ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়...

মহানবীর মহাজীবন

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩৬ এএম

নবীজির আগমন ছিল মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত। তার আগমনের পূর্বে পৃথিবী ছিল অজ্ঞতা, কুসংস্কার, পাপাচার ও অন্যায়ের ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন। সত্যের পরিবর্তে মিথ্যা, ন্যায়ের পরিবর্তে জুলুম এবং মানবতার পরিবর্তে হিংস্রতা সমাজজীবনকে গ্রাস করেছিল। এমন ক্রান্তিলগ্নে মা আমিনার কোল অলংকৃত করে পৃথিবীতে আসেন সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। এতে যেন নিস্তব্ধ রাতের বুকে আলো ফুটে উঠে। যেন মা আমিনার কোলে দুলতে থাকে মধু পূর্ণিমার চাঁদ। তার আগমনে বদলে যায় ইতিহাসের গতিপথ। মানুষের হৃদয়ে জাগে মানবতা, ন্যায়, ভালোবাসা ও আল্লাহভীতির চেতনা। তিনি ছিলেন অসহায় মানুষের আশ্রয়, পথহারা মানুষের পথপ্রদর্শক। তার পবিত্র জীবন হয়ে উঠে সত্য ও সুন্দর জীবনের আদর্শ

মহান আল্লাহর সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)। অন্ধকারাচ্ছন্ন আরব সমাজে তার জন্ম। শৈশব থেকেই নানা কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন। সততা, আমানতদারি ও মানবিকতার মাধ্যমে অর্জন করেন মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা। এরপর নবুয়ত, দাওয়াত, নির্যাতন, হিজরত ও বিজয়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি মানবজাতির জন্য রেখে যান অনন্য আদর্শ জীবন।

জন্ম : মক্কার বনি হাশিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মুহাম্মদ (সা.)। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, তার জন্ম হয় ৫৭০ বা ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে আমুল ফিল বা হাতির বছরে। তার জন্মতারিখ নিয়ে একাধিক মত পাওয়া যায়। সিরাতের কিতাবগুলোতে রবিউল আউয়াল মাসের ১২, ১০, ৮ ও ২ তারিখের কথা বলা হয়েছে। তবে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো ১২ রবিউল আউয়াল।

শৈশব ও কৈশোর : নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শৈশব ছিল অন্য অনেক শিশুর তুলনায় আলাদা। জন্মের আগেই বাবাকে হারান। প্রায় ছয় বছর বয়সে তার মা আমিনা (রা.)-ও ইন্তেকাল করেন। ফলে অল্প বয়সেই তিনি পিতৃমাতৃহীন হয়ে পড়েন। এরপর তার দাদা আবদুল মুত্তালিব তাকে লালন করেন। কিন্তু দুই বছর পর দাদাও ইন্তেকাল করেন। তখন তার দায়িত্ব নেন চাচা আবু তালিব।

এই ধারাবাহিক বিচ্ছেদ তার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি ছোটবেলা থেকেই অসহায় মানুষের কষ্ট বুঝতে শেখেন। কৈশোরে তিনি চাচা আবু তালিবের সঙ্গে ব্যবসায়িক সফরে অংশ নেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই তিনি মানুষের সঙ্গে মিশতে, দূরপথে চলতে এবং বাণিজ্যিক পরিবেশ বুঝতে শেখেন।

তার চরিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল সত্যবাদিতা। তিনি মিথ্যা বলতেন না। কারও আমানত আত্মসাৎ করতেন না। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতেন না। অশ্লীলতা ও জাহেলি সমাজের সব অনাচার থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন। এ কারণেই নবুয়তের আগেই মক্কার মানুষ তার ওপর গভীর আস্থা স্থাপন করে। তাকে বলা হতো আল আমিন তথা বিশ্বস্ত।

কৈশোর ও যৌবনের এই সময়টি ছিল তার ব্যক্তিত্ব গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখেছেন। দারিদ্র্য দেখেছেন। ব্যবসার বাস্তবতা দেখেছেন। গোত্রীয় সমাজের দ্বন্দ্ব দেখেছেন। একই সঙ্গে সত্যবাদিতা ও আমানতদারির মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেছেন। এই চরিত্রই পরবর্তী সময়ে তার নবুয়তি দায়িত্ব পালনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

ব্যবসা : যৌবনে নবীজি (সা.) ব্যবসার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হন। মক্কার কুরাইশরা বাণিজ্যে সুপরিচিত ছিল। বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের কাফেলা যাতায়াত করত। তিনি এই বাণিজ্যিক পরিবেশে সততা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেন। তার ব্যবসার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সততা। লাভের জন্য প্রতারণার আশ্রয় নিতেন না। ক্রেতা ও ব্যবসায়িক অংশীদারের অধিকার রক্ষা করতেন। পণ্যের ত্রুটি

থাকলে তা গোপন করতেন না। তার আচরণে মানুষ নিরাপত্তা ও আস্থা অনুভব করত।

এক পর্যায়ে মক্কার ধনী ও সম্মানিত ব্যবসায়ী খাদিজা (রা.) তার ব্যবসায়িক যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততার কথা জানতে পারেন। খাদিজা (রা.) ব্যবসার জন্য বিশ্বস্ত লোক নিয়োগ করতেন। তিনি মুহাম্মদ (সা.)-কে নিজের বাণিজ্যিক পণ্য নিয়ে সিরিয়ায় যাওয়ার দায়িত্ব দেন। এই সফরে তিনি খাদিজা (রা.)-এর পক্ষে ব্যবসা পরিচালনা করেন। এতে তার সততা ও দক্ষতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সততা, দায়িত্ববোধ, আমানতদারি ও পরিশ্রম তার ব্যবসায়িক জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।

