নেপালে বরফ হ্রদের বিস্ফোরণে মহাদুর্যোগ

হিমালয়ের এভারেস্ট জয়ী পর্বতারোহী বাবর আলী। ২০২৪ সালে এভারেস্ট জয় করলেও ২০১৪ সাল থেকেই নিয়মিত পর্বাতারোহনে নেপালে যান তিনি। সর্বশেষ গত দুই মাস আগেও নেপাল থেকে এসেছেন। এপর্যন্ত প্রায় ১২ দফা নেপালে  যাওয়া এই বাবর আলী বলেন, ২০১৪ সালে প্রথম যখন নেপালে যান তখন হিমালয়ের উপরে বরফের হ্রদের সংখ্যা ও আয়তন কম দেখেছি। কিন্তু গত দুই মাস আগে যখন গেলাম তখন দেখলাম অনেক বেড়ে গেছে। 

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের উপরে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বরফ গলা বাড়ছে জানিয়ে বাবর আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, যদি কেউ জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র সহজে দেখতে চান তাহলে হিমালয়ে যান। 

তাহলে এখন প্রশ্ন হলো এই বরফ গলা পানি হঠাৎ করে কেন নিচে নেমে এলো? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে বাবর আলী বলেন,‘ হিমালয়ের বরফগুলো জমে পাহাড়ের মধ্যবর্তী উপত্যকায় জমা হয়, যা প্রাকৃতিক লেক তৈরি করে। বরফ বেশি গললে এসব লেকের আয়তন বাড়তে থাকে। হঠাৎ কোনো লেকে বরফের কোনো বড় খন্ড ভেঙ্গে পড়লে বরফ গলা পানির স্রোত নিচে নেমে আসে প্রবল বেগে। যা হিমবাহ সম্প্রপাত নামে পরিচিত। গত শুক্রবার নেপালে এই হিমানি সম্প্রপাতই হয়েছে এবং এর সাথে যুক্ত হয়েছে কাঁদা মাটির প্রবাহ।’

হিমালয় এলাকায় বরফগলা পানির লেকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে জানিয়ে নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্বত হিমমন্ডল ও জলসম্পদ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. ধীরাজ প্রধানঙ্গা গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন,‘ বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় এলাকায় হিমবাহ লেকের পরিমাণ বাড়ছে একথা সত্যি। তবে গতকালের আকস্মিক বন্যা হয়েছে বিশাল আকারের হিমবাহ রাসুয়া অঞ্চলের লেন্দে নদীতে ধসে পড়ার কারণে। বরফের বিশাল খন্ড নদীতে পড়ার কারণে নদীর পাড় ভেঙ্গে পাহাড়ি এলাকা বেয়ে পাথর ও মাটির স্তুপ নিয়ে নিচে লেন্দে নদী হয়ে  ত্রিশুলী নদীর মাধ্যমে নিচের অববাহিকায় মারাত্নক ক্ষয়-ক্ষতি করেছে।’

এদিকে মার্কিন ভূ-তাত্বিক জরিপ অধিদপ্তর ইউএসজিএস তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, নেপালের রাসুয়া এলাকায়  বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও মাটির স্তুপ ভেঙে নিচে লেন্দে নদীতে আছড়ে পড়ার শক্তি ৫ দশমিক ২ রিকটার স্কেলের ভূমিকম্পের সমান ছিল। আর এতেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এবিষয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স এন্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের সাথে। তিনি বলেন,‘বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক বরফ গলে যাচ্ছে। সেই বরফগুলো জমে সেখানে হ্রদ তৈরি করছে। এখন বরফের কোনো বড় খন্ড যদি হঠাৎ ভেঙ্গে পড়ে এবং যা হিমবাহ ধস নামে পরিচিত। এই ধসেই নেপালে মহা বিপর্যয় হয়েছে। 

একই মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ভূ-তাত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ও বর্তমানে পিএইচডি গবেষণায় আমেরিকায় অধ্যয়নরত আখতারুল আহসান। তিনি বলেন, বিশ্বের উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু এবং হিমালয়ের মতো উঁচু পার্বত্য এলাকার বরফগুলো ক্রমান্বয়ে গলছে উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার কারণে। উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক হিসেবে বরফগলা পানি হ্রদ ও নদী হয়ে ভাটির দিকে নেমে আসে। কিন্তু হঠাৎ কোনো বড় খন্ড ধসে পড়লে এমন হিমবাহ ধস বা হিমানি সম্প্রপাতের সৃষ্টি হয়ে এমন দুর্যোগ হতে পারে। যা গতকাল নেপালে হলো। 
হিমালয়ের ঝুঁকিতে ভাটির দেশগুলো ঝুঁকিতে পড়তে পারে জানিয়ে সাউথ এশিয়ান মিটিওরোলোজিক্যাল এসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক ড. মোহন কুমার দাশ বলেন,‘ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে হিমবাহ অঞ্চলের হিমবাহ হ্রদগুলোর মানচিত্রায়ন ও ঝুঁকি মূল্যায়ন নিয়মিত করা প্রয়োজন। এমন আকস্মিক হ্রদ বিস্ফোরণে বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।’

উল্লেখ্য, নেপালের এই আকস্মিক বন্যায় এপর্যন্ত প্রায় ৩৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে অনেক। পাহাড়ি ঢলের সাথে ভেসে এসেছে কাঁদা মাটি ও পাথরের বড় বড় খন্ড। আর এতে অববাহিকা অঞ্চলে বেশি ক্ষয়সাধন হয়েছে।