রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আবদুল গফুরকে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। যোগ্যতা ছাড়া চাকরি পাওয়া, প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ ও নানা অনিয়মের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হয়েছিলেন সাময়িক বরখাস্ত। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় আবার ফিরে পেয়েছেন নিজের চেয়ার। খোদ আবদুল গফুরই দাবি করেছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালন চালিয়ে যেতে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে তা আনতে তাকে ‘২০ লাখ টাকা খরচ’ করতে হয়েছে। এ নিয়ে তোলপাড় তৈরি হলে তাকে ফের বরখাস্ত ও বিচারের দাবিতে ১০ ঘণ্টা অনশন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
বিভিন্ন অভিযোগে গত ৭ জানুয়ারি আবদুল গফুরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরপর তিনি শাস্তি প্রত্যাহারের জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালান। সর্বশেষ গত ৭ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি অফিস আদেশ নিয়ে যান রাবিপ্রবিতে। এরপর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই চিঠি জমা দিয়ে ১০ জুন থেকে ফের পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।
রেজিস্ট্রার দপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের চাপে গফুরকে পিডির দায়িত্ব চালিয়ে দিতে বাধ্য হয় বিশ্ববিদ্যালয়। মন্ত্রণালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় পিডি নিয়োগ দেয় মন্ত্রণালয়, তাই মন্ত্রণালয়ের পিডিকে বিশ্ববিদ্যালয় বাদ দিতে পারে না। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় তাকে কাজ করতে দেয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়নি। মন্ত্রণালয়ের চিঠির কারণে তাকে কেবল পিডি অফিসে কাজ করতে দেওয়া হয়। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে গত ১০ আগস্ট থেকে ক্যাম্পাসে আসছেন না পিডি গফুর।’
রাবিপ্রবির একাধিক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা জানান, মন্ত্রণালয়ের চিঠি বিশ্ববিদ্যালয়ে এনে পিডি হিসেবে নতুন করে অফিস শুরু করেন আব্দুল গফুর। তিনি খোলাখুলিভাবে সবার কাছে জানান, ২০ লাখ টাকা দিয়ে এই চিঠি বের করতে হয়েছে। পিডির চিঠি পেতে আর্থিক লেনদেনের কথা স্বীকার করেছেন গফুর, এমন একটি ফোনকলের অডিও রেকর্ড রয়েছে দেশ রূপান্তরের কাছে।
পিডির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইউনুস ইয়ামীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যখন তার কাছে জানতে চাই সাময়িক বরখাস্ত হয়ে তিনি কীভাবে অফিস করছেন তখন পিডি জানান, তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি নিয়ে এসেছেন। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের একপর্যায়ে তিনি বলেন, এই চিঠি ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে নিয়েছেন, তাই কেউ তার কিছু করতে পারবে না।’
ইউনুস ইয়ামীন আরও বলেন, ‘পিডি নিজ মুখে স্বীকার করেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পরিকল্পনা অধিশাখা-০৪ এর কর্মকর্তা মিঠুন তালুকদারের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা লেনদেন করেন এবং গফুরের ভাষ্য অনুযায়ী এর সঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে পরিকল্পনা অধিশাখায় যুগ্মসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেনও জড়িত।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পরিকল্পনা অধিশাখা-০৪ এর কর্মকর্তা মিঠুন তালুকদারের সঙ্গে আবদুল গফুরের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। সাময়িক বরখাস্তের পর থেকে মিঠুনের মাধ্যমে তিনি মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি বের করার চেষ্টা চালান। তবে তখনকার উপাচার্য ড. মো. আতিয়ার রহমানের কঠোর অবস্থানের কারণে সফল হননি। এরপর গত ১৪ মে ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিককে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। এর প্রায় এক মাস পর মন্ত্রণালয়ের চিঠি নিয়ে ক্যাম্পাসে হাজির হন আবদুল গফুর।
এর আগে মিঠুন তালুকদারের সঙ্গে আবদুল গফুর একাধিকবার ফোনে কথা বলেন। বিষয়টি স্বীকার করে মিঠুন তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার সঙ্গে এই সময়ে তার ফোনে কয়েকবার কথা হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে এই কথা হয়েছে।’ আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পিডি নিয়োগ দেয় মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা। আমি কেবল ফাইল তুলেছি, কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়নি। এ নিয়ে পিডির সঙ্গে আমার কোনো আলাপ হয়নি।’