বিয়ে : নবীজি (সা.)-এর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে বিয়ের মাধ্যমে। খাদিজা (রা.) ছিলেন মক্কার সম্মানিত ও সম্ভ্রান্ত নারী। বাণিজ্যিক সফরের পর মুহাম্মদ (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে খাদিজা (রা.)-এর ধারণা আরও গভীর হয়। তিনি নবীজি (সা.)-এর কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। তাদের বিয়ে হয়।

এই বিবাহ ছিল পারস্পরিক মর্যাদা, আস্থা ও ভালোবাসার ওপর প্রতিষ্ঠিত। নবুয়তের আগে তিনি তাকে সম্মান ও সমর্থন দিয়েছেন। প্রথম ওহি নাজিলের পর নবীজি (সা.) যখন গভীর উদ্বেগ নিয়ে ঘরে ফিরে আসেন, খাদিজা (রা.) তাকে সান্ত্বনা দেন।

খাদিজা (রা.) ছিলেন নবীজি (সা.)-এর প্রথম স্ত্রী। তার জীবদ্দশায় নবীজি (সা.) অন্য কোনো নারীকে বিয়ে করেননি। তাদের সংসারে হজরত জয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও ফাতিমা (রা.) জন্মগ্রহণ করেন।

খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে নবীজি (সা.)-এর দাম্পত্য ছিল তার নবুয়তের আগের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়। পরে তিনি তার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। নবীজি (সা.) খাদিজা (রা.)-এর মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন, তিনি ছিলেন তার যুগের শ্রেষ্ঠ নারীদের একজন।

নবুয়ত লাভ : মুহাম্মদ (সা.)-এর বয়স যখন চল্লিশ বছর, তখন শুরু হয় তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি নির্জনতা পছন্দ করতে শুরু করেন। মক্কার অদূরে হেরা গুহায় গিয়ে ইবাদত ও চিন্তায় সময় কাটাতেন। ওহি নাজিলের আগে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে তার প্রতি বিশেষ প্রস্তুতির সূচনা হয়। এরপর তিনি হেরা গুহায় নির্জনে অবস্থান করতেন। একসময় সেখানে তার কাছে প্রথম ওহি নিয়ে হজরত জিবরাইল (আ.) আগমন করেন। তখন সুরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত নাজিল হয়।

আমুল হুজন : মক্কায় দাওয়াতের কঠিন সময়ে নবীজি (সা.)-এর পাশে ছিলেন দুজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। একজন ছিলেন তার প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.)। অন্যজন ছিলেন তার চাচা আবু তালিব। খাদিজা (রা.) ছিলেন তার ঘরের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা। আর আবু তালিব ছিলেন সামাজিক ও পারিবারিকভাবে তার গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়।

কিন্তু নবুয়তের দশম বছরে অল্প সময়ের ব্যবধানে এই দুই আপনজনকে হারান নবীজি (সা.)। প্রথমে

ইন্তেকাল করেন খাদিজা (রা.)। এরপর ইন্তেকাল করেন আবু তালিব। তাদের মৃত্যু নবীজি (সা.)-এর জন্য ছিল গভীর বেদনার। এই সময়কে আমুল হুজন তথা দুঃখের বছর বলা হয়।

হিজরত : মক্কায় ইসলামের দাওয়াত যত ছড়িয়ে পড়তে থাকে, কুরাইশের নির্যাতনও তত বাড়তে থাকে। মুসলমানদের ওপর নানা ধরনের নিপীড়ন চালানো হয়। একপর্যায়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে মদিনায় হিজরতের নির্দেশ আসে।

মুসলমানরা ধীরে ধীরে মদিনায় হিজরত করতে থাকেন। এরপর আল্লাহর অনুমতি পেয়ে নবীজি (সা.)-ও মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তার সঙ্গে ছিলেন আবু বকর (রা.)। কুরাইশরা তাকে আটকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পরিকল্পনা ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসার মাধ্যমে তিনি মক্কা থেকে বের হন।

দীর্ঘ বিপদসংকুল পথ অতিক্রম করে তারা মদিনায় পৌঁছান।

মক্কা বিজয় : হিজরতের প্রায় আট বছর পর আসে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা, মক্কা বিজয়। যে নগরী থেকে নবীজি (সা.) ও তার সাহাবিদের নির্যাতনের কারণে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল, সেই মক্কাতেই তিনি ফিরে আসেন বিজয়ী হিসেবে।

৮ হিজরির রমজান মাসে মুসলিম বাহিনী মক্কার দিকে অগ্রসর হয়। বিপুল সংখ্যক সাহাবি নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে ছিলেন। কুরাইশরা বুঝতে পারে যে, প্রতিরোধের সুযোগ খুব সীমিত। তারা ভীত হয়ে যায়।

এই বিজয়ের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল নবীজি (সা.)-এর আচরণে। তিনি প্রতিশোধের জন্য মক্কায় প্রবেশ করেননি। বহু বছর যারা তাকে ও তার সাহাবিদের নির্যাতন করেছিল, তাদের ক্ষমা করে দেন। বিজয়ের মুহূর্তে আল্লাহর ঘরের পবিত্রতা ও তাওহিদ প্রতিষ্ঠাই ছিল প্রধান বিষয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত