দুটি কিডনি নষ্ট, বাঁচার আকুতি লিবিয়া ফেরত শংকর সরকারের। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে ও ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে নিজের সর্বস্ব ভিটেমাটির জমিজমা বিক্রি করে সুদূর লিবিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন ৩৪ বছর বয়সী শংকর সরকার। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে স্বপ্নপূরণ তো দূরের কথা, সেখানে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে খালি হাতে দেশে ফিরতে হয়েছে তাকে। দুটি কিডনিই বিকল হয়ে এখন মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছেন তিনি। পরিবারকে আর্থিক অভাব থেকে মুক্ত করতে গিয়ে নিজেই এখন পরিবারের বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার নান্দুরকান্দির বাসিন্দা শংকর সরকার বিগত ৬ বছর পূর্বে লিবিয়ায় যান। সেখানে কঠোর পরিশ্রম করার মধ্যেই গত ৮ মাস আগে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে চিকিৎসকের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে তার দুটি কিডনিই সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। কোনো উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরে আসতে হয় তাকে।
বর্তমানে জীবন বাঁচিয়ে রাখতে প্রতি মাসে শংকরকে ৮টি করে ডায়ালাইসিস করাতে হচ্ছে, যাতে প্রতি মাসে খরচ হচ্ছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। এছাড়া নিয়মিত ডাক্তার দেখানো ও আনুষঙ্গিক ওষুধপত্র বাবদ কোনো কোনো মাসে এই খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ থেকে দেড় লাখ টাকায়।
পরিবারের চরম দুস্থ অবস্থায় এই বিপুল অঙ্কের চিকিৎসা ব্যয় বহন করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে শংকরই ছিলেন আয়ের মূল ভরসা। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার মা-ও দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজড হয়ে শয্যাশায়ী। দিন এনে দিন খাওয়া এই অসহায় পরিবারের পক্ষে এখন শংকরের ডায়ালাইসিস ও চিকিৎসার টাকা জোগাড় করা দূরে থাক, দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
অশ্রুসজল চোখে শংকরের পিতা হরি সরকার বলেন, ছেলেটা আমাগো অভাব দূর করবার লাইগা জমিজমা বেইচা বিদেশ গেল। এখন হেই ছেলেই দুইটা কিডনি নষ্ট কইরা ধুঁইকা ধুঁইকা মরতাছে। ঘরের জমিজমা বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নাই। মাসে এত এত টাকার ডায়ালাইসিস আর চিকিৎসার খরচ আমরা কনে পামু? পোলাডারে বাঁচাইতে সরকারের কাছে আর দয়ালু মাইনষের কাছে আকুল মিনতি করতাছি, আপনারা একটু সাহায্য করেন।”
ছোট ভাইয়ের জীবন বাঁচানোর আকুতি জানিয়ে বড় বোন রেখা রানী সরকার বলেন, “আমার ভাইটা পরিবারের হাল ধরতে গিয়া আজ নিজেই শেষ হয়ে গেল। প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকার ডায়ালাইসিস লাগতাছে, আবার ডাক্তার দেখাইতে গেলে খরচ দেড় লাখ টাকায় গিয়া ঠেকে। আমাদের মা-ও প্যারালাইজড। আমরা এখন একদম নিঃস্ব। চোখের সামনে ভাইডা চিকিৎসার অভাবে শেষ হয়া যাইবো? আপনারা একটু হাত বাড়ায় দিলে আমার ভাইটা বাঁচতে পারবো।”
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য রিয়াদ হোসেন জানান, “শংকর সরকারের পরিবারের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। লিবিয়া থেকে কিডনি নষ্ট করে ফিরে আসার পর পরিবারটি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। প্রতি মাসে ডায়ালাইসিস ও চিকিৎসার বিশাল খরচ যোগানোর মতো ক্ষমতা ওদের পরিবারের নেই। সমাজের বিত্তবান ও সরকারের সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে যদি দ্রুত আর্থিক সহায়তা করা হয়, তবেই হয়তো ছেলেটার চিকিৎসা চালানো সম্ভব হবে।”
প্রতিবেশী চাঁদপুর সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সুমন মজুমদার বলেন, “শংকর সরকারের ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। একজন প্রবাসী দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গিয়ে আজ নিজে নিঃস্ব হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি। এই মুহূর্তে তার চিকিৎসার জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা জরুরি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, আমি তার পরিবারকে জেলা সমাজসেবা কার্যালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছি। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারি নীতিমালার আওতায় তাকে যতটুকু সহায়তা করা সম্ভব, তার সবটুকু দেওয়া হবে।