বিরোধিতার মুখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ প্রাণভরে উপভোগ করলেন বর্ণাঢ্য এই প্রতিযোগিতা। এটাকে বাঙালির আবহমানকালের সর্বজনীন সংস্কৃতির শক্তি হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার লাউতা ইউনিয়নের সোনাই নদীতে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে আয়োজিত হচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। তবে এবারই প্রথম এই আনন্দ আয়োজন পড়ে বাধার মুখে। ‘তৌহিদী জনতা’ ব্যানারে একটি পক্ষ নৌকাবাইচকে জুয়াখেলা হিসেবে আখ্যায়িত করে বিরোধিতায় নামে। তারা ফেসবুকে নৌকাবাইচবিরোধী প্রচার শুরু করে। স্থানীয় বারইগ্রাম বাজারে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে একটি সভাও করে। তাদের এই তৎপরতার খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। নৌকাবাইচের পক্ষে সৃষ্টি হয় জোরালো জনমত। এ অবস্থায় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং স্থানীয়দের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের কাছে হার মানে কথিত ‘তৌহিদী জনতা’। বাধা ডিঙিয়ে অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে গত শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী এ নৌকাবাইচ। প্রতি বছরই এই নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিযোগিতায় তিনটি নৌকা অংশ নেয়। এগুলো হলো গোলাপগঞ্জের ‘পাগলা নাও’, হাকালুকির ‘বাঘ নাও’ ও বড়লেখার ‘স্বাধীন বাংলা নাও’। একভাবে কোনো দলকে এবার বিজয়ী ঘোষণা করা হয়নি।
নৌকাবাইচ আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম জানান, কতিপয় ব্যক্তির আপত্তি উপেক্ষা করে অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে এবার নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। নৌকাবাইচ দেখতে নদীর দুই পাড়ে মানুষের ঢল নেমেছিল। গানের তালে যখন প্রতিযোগী নৌকাগুলো নদীর বুক চিরে এগিয়ে চলছিল তখন সেই সুর উপস্থিত দর্শকেরও হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ঐতিহ্য ধরে রেখে আগামীতেও নৌকাবাইচ হবে বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
নৌকাবাইচ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসনের সংসদ সদস্য, সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী। তিনি প্রতি বছরই ঐক্যবদ্ধভাবে নৌকাবাইচ আয়োজন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘নৌকাবাইচ গ্রামবাংলার ঐতিহ্য। এটা ধর্মবিরোধী কোনো কাজ নয়। তাই কারও কথায় ঐতিহ্য বিসর্জন দেওয়া যাবে না। সবাই মিলে ঐতিহ্য ধরে রাখতে হবে। আনন্দের সঙ্গে তা উপভোগ করতে হবে।’
জানা যায়, স্থানীয় একটি পক্ষ নৌকাবাইচকে জুয়াখেলা হিসেবে আখ্যায়িত করে তা বন্ধের দাবি জানানোর বিষয়টি জাতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হলে সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। প্রতিবাদের মুখে বিরোধী পক্ষ নিজেদের ‘তৌহিদী জনতা’ নয় বলে প্রচার করতে থাকে এবং তাদের অবস্থানের পক্ষে নানা সামাজিক কারণ উল্লেখ করতে থাকে। তারা নদীভাঙন ও কৃষকের ফসলের ক্ষতির বিষয়টি সামনে আনে। এ বিষয়ে স্থানীয় দুই ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু বিরোধিতাকারীদের একটি পক্ষ সমঝোতা বৈঠকেও আসেনি। এদিকে, সমঝোতা বৈঠকে গঠিত কমিটি দুই ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে আয়োজনস্থল পরিদর্শন করে। এই আয়োজনে কোনো ক্ষতি হবে না বলেও তারা মত দেয়। এর পরই সবার অংশগ্রহণে নৌকাবাইচ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় বিরোধিতাকারীদের দাবির অসারতাই প্রমাণিত হয়েছে বলে আয়োজকরা মনে করছেন।
আয়োজকদের অন্যতম তাজ উদ্দিন বলেন, ‘১৫ বছর ধরে সোনাই নদীতে নৌকাবাইচ আয়োজিত হচ্ছে। কখনো কেউ বাধা দেয়নি। এবারই প্রথম কতিপয় ব্যক্তি আপত্তি তুলেছিল। তবে সবার ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের কারণে তাদের আপত্তি পাত্তা পায়নি। আগামীতেও বর্ণিল আয়োজনে নৌকাবাইচ হবে। এই সফলতার জন্য স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে ধন্যবাদ-কৃতজ্ঞতা জানাই।’