নেপালে মৃত্যুর বিভীষিকা 

ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো ছবির মতো সাজানো নেপালের একাধিক জেলা। মনে হয়, এক নিমিষে পাল্টে গেছে দেশের ভূগোল। হঠাৎ করে কীভাবে নেমে এলো বিপর্যয়? নেপাল প্রশাসন বলছে, চীনে অতিভারী বৃষ্টির পাশাপাশি গত বুধবার সকালে ভূমিকম্প হয় তিব্বতে। যার ফলে হিমতাল জলাধার ফেটে বেরিয়ে আসে পানি। নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে এখন পর্যন্ত (শুক্রবার সন্ধ্যা) ৫৮৭ জনে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও প্রায় ১৫০০। এই সংখ্যা পরবর্তী সময়ে আরও বাড়তে পারে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, ‘নিখোঁজদের মধ্যে ১০৪ জন চীনা নাগরিক রয়েছেন।’ ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি লিখেছে, সীমান্তের চীনা অংশে একটি ভূমিধস প্রতিরক্ষা বাঁধ ধসে এই বিপদ তৈরি করেছে কিনা সেই প্রশ্ন উঠেছে।

একাধিকবার বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে দেশটি। ১৯৩৪-এর পর ২০১৫ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় পাহাড়ের রানী নেপাল। সেই ভয়াবহতার স্মৃতি ফিরল ১১ বছর পর। নেপাল বিপর্যস্ত হলো হড়পা বানে। ছবির মতো সাজানো শহরগুলো আজ যেন মৃত্যুপুরী। যে দিকে দুচোখ যায় শুধু ধ্বংসস্তূপ। চারদিকে স্বজন হারানোর কান্না। পাহাড়ি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ানসহ নেপালের একাধিক জেলা। পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে জনজীবন। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৈঠক ডেকেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপাল-তিব্বত সীমান্তে লেন্দে নদীতে তুষার ও শিলাধসের ফলে সৃষ্ট কৃত্রিম বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, এই ধস ও হিমবাহের অংশবিশেষ ভেঙে পড়া বিপর্যয়ের মূল কারণ। পানির তোড়ে গ্রাম, রাস্তাঘাট, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ভেসে গেছে। বিদেশি নাগরিকসহ শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নেপাল সরকার সেনাবাহিনী ও পুলিশ নামিয়ে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। নদীর কাছের মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রয়টার্স জানায়, যদিও নেপালের পর্যটন কর্মকর্তা ও পুলিশ জানিয়েছে, নেপাল ও তিব্বতে এ পর্যন্ত প্রায় ১৪০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ বিদেশি পর্যটক। বন্যাকবলিত এলাকাটি হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র দুটি উচ্চভূমির হ্রদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি হলো, তিব্বতের কৈলাস পর্বতের কাছে মানস সরোবর, অন্যটি নেপালের রাসুয়া জেলার গোসাইকুণ্ড হ্রদ। বৃহস্পতিবার সকালে নেপাল পুলিশের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, নিহতদের মধ্যে ৭২ জনের মরদেহ ভাটির দিকে চিতওয়ান জেলা এবং আরও ৩৪ জনের মরদেহ নওয়ালপরাসি ইস্ট এলাকায় পাওয়া গেছে। বন্যাকবলিত এলাকায় প্রায় আট টন ত্রাণ পাঠানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ও বাংলাদেশ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দুর্যোগের কঠিন সময়ে নেপালের সরকার ও জনগণের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের কাছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত শোকবার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বলছে, হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত থেকে দুর্যোগের সূত্রপাত। দেশটির ভূগর্ভস্থ জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্টি হওয়া প্রবল কম্পন নেপাল ও তিব্বতের নিচু এলাকাগুলোতে মর্মান্তিক ধ্বংসলীলা চালিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ জানিয়েছেন,  নিখোঁজদের মধ্যে ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিক রয়েছেন। নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই এলাকায় ‘অল্পসংখ্যক’ নিউজিল্যান্ডের নাগরিক রয়েছেন বলে তারা জানেন এবং পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। এ ছাড়া নিখোঁজদের মধ্যে ৫৩ জন ইউক্রেনীয় নাগরিক রয়েছেন।

নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক ছিল কিনা, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কর্তৃপক্ষ আরও কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ পরীক্ষা করছেন। এর মধ্যে রয়েছে কোনো হিমবাহ-হ্রদ আকস্মিকভাবে পানি ছেড়ে দিয়েছিল কিনা, নদীর গতিপথে ভূমিধসের কারণে সাময়িক বাধা  তৈরি হয়েছিল কিনা এবং সাম্প্রতিক সময়ে ওই এলাকায় কতটা বৃষ্টিপাত হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউক্রেন, জাপান ও ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে দেশটির কর্তৃপক্ষের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে রাশিয়ার বেশ কয়েকজন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান জানিয়েছেন, নেপালের অংশে প্রায় ১০০ চীনা নাগরিকসহ মোট ১৫০০ নিখোঁজ রয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। কাঠমান্ডুতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস নিশ্চিত করেছে, নেপালে অবস্থানরত বাংলাদেশি পর্যটকরা সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছেন।

প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পকে আকস্মিক বন্যার কারণ মনে করা হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বলছে হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত থেকে মূলত দুর্যোগের সূত্রপাত। জানা যাচ্ছে, তিব্বত এবং নেপালের দিকে উদ্ধারকাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। জানা যাচ্ছে, রাসুয়ায় হড়পা বানের পানি ঢুকতে শুরু করেছে।  দুর্যোগস্থলের উজানে একটি বাঁধ হ্রদের পানি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আবার বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাতে পারে বলে আগেই সতর্ক করেছে চীন। তাহলে কি নেপালে মৃত্যুর পাহাড় জমবে! মনে হয়, আবার ভয়াবহ ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে নেপাল।

লেখক : সাংবাদিক, তালিকাভুক্ত সংবাদ পাঠক বাংলাদেশ টেলিভিশন।

tapas.raihan@gmail.com