ঢামেক চিকিৎসকদের অনন্য সাফল্য

গর্ভে যমজ শিশুর অস্ত্রোপচার, দূর হলো রক্তসঞ্চালন ত্রুটি

বাংলাদেশে এই প্রথম মাতৃগর্ভে থাকা যমজ সন্তানের মধ্যে একটি ত্রুটিপূর্ণ শিশুর রক্তসঞ্চালন বন্ধ করার অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের অবস্ অ্যান্ড গাইনি বিভাগের ফিটো-ম্যাটারনাল মেডিসিন ইউনিটে এই নতুন অস্ত্রোপচারটি পরিচালনা করা হয়। সফল এই অপারেশনের নেতৃত্ব দেন ইউনিটের ফিটো-ম্যাটারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. তাজমিরা সুলতানা এবং সহযোগিতা করেন সহকারী অধ্যাপক ডা. মাসউদা সুলতানা।  

হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ২২ আগস্ট শনিবার ইয়াসমিন বেগম (২৬) গর্ভে যমজ শিশুর জটিলতা নিয়ে ঢামেক হাসপাতালের ফিটো-ম্যাটারনাল ইউনিটে ভর্তি হন। চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেন যমজ শিশুর মধ্যে একটি শিশুর হার্ট তৈরি হয়নি। শিশুটি ত্রুটিপূর্ণ। অপর শিশুটি সম্পূর্ণ সুস্থ। সুস্থ শিশুটির রক্ত নিয়ে ত্রুটিপূর্ণ শিশুটি বেড়ে উঠছে। এতে করে পরবর্তীতে সুস্থ শিশুর বেড়ে উঠার ওপর এর প্রভাব পড়বে। চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নেন আরএফএ বা রেডিও ফ্রিকুয়েন্সি এবলিউশন চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ শিশুটিকে স্বাভাবিকভাবে বাঁচানো সম্ভব। পরবর্র্তীতে আজ সকালে ইয়াসমিন বেগমের এই সফল অপারেশনটি করা হয়।   

সহযোগী অধ্যাপক ডা. তাজমিরা সুলতানা বলেন, রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায়। তার পেটে যমজ সন্তান। এর মধ্যে একটি সম্পূর্ণ সুস্থ এবং অপরটির হার্ট তৈরি হয়নি। সুস্থ বাচ্চাটির হার্ট দিয়ে ত্রুটিপূর্ণ বাচ্চাটির রক্ত সঞ্চালন হচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে সাধারণত টিআরএপি (টুইন রিভার্সড আরটিরিয়াল পারফিউশন) সিকুয়েন্স বা অ্যাকার্ডিয়াক টুইন জটিলতা বলা হয়। এখানে যমজ বাচ্চার মধ্যে একটি বাচ্চার হার্ট বা হৃদপিণ্ড তৈরি হয় না। সে বেঁচে থাকা সুস্থ বাচ্চার হার্ট থেকে রক্তের প্রবাহ নিয়ে ত্রুটিপূর্ণ বাচ্চা কোনোমতে অবয়বহীনভাবে বড় হতে থাকে। এর ফলে সুস্থ বাচ্চাটির হার্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং সেটিও মারা যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। সহজ কথায়, এটি হলো মায়ের গর্ভে থাকা একাধিক যমজ সন্তানের মধ্যে কোনো একটি নির্দিষ্ট বাচ্চার (যেটি গুরুতর অসুস্থ বা যার হার্ট তৈরি হয়নি) বৃদ্ধি বা রক্তসঞ্চালন বৈজ্ঞানিক উপায়ে বন্ধ করে দেওয়া, যাতে অপর সুস্থ বাচ্চাটি নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে।

এই সমস্যার চিকিৎসা পদ্ধতি হচ্ছে, যেহেতু যমজ বাচ্চা দুটি সাধারণত একই গর্ভফুল বা প্লাসেন্টা (Monochorionic Twin) ভাগাভাগি করে, তাই ওষুধ দিয়ে হার্টবিহীন বাচ্চার গ্রোথ বন্ধ করা যায় না। তাতে সুস্থ বাচ্চাটিরও ক্ষতি হতে পারে। তাই চিকিৎসকরা আল্ট্রাসাউন্ড গাইডেড বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে অসুস্থ বাচ্চার আম্বিলিকাল কর্ড (নাড়ি) বা রক্তনালী বন্ধ করে দেন। এই প্রযুক্তিকে আরএফএ বা রেডিও ফ্রিকুয়েন্সি এবলিউশন বলা হয়।

ডা. তাজমিরা সুলতানা জানান, মাতৃগর্ভে যমজ সন্তান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে কিছু জটিলতা দেখা দেয়, যা অন্য সুস্থ শিশুটির জীবনের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। এই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গর্ভে থাকা ত্রুটিপূর্ণ শিশুটির রক্তসঞ্চালন বন্ধ করে সুস্থ শিশুটিকে নিরাপদে বাঁচিয়ে রাখার পথ সুগম করা হয়েছে। বাংলাদেশে এই ধরনের আধুনিক ও জটিল চিকিৎসাসেবা এটাই প্রথম। তিনি বলেন, মাতৃগর্ভে জটিল বিষয়গুলো ফিটো-ম্যাটারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞরাই চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। সরকারি হাসপাতালে এই মানের জটিল অপারেশন সফল হওয়া সাধারণ রোগীদের জন্য নতুন আশার আলো সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চিকিৎসার খরচের ব্যাপারে ডা. তাজমিরা সুলতানা বলেন, এই অপারেশনটি করতে একটি মেশিন ভাড়া আনতে হয়েছে। একটি ডিভাইস কিনতে হয়েছে। অন্যান্য জিনিসতো আছেই। সব মিলিয়ে প্রায় ৭০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। এর মধ্যে সামান্য টাকা নেওয়া হয়েছে রোগীর কাছ থেকে। কারণ, রোগীর এত টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই। বাকি টাকা চিকিৎসকদের কাছ থেকে ম্যানেজ করা হয়েছে। 

ইয়াসমিন বেগমের স্বামী শরীফ বলেন, ‘আমি প্রথমে প্রাইভেটে একজন গাইনি চিকিৎসক দেখাতাম। গর্ভে যমজ সন্তানের মধ্যে একটির সমস্যা হওয়ার কারণে ওই গাইনি ম্যাডাম আমাকে গাইনি হাই রিস্কের ডা. তাজমিরা ম্যাডামের কাছে পাঠান। ডা. তাজমিরা ম্যাডাম দেখে বলেন, একটি শিশুকে পুরোপুরি সুস্থ পেতে চাইলে ছোট একটি অপারেশন করতে হবে। আর যে শিশুটির সমস্য রয়েছে, তার হার্ট তৈরি হয়নি। ওই শিশুটি এমনিতেও বাঁচবে না। ম্যাডাম আমাকে সুন্দর করে বুঝানোর পর আমি রাজি হই। এই অপারেশন করতে প্রায় ৭০ হাজার টাকা লেগেছে। কিন্তু আমার কাছে এই অপারেশন করার মতো টাকা ছিল না। ম্যাডামকে আমি ২০ হাজার টাকা দিয়েছি। বাকি টাকা ম্যাডাম জোগাড় করেছেন।’ শরীফ একজন অটোরিকশা চালক। তিনি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে থাকেন।