মেহেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল বেহাল হলেও এই হাসপাতালেই ঘটেছে এক অবিশ্বাস্য কা-! হাসপাতালের বার্ষিক ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দের মধ্যে এক বছরেই ২০ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে শুধু ‘পর্দা’ কেনাকাটায়। যা বরাদ্দের শতকরা প্রায় ৫৮ ভাগই খরচ হয়েছে পর্দা কেনায়। অথচ মেহেরপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অন্য খাত থেকে পণ্যসামগ্রী ক্রয়ের নামে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এই লুণ্ঠনের অভিযোগের তীর হাসপাতালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক (সুপার) ডা. বুলবুল কবির, বর্তমান প্রধান অফিস সহকারী আসাদুল ইসলাম লিটন এবং স্টোরকিপার পলি খাতুনের বিরুদ্ধে। যেখানে রোগীরা ওষুধ আর ন্যূনতম চিকিৎসা পান না, সেখানে হাসপাতালের সিংহভাগ টাকাই এভাবে পর্দার পেছনে খরচ দেখানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মেহেরপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালের অন্যান্য ক্রয়ের মধ্যে বিভিন্ন খাতে ৩৫ লাখ টাকার সামগ্রী সরবরাহে ঠিকাদার হিসেবে কাজ পায় মেহেরপুর ট্রেডিং। কিন্তু অর্থবছর পেরিয়ে গেলেও ওই প্রতিষ্ঠান থেকে দুই দফায় ৯ লাখ টাকার সামগ্রী নেওয়া হয়েছে। বাকি ২৬ লাখ টাকার সামগ্রী হাসপাতালের সুপার (তত্ত্বাবধায়ক) বুলবুল আহমেদ নিজস্ব মতামতের ভিত্তিতে নিজে এবং পছন্দের ঠিকাদার দিয়ে নামমাত্র স্টেশনারি সামগ্রী ক্রয় করেছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওই ২৬ লাখ টাকার মধ্যে শুধু পর্দা ক্রয়ে খরচ দেখিয়েছেন ২০ লাখ টাকা। তিনি টেন্ডার প্রক্রিয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চার সদস্যর একটি ক্রয় কমিটি করে এই পর্দা কিনেছেন ঢাকার পছন্দের এক ঠিকাদারের কাছে থেকে। তবে কত পিস পর্দা, কী মানের পর্দা ক্রয় করা হয়েছে সে হিসাব বড়বাবু লিটন ও স্টোরকিপার পলি খাতুন কেউই দিতে পারেননি। চার সদস্যর ক্রয় কমিটিতে ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. বুলবুল কবির, ডা. আবুল কাশেম, ডা. আমেনা খাতুন ও ডা. হাসিবুল ইসলাম।
সরেজমিনে হাসপাতালের নতুন ভবন অনুসন্ধান করে পুরো বিল্ডিংয়ে ৫৫০ থেকে ৬০০ পিস পর্দার হিসাব পাওয়া গেছে। স্থানীয় পর্দা ব্যবসায়ীরা জানানÑ সরকারি হাসপাতালে যে পর্দা ক্রয় করা হয়েছে সে পর্দার দাম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে সর্বোচ্চ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা হবে প্রতি পিস পর্দার দাম। যার সর্বোচ্চ মূল্য হবে ৩ লাখ টাকা। এর সঙ্গে পর্দার পাইপ ফিটিংস ও মিস্ত্রি খরচ দিয়ে আরও ৩ লাখ টাকা খরচ যুক্ত করলে ঊর্ধ্বে সব মিলিয়ে খরচ হবে ৬ লাখ টাকা। কিন্তু ক্রয় দেখানো হয়েছে ২০ লাখ টাকা। আবার এই পর্দাগুলো নতুন এমনটাও মনে হয়নি।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা বলেন, পর্দা ক্রয়ের সঠিক হিসাব সুপার এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই দিতে পারবে। তবে শুধু স্টেশনারি নয় স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় সরকার সাত থেকে আটটি খাতে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে থাকে জেলা হাসপাতালে। বরাদ্দগুলো কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, আদৌ ব্যয় হয় কি না, নাকি পুকুর চুরি হয় সে ব্যাপারে সঠিক কোনো হিসাব নেই হাসপাতালের কাগজে কলমে।