এর বেশি কোনো তথ্য জানতে চাইলে তথ্য অধিকারে আবেদন করার পরামর্শ দিয়ে ফোন রেখে দেন মিঠুন তালুকদার। অন্যদিকে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা অধিশাখায় যুগ্মসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে পিডি নিয়োগ দেওয়া হয় বলে বিশ্ববিদ্যালয় তার নিয়োগ বাতিল করতে পারে না। পিডি নিয়োগ দেন শিক্ষা সচিব, তাই কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এ রকম কোনো কাজে আমি জড়িত নই।’
পুরো ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. জুনাইদ কবির বলেন, ‘মূল পদ না থাকলে যে কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া অতিরিক্ত সব দায়িত্ব থেকে স্বাভাবিকভাবেই বাদ পড়ে যান। পিডি হিসেবে আব্দুল গফুর যে দায়িত্ব পালন করছেন নিয়ম অনুযায়ী তা বৈধ নয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি।’
আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাবিপ্রবির উপাচার্য ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের অনেক কিছুই অনেকের ব্যাপারে শুনেছি-শুনছি।’
সাময়িক বহিষ্কৃত ব্যক্তির বহিষ্কারাদেশ না তুলে তাকে অফিস করতে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার বিষয়টি সব ডিন, চেয়ারম্যানের সভায় উপস্থাপনের পর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শুধু পিডির দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। নিয়োগপত্রের শর্তাবলিতে এ বিষয়ে উল্লেখ আছে। আমরা কোনোভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো আইনের লঙ্ঘন করিনি বা কোনো ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট পদক্ষেপও নিইনি। শুধু মন্ত্রণালয়ের আদেশ বাস্তবায়ন করেছি।’
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে পিডি আবদুল গফুরকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। একপর্যায়ে তিনি কল রিসিভ করে পরিচয় অস্বীকার করে নিজেকে কুমিল্লার বাসিন্দা দাবি করে নম্বর ব্লক করে দেন। এ ছাড়া দেশ রূপান্তরের রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েও তাকে খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হন।
এর আগেও বিস্তর অভিযোগ : ২০১৬ সালের ৯ জুন রাবিপ্রবিতে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়। যেখানে যোগ্যতা বলা হয়েছিল, শিক্ষাগত জীবনের প্রতিটিতে ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণি/বিভাগ থাকতে হবে। তবে এই পদে নিয়োগ পাওয়া আবদুল গফুরের স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে তৃতীয় শ্রেণি রয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন প্রার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি বা আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন সংক্রান্ত কাজে পাঁচ বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকার শর্তও দেওয়া হয়েছিল। অথচ তিনি অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখান একটি বিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগে শিক্ষকতা ও পরে একই বিদ্যালয়ে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে চার বছরের চাকরি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পে চার মাসের কর্মকাণ্ড। বিজ্ঞপ্তি দেওয়া পদে যোগ দেওয়ার পরেই তার বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার অভিযোগ ওঠে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যবিহীন অবস্থায় থাকার সময়ে গফুর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নিজ নামে ভারপ্রাপ্ত পিডির চিঠি বাগিয়ে নেন। সপ্তম গ্রেডের একজন কর্মকর্তাকে তৃতীয় গ্রেডের প্রকল্প পরিচালক করা নিয়মের লঙ্ঘন হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে পিডির দায়িত্ব দেয়। এরপর নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে। একটি সূত্র জানায়, তিনি, ৮০ হাজার টাকার টেবিলের দাম ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেখিয়ে বিল উত্তোলনসহ আসবাবপত্র বাবদ বরাদ্দ করা ৩০ লাখ টাকা নিয়ে ব্যাপক নয়ছয় করেছেন। এমনকি সরকারি টাকায় কেনা ফার্নিচার নিজের বাসাতেও নিয়ে যান। গফুর বিভিন্ন বিল থেকে কমিশন আদায় করেনএমন অভিযোগ দুদকে দিয়েছেন ঠিকাদাররা।