শরণার্থী জীবন চাই না দেশে ফিরতে চাই

‘নাইন ইয়ারস গন, থিংক টেন মিনিটস ফর রোহিঙ্গা’ প্রতিপাদ্যে গতকাল মঙ্গলবার রোহিঙ্গা গণহত্যার নবমবার্ষিকী কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতে পালিত হয়েছে। ২০১৭ সালের এই দিনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালায়। নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ আশ্রয় নেয়। দিবসটি উপলক্ষে গতকাল সকাল থেকেই দুই উপজেলার প্রধান প্রধান ক্যাম্পগুলোতে স্মরণ সভা, সমাবেশ ও র‌্যালির আয়োজন করা হয়। মিয়ানমারে নিজেদের দেশে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বিশ্বনেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য আন্তর্জাতিক মহলে এই সমাবেশের বার্তা তুলে ধরাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।

গতকাল উখিয়ার ৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের (মধুছড়া) ফুটবল মাঠসহ টেকনাফের লেদা, নয়াপাড়া ও শালবাগানসংলগ্ন ক্যাম্পগুলোর পাহাড়ের ঢালুতে লাখো রোহিঙ্গার ঢল নামে। ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড হাতে তারা এতে অংশ নেয়। তাদের সেøাগান ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস, উই ওয়ান্ট টু গো হোম’ (আমরা বিচার চাই, আমরা বাড়ি ফিরতে চাই)। সমাবেশে গণহত্যায় নিহতদের স্মরণ, রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা, ন্যায়বিচারসহ মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানানো হয়। শান্তিপূর্ণভাবে দুপুর নাগাদ মোনাজাতের মাধ্যমে দিবসের কর্মসূচি শেষ হয়।

বক্তারা বলেন, ২০১৭ সালের সহিংসতার ক্ষত এখনো রোহিঙ্গাদের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। ৯ বছর পার হলেও আমরা নিজ দেশে ফিরতে পারিনি। আমরা আর শরণার্থী জীবন চাই না। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই। যদি বিশ্ব সম্প্রদায় আমাদের দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়, তবে নিজেদের অধিকার রক্ষায় আমরা গুলি ধরতেও প্রস্তুত। বিশ^ নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্যে রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী মোহাম্মদ রফিক বলেন, ‘আমরা এখানে ৯টা বছর পার করেছি। এদেশ আমাদের নয়, আমরা নিজ দেশে ফিরতে চাই। আরকান আমাদের, এর চেয়ে আর বড় কোনো সত্য নেই এবং সেটি বিশ্বকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।’

ইফসিআরের প্রেসিডেন্সিয়াল প্যানেলের সদস্য মোহাম্মদ সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ‘বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়ে যে মানবতা দেখিয়েছে, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। আমরা জন্মভূমি মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চাই। প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ। প্রত্যাবাসনের পর নিরাপত্তা, অধিকার, নাগরিকত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা ও জীবিকার নিশ্চয়তাও দিতে হবে।’ সমাবেশে বার্মিজ ভাষায় বক্তব্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ইউসিআর নেতা মাস্টার শোয়েব। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে এমনভাবে কাজ করতে হবে, যাতে আমরা ভয় বা অনিশ্চয়তা ছাড়াই ফিরতে পারি।’

উখিয়া ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, আমরা এই শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে আমাদের ওপর হওয়া গণহত্যার বিচার দ্রুত শেষ করতে হবে। আমরা কোনো ত্রাণ ভিক্ষা চাই না। আমরা মিয়ানমারের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং আমাদের পিতৃভূমি রাখাইন ফেরত চাই।

টেকনাফের লেদা ২৪নং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা মৌলবি মোস্তফা কামাল বলেন, ‘রাখাইনে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘাতে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে। তবে মিয়ানমারই আমাদের একমাত্র জন্মভূমি। বিশ্বনেতাদের কাছে আমাদের অনুরোধ, শুধু মুখের কথায় কিংবা সমবেদনায় আমাদের ভাগ্য বদলাবে না। মিয়ানমার জান্তা ও সংশ্লিষ্টদের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও চাপ বৃদ্ধি করুন যেন তারা জাতিসংঘের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আমাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সরকার মানবিক কারণে প্রায় ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে, যা এদেশের অর্থনীতি, স্থানীয় জনসংখ্যা এবং পরিবেশের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে। রোহিঙ্গারা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের অধিকারের কথা তুলে ধরেছে। তবে বিশ্ব মহলের মনোযোগ ও আর্থিক সহায়তা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক সব মাধ্যমে একটি টেকসই ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে রাখাইনের বর্তমান অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেটি বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলের উচিত সেখানে এমন একটি নিরাপদ জোন বা পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে রোহিঙ্গারা আস্থা নিয়ে ফিরে যেতে পারে।

সমাবেশে রোহিঙ্গাদের উত্থাপিত প্রধান ৭টি দাবি : মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইন অবিলম্বে বাতিল করে রোহিঙ্গাদের মূল জাতিগত স্বীকৃতি ও পূর্ণ নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া; রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের পূর্বপুরুষের সব জমিজমা, ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি যথাযথ ক্ষতিপূরণসহ ফেরত দেওয়া; ২০১৭ সালের গণহত্যার সঙ্গে জড়িত মিয়ানমার সামরিক জান্তা ও দোষীদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার সুনিশ্চিত করা; জাতিসংঘের নিরাপত্তা গ্যারান্টিসহ আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা; রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান সহিংসতা ও নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধ করা; আন্তর্জাতিক দাতাদের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা ও রেশন আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রকৃত প্রতিনিধিদের (যেমন উসিআর ও কমিউনিটি লিডার) সরাসরি আলোচনা টেবিলে অন্তর্ভুক্ত করা।

নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক (পুলিশ সুপার) মোহাম্মদ হাসান বারী নূর বলেন, ‘২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের গণহত্যা স্মরণ দিবস উপলক্ষে সকাল থেকেই ক্যাম্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল। ক্যাম্পের স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার রাখা হয়েছে।’