্গে নিয়মিত যে কাজগুলো করার কথা, তাতেও ঘাটতি রয়েছে। সরকারি সূত্রের তথ্যানুযায়ী, ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সরকারের দ্বারা রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাই করা একটি অন্যতম শর্ত হলেও ২০২০ সালের পর বাংলাদেশ সরকার আর কোনো তালিকা পাঠায়নি।
কক্সবাজারে আশ্রয়শিবিরের দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের কয়েকজন বলছেন, ফেরত পাঠানোর অনিশ্চয়তা না কাটলেও রোহিঙ্গাদের আসা বন্ধ হয়নি। প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু রোহিঙ্গা আসছে।
অন্যদিকে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা এবং তাদের আশ্রয় প্রদানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সহায়তার প্রয়োজন বাড়লেও বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ প্রতি বছর কমছে। প্রধান আন্তর্জাতিক দাতারা অনুদান কমিয়ে দেওয়ায় জাতিসংঘের মাধ্যমে যে অর্থসাহায্য চাওয়া হয়, সেই চাওয়াও কমানো হচ্ছে। এতে আশ্রয়শিবির পরিচালনার তহবিলের প্রায়ই মারাত্মক ঘাটতি দেখা দেয়। এমন অচলাবস্থার মধ্যেও পুরো এলাকাটি মিয়ানমার থেকে মাদক ও মানব পাচার, কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরগুলো বিভিন্ন রোহিঙ্গা গ্রুপের সশস্ত্র সংঘাত, খুনোখুনি এবং পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকা-ের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ডক্টরস উইদাউট বর্ডারসের (এমএসএফ) হিসাবে ২০১৭ সাল থেকে সেখানে কমপক্ষে ৬ হাজার ৭০০ রোহিঙ্গা খুন হয়েছে; এর মধ্যে ৭৩০ শিশু।
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে কীভাবে দেখে, সে বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) ড. একেএম শামছুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট জাতীয় নিরাপত্তার একটি চ্যালেঞ্জ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি।’
স্থায়ীভাবে রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব গ্রহণ করা বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের জন্য নৈতিকভাবে এবং কৌশলগতভাবে সম্ভব নয় এমনটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শুধু অপেক্ষা করা এবং পরিস্থিতির উন্নতির আশা করার অর্থ হলো, পরিস্থিতি প্রতিদিন আরও খারাপ হবে।’
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট শুরু হওয়া সর্বশেষ রোহিঙ্গা-ঢলে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ বাংলাদেশে ঢুকে পড়েন। এরপর ক্যাম্পে জন্ম হয়েছে কয়েক লাখ শিশুর। ২০১৭ সালে ২৩ নভেম্বর স্বাক্ষর হওয়া চুক্তি অনুয়ায়ী, ২০১৬ সাল থেকে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে, তাদের এবং তাদের সন্তানদের ফেরত পাঠানোর কথা রয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা ‘শরণার্থী’ বাংলাদেশে বসবাস করছে। ২০২৪ সালের শুরু থেকে আনুমানিক দেড় লাখ মানুষ মিয়ানমারের রাখাইন থেকে নতুন করে এসে পৌঁছেছেন।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রায় প্রতিদিন কিছু না কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকলেও সরকারের পক্ষ থেকে তাদের ফেরত পাঠানোর প্রয়োজনে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য গত ছয় বছর মিয়ানমারকে কোনো তালিকা পাঠানো হয়নি। মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের সর্বশেষ তালিকা পাঠানো হয় ২০২০ সালে।
বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া তালিকাগুলোর ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ রোহিঙ্গার মধ্যে মিয়ানমার ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে ফেরত নেওয়ার জন্য শনাক্ত করা হয়েছে। মিয়ানমারের দাবি, তালিকার ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় যাচাই করা সম্ভব হয়নি। আর সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত আছে ৪ হাজার ২৪১ জন। বাংলাদেশ মিয়ানমারের যাচাই প্রক্রিয়াকে ধীরগতির ও ত্রুটিপূর্ণ বলে অভিহিত করেছে।
মিয়ানমারকে তালিকা দেওয়ার কাজটি সাধারণত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় করে থাকে। মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দাবি, দেশের ভেতরকার রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ বিভিন্ন কারণে তালিকা হস্তান্তর করা অব্যাহত রাখা যায়নি। সরকার এ কাজটি আবার হাতে নেবে।
তবে মিয়ানমারের রাখাইনে সীমান্তসংলগ্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ দেশটির সেনাপ্রভাবিত সরকারের হাতছাড়া হয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির কাছে যাওয়ায় তালিকা কাকে দিলে কাজ হতে পারে, সে বিষয়েও বাংলাদেশ সরকারের ভেতর সংশয় আছে। কর্মকর্তারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার বিষয়ে সেনাপ্রভাবিত সরকার ও আরাকান আর্মি উভয়েরই অনীহা স্পষ্ট। এ কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যুক্ত করে একটি ত্রিপক্ষীয় অথবা বহুপক্ষীয় আলোচনার পর তালিকা আবার পাঠানো এবং রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন। এটাই সামনে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র টেকসই পথ।’
কূটনীতিকদের তথ্যানুযায়ী, রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে দাতা দেশ, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য আছে। মিয়ানমার সরকার মনে করে, তাদের যাচাই করা তালিকা ধরে বাংলাদেশ সরকার যেকোনো উপায়ে ও শর্তহীনভাবে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো শুরু করলে এতদিনে অনেকে রাখাইনে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারত।
অন্যদিকে রোহিঙ্গারা চায় মিয়ানমারের নাগরিকত্ব, পূর্ণ নিরাপত্তা, পুনর্বাসন এবং ফেলে আসা নিজ নিজ মালিকানাধীন বাড়ি ও ভূখন্ডে স্বেচ্ছায় যাওয়ার সুযোগ।
জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা চায় মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের এসব দাবির অধিকাংশ মিয়ানমার সরকার মেনে নিক। বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার এ বিষয়ে বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের পর তাদের অধিকার রক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমের বাংলাদেশ প্রধান ড. লরা টম-বন্ডে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংকটটি সহজ হচ্ছে না। তিনি বলেন, যখন সুরক্ষা, শিক্ষা এবং জীবিকার সুযোগ সংকুচিত হয়, তখন মানুষ আরও বেশি অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হবেন এবং অনিরাপদ-পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়া এবং পাচার ও শোষণের শিকার হওয়ার মতো ক্ষতিকর কৌশল অবলম্বন করতে পারেন।