‘হার্টব্রেকার’, ‘টু ডোরস ডাউন’, ‘লাভ ইজ লাইক আ বাটারফ্লাই’,‘রিয়েল লাভ’-এর মতো অসংখ্য সুপারহিট গানের স্রষ্টা কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ডলি পার্টন আর নেই। ২৫ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশভিলে মৃত্যুবরণ করেন এই গায়িকা, গীতিকার,সুরকার ও অভিনেত্রী। ক্যানসারের সঙ্গে অল্প সময়ের লড়াইয়ের পর স্বজনদের উপস্থিতিতে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। বিশ্ব সংগীতের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে যাওয়ায় একটি কালের অবসান হলো। ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে সংগীত, অভিনয় ও মানবিক কাজের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের জীবনে প্রভাব রেখেছেন ডলি পার্টন। তার মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি টেনেসির পিটম্যান সেন্টারের একটি দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম ডলির। ১২ ভাই–বোনের বড় পরিবারে ছোট্ট এক কক্ষের কাঠের ঘরে কেটেছে তার শৈশব। সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু গান ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় আশ্রয়। মা লোকগান গাইতেন। সেই গান শুনেই বড় হয়েছেন ডলি। মাত্র ছয় বছর বয়সে নিজের প্রিয় পুতুলকে নিয়ে প্রথম গান লেখেন। আট বছর বয়সে প্রথম হাতে ওঠে গিটার। ১১ বছর বয়সে স্থানীয় বেতারে গান গাওয়া শুরু করেন। আর ১৩ বছর বয়সেই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ কান্ট্রি সংগীতের মঞ্চে গান গাওয়ার সুযোগ পান।
পড়াশোনা শেষ করে ডলি ন্যাশভিলে চলে যান। শুরুতে অন্য শিল্পীদের জন্য গান লিখলেও খুব দ্রুত নিজের কণ্ঠের জাদুতে শ্রোতাদের মন জয় করেন। পরে একক শিল্পী হিসেবে যে সাফল্য তিনি অর্জন করেন, তা তাঁকে কান্ট্রি সংগীতের ইতিহাসে স্থায়ী আসন এনে দেয়। ডলির গাওয়া অসংখ্য গান বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। প্রেম, বিচ্ছেদ, পরিবার, দারিদ্র্য, সংগ্রাম ও আশা-মানুষের জীবনের সহজ অথচ গভীর অনুভূতিগুলোই ছিল তার গানের প্রধান বিষয়। তাঁর লেখা একটি গান পরে আরেক কিংবদন্তি শিল্পীর কণ্ঠে বিশ্বসংগীতের ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় গানে পরিণত হয়।
সংগীতের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও সমান সফল ছিলেন ডলি। গত শতকের আশির দশক থেকে একের পর এক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়। চলচ্চিত্রের জন্য লেখা গানের সুবাদে তিনি দুবার অস্কার পুরস্কারের মনোনয়ন পেয়েছিলেন।ডলির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার লেখনী। জীবদ্দশায় প্রায় তিন হাজার গান লিখেছেন বলে ধারণা করা হয়। নিজের অধিকাংশ জনপ্রিয় গান তিনি নিজেই লিখেছিলেন। ডলি শুধু শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন সফল উদ্যোক্তাও। নিজের নামে গড়ে তুলেছিলেন বিশাল বিনোদনকেন্দ্র, যা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়। টেলিভিশন অনুষ্ঠান, বই প্রকাশ, প্রযোজনাসহ নানা ব্যবসায়িক উদ্যোগে তিনি সাফল্যের স্বাক্ষর রাখেন।
ক্য্যারিয়ারে ডলি ১১টি গ্র্যামি পুরস্কার জেতেন। পান আজীবন সম্মাননা। তার গান বিক্রি হয়েছে ১০ কোটির বেশি কপি। সংগীত রচয়িতাদের মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি থেকে শুরু করে রক অ্যান্ড রোলের সর্বোচ্চ সম্মান—সবই এসেছে তার ঝুলিতে। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় সংগীতের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল নারী শিল্পীদের একজন হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়।