ফাতেমার শোকগাথা

নবীজি (সা.)-এর ওফাতের সময় সাহাবায়ে কেরাম শোকে মুহ্যমান হয়ে যান। সবচেয়ে বেশি শোকাহত হন নবীকন্যা ফাতেমা (রা.)। তিনি ছিলেন নবীজি (সা.)-এর অত্যন্ত প্রিয় কন্যা। নবীজি (সা.) তাকে আসতে দেখলে উঠে দাঁড়াতেন। তার হাত ধরতেন। হাতে চুম্বন করতেন। নিজের জায়গায় বসাতেন। ফাতেমা (রা.)-ও বাবার প্রতি একই ভালোবাসা দেখাতেন। আয়েশা (রা.) বলেছেন, আচরণ, চলন ও কথাবার্তায় ফাতেমা (রা.)-এর চেয়ে নবীজি (সা.)-এর বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ কাউকে তিনি দেখেননি। (সুনান আবু দাউদ)

এই সম্পর্কের গভীরতা বোঝা যায় নবীজি (সা.)-এর একটি কথায়। তিনি বলেছেন, ‘ফাতেমা আমার একটি অংশ। যে তাকে কষ্ট দেয়, সে আমাকে কষ্ট দেয়।’ (সহিহ বুখারি)

নবীজি (সা.)-এর জীবনের শেষ সময়গুলো ফাতেমা (রা.)-এর জন্য কতটা কঠিন ছিল, তা সহজেই অনুমান করা যায়। নবীজি (সা.)-এর শেষ অসুস্থতা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছিল। একসময় তার অসুস্থতা তীব্র হয়ে উঠল। তাকে দেখে ফাতেমা (রা.) বলে উঠলেন, ‘আহ্! আমার বাবার কী কষ্ট!’ নবীজি (সা.) তখন তাকে বললেন, ‘আজকের পর তোমার বাবার আর কোনো কষ্ট থাকবে না।’ (সহিহ বুখারি)

কথাটি কত গভীর! একজন পিতা তার কন্যাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কিন্তু সেই সান্ত্বনার ভেতর লুকিয়ে আছে বিদায়ের সত্য। দুনিয়ার কষ্ট শেষ হবে। রবের কাছে ফিরে যাওয়ার সময় এসেছে। তারপর এলো সেই মুহূর্ত। মদিনার আকাশ যেন ভারী হয়ে গেল। ঘরটি নীরব হয়ে গেল। নবীজি (সা.) রবের ডাকে সাড়া দিলেন। দিনটি ছিল ১১ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল।

ফাতেমা (রা.) তখন বললেন, ‘হায় আমার বাবা! রবের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। হায় আমার বাবা! জান্নাতুল ফেরদাউস তার আবাস। হায় আমার বাবা! জিবরাইলকে তার ইন্তেকালের খবর শুনাই।’ (সহিহ বুখারি)

এই কয়েকটি বাক্য যেন এক কন্যার ভেঙে পড়া হৃদয়ের ভাষা। কতটা কষ্ট হলে মানুষ এমন কথা বলে!

এরপর এলো আরও কঠিন মুহূর্ত। নবীজি (সা.)-কে দাফন করা হলো। মাটির নিচে শায়িত হলেন মানবতার শ্রেষ্ঠ মানুষ। তখন ফাতেমা (রা.) আনাস (রা.)-কে বললেন, হে আনাস! আল্লাহর রাসুলকে মাটি চাপা দিয়ে আসা তোমরা কীভাবে বরদাশত করলে! (সহিহ বুখারি) বাক্যটি পড়লে হৃদয় ভারী হয়ে আসে।

নবীজি (সা.) ওফাতের আগে ফাতেমা (রা.)-কে গোপনে কিছু কথা বলেন। তা শুনে ফাতেমা (রা.) কাঁদেন। পরে আবার কিছু কথা বলেন। তখন তিনি হাসেন। আয়েশা (রা.) জানতে চাইলে ফাতেমা (রা.) জানান, প্রথমবার নবীজি (সা.) তাকে তার ওফাতের কথা জানিয়েছিলেন। তাই তিনি কেঁদেছিলেন। পরে তিনি জানিয়েছিলেন, তার পরিবারের মধ্যে আমিই প্রথম তার সঙ্গে মিলিত হব। এতে আমি হাসি। (সহিহ বুখারি)

নবীজি (সা.)-এর শোকে ফাতেমা (রা.) বেশ কিছু কাব্য রচনা করেন। কয়েকটি লাইন উল্লেখ করা হলো ‘আমার ওপর এমন বিপদ ঢেলে দেওয়া হয়েছে/ সেগুলো দিনের ওপর ঢেলে দিলে দিন রাত হয়ে যেত। আপনার পরে জীবনে আর কোনো কল্যাণ নেই/ আমি শুধু এজন্য কাঁদি, আমার জীবন যেন দীর্ঘ না হয়।’ (আল-ফুসুলুল মুহিম্মাহ ১৩২, বাইতুল আহযান ৪৮)

নবীজি (সা.)-এর ওফাতের প্রায় ছয় মাস পর ফাতেমা (রা.) ইন্তেকাল করেন।