রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের সূতিকাগার হলেও ক্রমশ এই সেক্টরে পিছিয়ে পড়ছে চট্টগ্রাম। একসময় ৭০০-এর বেশি কারখানা নিয়ে এ শিল্পে চট্টগ্রাম উল্লেখযোগ্য অবদান রাখলেও বর্তমানে এখানে ছোট, বড় আর মাঝারি মিলিয়ে কারখানার সংখ্যা নেমে এসেছে ৪০০-এর কোটায়। সংকট সামাল দিতে না পারায় একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কারখানা। আর সচল কারখানাগুলোর অধিকাংশই চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। ফলে তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে চট্টগ্রামের অবদান ক্রমশ কমছে।
এ খাতের ব্যবসায়ী ও বিজিএমইএ নেতারা বলছেন পুঁজির ঘাটতি, ব্যাংকিং সহযোগিতার অভাব, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এবং সরকারের পলিসি সাপোর্টের অভাবেই ধুঁকছে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের তৈরি পোশাক খাত।
বিজিএমইএ সূত্র জানায়, ১৯৭৮ সালে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতীরবর্তী কালুরঘাটে দেশ গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি শুরু হয়। মুজিবনগর সরকারের সংস্থাপন সচিব নুরুল কাদের খানের প্রতিষ্ঠিত কারখানাটির ধারাবাহিকতায় এখানে একের পর এক গার্মেন্টস কারখানা প্রতিষ্ঠার দিকে ঝুঁকেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত চট্টগ্রামের গার্মেন্টস খাত ছিল রমরমা অবস্থায়। ওই সময় চট্টগ্রামে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ গার্মেন্টস কারখানা ছিল এবং দেশের পোশাক রপ্তানি খাতের প্রায় ৪০ শতাংশ অবদান ছিল এ গার্মেন্টগুলোর। ২০১৩ সালের রানা প্লাজাধস-পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের গার্মেন্টস কারখানাগুলোর একটি বড় অংশ বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। বৈশি^ক কমফ্লায়েন্স ধরে রাখতে না পারায় এ সময় অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে অবকাঠামোগত সুবিধার অভাব, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, ব্যাংকিং জটিলতা ইত্যাদি কারণে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ে চট্টগ্রামের গার্মেন্টস খাত।
একাধিক গার্মেন্টস ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি শিল্পে বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে জ্বালানির ঘাটতি। উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পোশাক কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য হলেও এসব জ¦ালানির প্রয়োজনীয় সরবরাহ মিলছে না।
বিজিএমইএ পরিচালক ও এইচকেডি অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, প্রায় এক মাস ধরে মারাত্মক গ্যাস সংকটে ভুগছে গার্মেন্টস কারখানাগুলো। ফলে একদিকে উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে অন্যদিকে ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ অনুযায়ী পণ্য শিপমেন্টের ঝুঁকি বেড়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও তা যথেষ্ট নয়। কারণ ডায়িং, ওয়াশিং ও প্রিন্টিং কারখানাগুলোতে নির্দিষ্ট প্রেসারে গ্যাস না থাকলে সেখান উৎপাদন সম্ভব হয় না। অন্যদিকে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানাগুলো সচল রাখতে অধিকাংশ সময় ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ ৩০-৩৫ শতাংশ বেড়েছে।
তিনি বলেন, আবার অনেক কারখানায় বিদ্যুতের অভাবে শিফট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে অনেক সময় রপ্তানি আদেশ বাতিল হচ্ছে কিংবা এয়ার ফ্রেইট করতে হচ্ছে। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন রপ্তানিকারকরা। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে এ খাত আরও পিছিয়ে পড়বে বলেও তিনি জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, চট্টগ্রাম বন্দর স্থানীয় পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য বাড়তি সুবিধা হিসাবে থাকলেও বর্তমানে বড় বড় উদ্যোক্তারা চট্টগ্রামে তাদের নতুন কোনো ইউনিট স্থাপন না করে গাজীপুর কিংবা ময়মনসিংহে স্থানান্তর করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রতিষ্ঠিত পোশাক রপ্তানিকারক বলেন, চট্টগ্রামে বন্দর আছে, কিন্তু গ্যাস নেই। ক্রেতাদের আমরা পণ্যের মান দিতে পারলেও সময়মতো শিপমেন্ট দেওয়ার মতো জ্বালানির নিশ্চয়তা নেই। এভাবে এখানে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্ধ হয়ে যাওয়া অধিকাংশই ছোট ও মাঝারি কারখানা। বিজিএমইএর পরিচালক ও মেলো ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ মানছুর বলেন, গার্মেন্টস সেক্টরে ‘গ্রিন’ কিংবা ‘কমপ্লায়েন্স’ কারখানাগুলো হয়তো কমপ্লায়েন্স সদস্য, অর্থ সংকট, গ্যাস, বিদ্যুৎ কিংবা বায়ারের সঙ্গে সমস্যার কারণে বন্ধ হচ্ছে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো বন্ধ হচ্ছে ‘পলিসি’র কারণে। যেমন একটি বড় ফ্যাক্টরি কিংবা গ্রিন ফ্যাক্টরির লাইসেন্স নবায়নের জন্য যত ধরনের কাগজপত্র লাগবে এবং কমপ্লায়েন্স লাগবে- এটি তো হয় না। যেসব ছোট ছোট ফ্যাক্টরি বিএনবিসি কোড ছাড়াই আগে স্থাপিত হয়েছে, সেগুলো এখন বিএনবিসি কোড অনুযায়ী বিল্ডিং কোথায় পাবে?
এ ধরনের অযৌক্তিক ও অবাস্তব কিছু নীতিমালার কারণে এবং ব্যাংকিং সমস্যার কারণে কারখানাগুলো টিকে থাকতে পারছে না উল্লেখ করে মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ মানছুর বলেন, এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, দেশের পলিসি এসএমই বান্ধব না হওয়ার কারণে এসব কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় ছোট ও মাঝারি গার্মেন্টস কারখানাগুলোকে বাঁচাতে হলে এগুলোর জন্য আলাদা ‘এসএমই নীতিমালা’ প্রয়োজন জানিয়ে তিনি বলেন, নতুবা বিদ্যমান কারখানাগুলো তো বন্ধ হবেই পাশাপাশি নতুন কোনো ছোট ফ্যাক্টরিও গড়ে উঠবে না।