স্পিকারের হুঁশিয়ারি  

সংসদ কার্যকর প্রাণবন্ত হোক

সংসদীয় গণতন্ত্রে সার্বিকভাবে সরকার বা নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহির স্থান সংসদ। যেখানে তারা প্রধানত বিরোধী দলের কাছে, ক্ষেত্রভেদে ক্ষমতাসীন দল থেকে নির্বাচিত সদস্যদের কাছ থেকেও প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন, জবাব দেবেন এটাই প্রত্যাশিত। সংসদীয় কমিটি সরকারের কাজের চুলচেরা বিশ্লেষণের স্থান। কিন্তু বর্তমান সংসদে তৃতীয় অধিবেশনে এসেই বৈঠকে ‘অচলাবস্থা’ তৈরিকে কেন্দ্র করে সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পিকার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়টির প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম সাতটি সংসদের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ পার্লামেন্টারিয়ান। সরকারের এবং বিরোধী দল থেকেও সংসদীয় দায়িত্ব পালন করেছেন প্রবীণ এই রাজনীতিক। বর্তমান ‘সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে’ স্পিকার ‘চিন্তিত’, এ বিষয়টি তিনি জানিয়েছেন বৃহস্পতিবারের বৈঠকে। তিনি মনে করেন, ‘যেভাবে একে অন্যকে কথা বলার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার’ চেষ্টা করা হয়েছে, তা ‘সংসদের জন্য কোনো ভালো লক্ষণ নয়।’ আমরাও এতে কিছুটা উদ্বিগ্ন।

স্পিকার একইসঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, অনেক কষ্টের পর গণতন্ত্র অর্জিত হয়েছে। এই গণতন্ত্র যাতে বহাল থাকে সে জন্য ‘সংসদের প্রতিটি সদস্যের দায়িত্ব’ রয়েছে। আমরা মনে করি সংসদের অভিভাবক হিসেবে পক্ষ-নির্বিশেষে সদস্যদের জানিয়ে স্পিকার সঠিকভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন। সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ কার্যকর করার ক্ষেত্রে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, সংসদ নেতা বা প্রধানমন্ত্রী, সংসদ উপনেতা, বিরোধীদলীয় নেতা ও উপনেতা, সংসদের চিফ হুইপ ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এবং বিভিন্ন স্থায়ী কমিটির চেয়ারপারসনদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

স্পিকার জানিয়েছেন, তিনি ‘নিরপেক্ষভাবেই’ সংসদ পরিচালনার চেষ্টা করছেন। আমরা লক্ষ করেছি, প্রথমবার নির্বাচিত হয়ে আসা ডেপুটি স্পিকারও নিরপেক্ষভাবে অধিবেশন পরিচালনায় সচেষ্ট। আমরা মনে করি, সংশ্লিষ্ট সবার, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ পদ ও দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের সবার উচিত নিজ নিজ দায়িত্বের অবস্থান থেকে সংসদকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা।

বর্তমান সংসদের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য প্রথমবার নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিধিনিষেধ মেনেও সংসদ কার্যকর ও প্রাণবন্ত করার ক্ষেত্রে যে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা যায়, তা এখনো বৈঠকে সেভাবে ফুটে ওঠেনি। শুধু যেখানে সদস্যদের ভোট দরকার হয়, তার বাইরে সাধারণ আলোচনায় কোন ইস্যুগুলো কতটা ধরতে হবে, কোথায় সরকারি দল বিরোধী দলকে ছাড় দেবে, অথবা বিরোধী দল সরকারি দলকে সহযোগিতা করতে পারে সে দিকগুলোর চর্চা এখনো দেখা যায়নি। ফলে বিভিন্ন ইস্যুতে নিজ রাজনৈতিক অবস্থান থেকে ‘সাধারণ জনপ্রিয়তা’ পাওয়ার বিবেচনা থেকে ‘সমর্থনের জন্য সমর্থন’ এবং ‘বিরোধিতার জন্য বিরোধিতায়’ আটকে গেছে সংসদীয় কার্যক্রম। এতে যখন-তখন সংসদের বৈঠকে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। এই উত্তেজনা সংসদীয় কার্যক্রমে যাতে অচলবাস্থা তৈরির দিকে না যায় তা নিশ্চিত করতে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান কী ভূমিকা নেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

তৃতীয় অধিবেশন থেকে সংসদ নেতার ঠিক পরের আসন দেওয়া হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে। প্রথাগতভাবে এই আসন দেওয়া হয় সংসদ উপনেতাকে। সংসদ উপনেতার পদে এখনো কেউ না থাকলেও সালাহউদ্দিন সংসদীয় কার্যক্রমে ট্রেজারি বেঞ্চে সবচেয়ে সক্রিয় ব্যক্তি। তিনি ও বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এর আগেও নির্বাচিত হওয়ায় সংসদীয় অভিজ্ঞতা আছে। তাদের ভূমিকা সংসদ কার্যকর করার ক্ষেত্রে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

সংসদের বৈঠকে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সভাপতিকে বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে সহযোগিতা  দেওয়া সরকারি দলের চিফ হুইপ ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের দায়িত্বের অংশ। সংসদের ভেতরে-বাইরে বক্তৃতায় রসবোধ সঞ্চার করা আলোচনা প্রাণবন্ত করার ভালো কৌশল। এক্ষেত্রে যে বুদ্ধির ছটা ও শব্দের জ্ঞানগর্ভ প্রয়োগ দরকার হয়, তা সংসদ সদস্যরা রপ্ত করে নেবেন, এমন আশা নাগরিকদের। আর সংসদীয় পরিবেশ বজায় রাখাতে কারণে-অকারণে তৈরি হওয়া উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢালার মতো প্রতিপক্ষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। মানুষ চায় কার্যকর প্রাণবন্ত সংসদ।