সাহাবিদের কবিতায় নবীজি

নবীজির প্রতি সাহাবায়ে কেরাম গভীর ভালোবাসা পোষণ করতেন। এই ভালোবাসা তাদের যাপিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ পেত। তৎকালীন আরবে মানুষের মেধা ও মনন প্রকাশের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম ছিল কবিতা। শব্দ ও ছন্দের নিপুণ গাঁথুনিতে তারা নিজেদের হাসি, কান্না, প্রেম, বিরহ এবং বীরত্বের কথা তুলে ধরতেন। যখন তারা অজ্ঞতার ঘোর অন্ধকার থেকে বেরিয়ে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন এবং নবীজির পবিত্র সান্নিধ্য লাভ করেন, তখন অনেকেই তাকে নিয়ে কাব্য রচনা করেন।

হজরত হাসসান ইবনে সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারের অন্যতম প্রধান কবি। তাকে ‘শায়েরুর রাসুল’ তথা রাসুলের কবি উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। মক্কার কুরাইশরা যখন নবীজির শানে বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা কুৎসা রটনা করত এবং ব্যঙ্গাত্মক কবিতা আবৃত্তি করে ইসলামকে হেয় করার চেষ্টা করত, তখন হাসসান ইবনে সাবিত নিজের ক্ষুরধার শব্দের মাধ্যমে তার মোক্ষম জবাব দিতেন। মসজিদে নববিতে নবীজি তার জন্য একটি বিশেষ মিম্বর স্থাপন করে দিয়েছিলেন, যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি কবিতা আবৃত্তি করতেন।

নবীজিকে নিয়ে তার একটি বিখ্যাত কবিতা হলো, ‘আমার চোখ আপনার চেয়ে সুন্দর কাউকে কখনো দেখেনি এবং কোনো নারী আপনার চেয়ে সুন্দর কাউকে জন্ম দেয়নি। আপনি সব ধরনের ত্রুটি থেকে মুক্ত হয়ে সৃজিত হয়েছেন, যেন আপনি ঠিক সেভাবেই সৃষ্টি হয়েছেন, যেভাবে আপনি চেয়েছেন।’ (দিওয়ানে হাসসান ইবনে সাবিত ৫৯, তাফসিরে রুহুল মাআনি ২২/৩৬)

এই কবিতার ব্যাখ্যায় ইসলামিক স্কলাররা বলেন, এখানে নবীজির বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক উভয় সৌন্দর্যের এক নিখুঁত ও অনুপম চিত্রায়ণ করা হয়েছে। হাসসান ইবনে সাবিত বোঝাতে চেয়েছেন, মহান আল্লাহ তার হাবিবকে এতটা নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, মানবীয় কোনো ত্রুটি তাকে সামান্যতম স্পর্শ করতে পারেনি। মনে হয় যেন আল্লাহ সৃষ্টির পূর্বেই তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি কেমন রূপ লাভ করতে চান এবং ঠিক সেভাবেই তাকে পরম মমতায় সাজিয়ে তুলেছেন। এটি মূলত স্রষ্টার সৃষ্টির এক অপূর্ব নৈপুণ্য এবং নবীজির অতুলনীয় মর্যাদার এক কাব্যিক বহিঃপ্রকাশ।

কাব ইবনে জুহাইর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম হৃদয়স্পর্শী এক অধ্যায়। তিনি ছিলেন আরবের প্রখ্যাত কবি পরিবারের সন্তান। প্রথম দিকে তিনি ইসলামের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং নবীজিকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে কবিতা লিখতেন। তার অপরাধ এতই মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং কেউ তাকে আশ্রয় দিতে রাজি ছিল না। অবশেষে যখন পৃথিবীর সব দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে গেল, তখন তার হৃদয়ে ইসলামের আলো প্রবেশ করে। তিনি গোপনে মদিনায় আসেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। সেই ঐতিহাসিক ও আনন্দঘন মুহূর্তে তিনি তার বিখ্যাত একটি কবিতা আবৃত্তি করেন। তা হলো, ‘নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ হলেন এমন এক জ্যোতি, যার মাধ্যমে আলো গ্রহণ করা হয়। তিনি আল্লাহর কোষমুক্ত তরবারিগুলোর মধ্যে অন্যতম এক তীক্ষè তরবারি।’ (সিরাতে ইবনে হিশাম ২/৫১৩)

এই কবিতায়, কাব ইবনে জুহাইর নবীজিকে দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। প্রথমত, তিনি তাকে এমন এক জ্যোতি বা আলোর সঙ্গে তুলনা করেছেন যা সমগ্র মানবজাতিকে অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও শিরকের অন্ধকার থেকে বের করে হেদায়েতের পথ দেখায়। দ্বিতীয়ত, তিনি তাকে আল্লাহর কোষমুক্ত তরবারি বলেছেন, যার অর্থ হলো তিনি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে এক আপসহীন শক্তি, যিনি বাতিলকে ধ্বংস করতে দ্বিধা করেন না। এই অসাধারণ কবিতা শুনে নবীজি এতই মুগ্ধ ও আবেগাপ্লুত হন যে, তিনি নিজের গা থেকে তার ইয়েমেনি চাদর খুলে কাবকে পরিয়ে দেন। এটি ছিল তৎকালীন আরবে একজন কবির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ এবং অকল্পনীয় পুরস্কার।

আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন মদিনার আনসার সাহাবিদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও অকুতোভয় বীর যোদ্ধা। তিনি বদর, ওহুদ, খন্দকসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। অষ্টম হিজরিতে সংঘটিত মুতার যুদ্ধে তিনি মুসলিম বাহিনীর অন্যতম সেনাপতির দায়িত্ব পালনকালে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে শাহাদাত বরণ করেন। তিনি তার উদ্দীপ্ত কবিতার মাধ্যমে মুসলিম মুজাহিদদের যুদ্ধের ময়দানে সাহস জোগাতেন।

তিনি রচনা করেছেন ‘আমাদের মধ্যে আল্লাহর রাসুল রয়েছেন, যিনি কিতাব তেলাওয়াত করেন, যখন ভোরের আলো চারদিকে উদ্ভাসিত হয়। তিনি অন্ধত্বের পর আমাদের পথের দিশা দেখিয়েছেন, তাই আমাদের হৃদয় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, তিনি যা বলেন তা অবশ্যই ঘটবে।’ (সহিহ বুখারি ১১৫৫)

এই কবিতায় মদিনার প্রাত্যহিক জীবনের এক শান্ত, স্নিগ্ধ ও পবিত্র চিত্র ফুটে উঠেছে। ফজরের সময় যখন চারদিক নিস্তব্ধ থাকে এবং ভোরের আলো ফুটতে শুরু করে, তখন নবীজির সুমধুর কণ্ঠে পবিত্র কোরআনের তেলাওয়াত সাহাবিদের হৃদয়কে কীভাবে প্রশান্ত করত এবং তাদের আত্মাকে কীভাবে সজীব করত, তা এখানে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বোঝানো হয়েছে। একই সঙ্গে এই কবিতায় রয়েছে নবীজির প্রতি সাহাবিদের অগাধ ও অটল বিশ্বাস। জাহেলিয়াতের ঘোর অন্ধকারের পর নবীজিই যে তাদের আলোর পথ দেখিয়েছেন, সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি এখানে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে যে, নবীজির প্রতিটি ভবিষ্যদ্বাণী এবং ওয়াদা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।

আবু বকর সিদ্দিক (রা.) কবি ছিলেন না, কিন্তু নবীজির প্রতি তার অকৃত্রিম প্রেম ও অন্তরের টান তার মুখ থেকে অসাধারণ সব বাক্য বের করে আনত, যা বড় বড় কবিদেরও হার মানাত।

নবীজিকে নিয়ে তিনি রচনা করেছেন, ‘তিনি বিশ্বস্ত, মনোনীত, কল্যাণের দিকে আহ্বানকারী। তিনি যেন পূর্ণিমার চাঁদের আলো, যা সব অন্ধকার দূর করে দেয়।’ (আস-সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকি ১৩২৯২)

এই কবিতায় রয়েছে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সেই দৃঢ় বিশ্বাস, যা তিনি নবুয়তের অনেক আগে থেকেই নবীজির প্রতি হৃদয়ে লালন করতেন। তিনি নবীজিকে আল-আমিন বা বিশ্বস্ত বলেছেন, কারণ তিনি নিজে দীর্ঘদিনের বন্ধু হিসেবে এর সবচেয়ে বড় ও বিশ্বস্ত সাক্ষী। তিনি তাকে পূর্ণিমার চাঁদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আরবদের কাছে ধু ধু মরুভূমির বুকে রাতের বেলা পূর্ণিমার চাঁদ ছিল পথ চলার সবচেয়ে বড় সহায়ক এবং সৌন্দর্যের প্রতীক। আবু বকর বুঝিয়েছেন, নবীজি অজ্ঞতার রাতের আঁধারে পথহারা মানবজাতির জন্য এক উজ্জ্বল পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে পৃথিবীতে আগমন করেছেন, যার স্নিগ্ধ ও পবিত্র আলো মানুষের জীবনের সমস্ত দুঃখ, কষ্ট, পাপ ও পথভ্রষ্টতাকে নিমেষেই দূর করে দেয়।

হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবীজিকে নিয়ে রচনা করেছেন, ‘আকাশের কেন, আমার কাছেও একটা সূর্য আছে। আকাশের ওই সূর্য নিছক তুচ্ছ আমার কাছে। সকাল হলেই আকাশের ওই সূর্যের দেখা মেলে। আমার সূর্য দীপ্তি ছড়ায় ধরায় আঁধার এলে।’ (আর-রাহিকুল মাখতুম গ্রন্থে আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী ৪৮৭)

এই কবিতাটিতে রয়েছে একাধারে অসীম ভক্তি এবং গভীর দাম্পত্য প্রেমের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। এখানে তিনি আকাশের প্রাকৃতিক সূর্যের সঙ্গে তার নিজের জীবনের সূর্য অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক চমৎকার তুলনা টেনেছেন। আকাশের সূর্য কেবল দিনের বেলা আলো দেয় এবং রাতের অন্ধকারে তা সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়। কিন্তু আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার মতে, তার সূর্যটি এতটাই প্রখর ও মহান যে, যখন পৃথিবীর বুকে দুঃখ, কষ্ট, বিপদ বা অজ্ঞতার ঘোর আঁধার নেমে আসে, তখন তার সূর্য অর্থাৎ নবীজির অস্তিত্ব, তার শিক্ষা এবং তার আদর্শ চারদিকে সবচেয়ে বেশি দীপ্তি ছড়াতে শুরু করে। এটি একাধারে একজন আদর্শ স্ত্রী হিসেবে প্রাণপ্রিয় স্বামীর প্রতি ভালোবাসা এবং একজন একনিষ্ঠ উম্মত হিসেবে বিশ্বনবীর প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার এক অনন্য নিদর্শন, যা যুগের পর যুগ মানুষকে মুগ্ধ করে আসছে।