এই বিষয়ে স্টেশনারি সামগ্রী সরবরাহকারী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেহেরপুর ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী দেবাশীষ বাগচি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হাসপাতালের ওসিসিসহ স্টেশনারি খাতে ৩৫ লাখ টাকার কাজ পেয়েছিলাম। কিন্তু আমার কাছ থেকে দুই দফায় ৯ লাখ টাকার সামগ্রী নেওয়া হয়েছে। বাকি ২৬ লাখ টাকার মালামাল নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ইজিপির মাধ্যমে পাওয়া কাজ অন্য কোনো ঠিকাদার করতে পারে না। এক্ষেত্রে পুরো অর্থের মালামাল আমার কাছ থেকে না নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমার সঙ্গে অনিয়ম করেছে। আমি কিছু বলতে গেলে এখন আমাকে নানাভাবে থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
স্টোরকিপার পলি খাতুন বলেন, সাবেক সুপার বুলবুল স্যার নতুন বিল্ডিংয়ের জন্য ২০ লাখ টাকার পর্দা কিনেছেন। বড়বাবু লিটন বিল রেডি করে দিয়েছেন। আমি শুধু স্টোরকিপার হিসেবে মালামাল বুঝে নিয়েছি। তবে কোন ঠিকাদারের কাছে থেকে নিয়েছেন আমি সে ঠিকাদারকে চিনি না। পর্দাগুলো আদৌ ২০ লাখ টাকা মূল্যের কি না সেটাও জানি না। এত টাকার পর্দা কি কখনো লেগেছে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি কি এর জবাব দিতে পারি?
হাসপাতালের প্রধান অফিস সহকারী আসাদুল ইসলাম লিটন বলেন, ‘হাসপাতালের বস হচ্ছেন সুপার। তিনি যেভাবে বলেন আমাদের সেভাবেই কাজ করতে হয়। সাবেক সুপার বুলবুল স্যার তার নিজস্ব ক্ষমতাবলে ২০ লাখ টাকার পর্দা কিনেছেন।’ টেন্ডার প্রাপ্ত ঠিকাদারের সঙ্গে না নিয়ে কেন অন্য ঠিকাদারের কাছে থেকে নিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সুপার স্যার স্পট কোটেশনের মাধ্যমে কিনেছেন আমরা শুধু তার আদেশ বাস্তবায়ন করেছি।’ এখন ২০ লাখ টাকার পর্দার দাম ৩ লাখ টাকা কি না, সেটা তদন্ত সাপেক্ষ বিষয়।
প্রশ্ন করা হলে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. বুলবুল কবির বলেন, ‘স্টেশনারি সামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে জরুরি প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক ক্রয় কমিটি গঠন করে স্টেশনারি সামগ্রী কেনা যায়। সেভাবেই কেনা হয়েছে। যার নথি হাসপাতালে রয়েছে। আর এ বিষয়ে ঠিকাদার সব জানেন। আমার পরে যিনি সুপার যোগদান করবেন তিনি বাকি টাকা হয়তো সমন্বয় করবেন।’
এই হাসপাতালের পণ্যসামগ্রী ক্রয় কমিটির সদস্য ডা. আবুল কাশেম ও ডা. হাসিবুল ইসলাম বলেনÑ আমরা এমন কমিটির সঙ্গে যুক্ত, সেখানে আমাদের নাম আছে এটাই প্রথম শুনলাম। সেই ক্ষেত্রে হাসপাতালের পর্দা ক্রয়ে নিয়ম বা অনিয়ম কিছু থাকলে সেটা আমরা জানি না। চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ সংকটে বিপর্যস্ত এই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়েই হিমশিম খাই আমরা। সেখানে পর্দা ক্রয়ের খোঁজ রাখা আমাদের জন্য অসম্ভব।
মেহেরপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য জেলা জামায়াতের আমির তাজ উদ্দিন খান বলেন, ‘হাসপাতালের অনিয়মের বিষয়ে অবশ্যই অনুসন্ধান করব, যদি ব্যত্যয় পাই ব্যবস্থা গ্রহণ করব। হাসপাতালে কোনো ধরনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আমি রাখতে চাই না।’