শেষবারের মতো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে, নেই ক্লাসে যাওয়ার তাড়া অথবা শিক্ষকদের প্রতি কোন তদারকি। হাজিরা খাতায় আর স্বাক্ষর করতে হচ্ছে না। প্রধান শিক্ষক বসার ঘরে চেয়ার ফাঁকা পড়ে আছে, মাঠে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে নিথর দেহ তার। বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীন, শেষবারের মতো তাকে দেখছেন সহকর্মী আর শিক্ষার্থীরা। প্রিয় শিক্ষককে এভাবে বিদায় দিতে হবে তা যেন ভাবেনি কখনও তারা। যে বিদ্যালয়ে ৩৮ বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা করতেন সেখানেই হলো জানাযা নামাজ।
নিহত শিক্ষক রনজিলার স্বামী আব্দুল মতিন জানান, চোখের চিকিৎসা করাতে শুক্রবার রাত ১২টার দিকে তাকে নিয়ে বাসে বগুড়া থেকে ঢাকায় যান। শনিবার (২৯ আগস্ট) ভোরে রিকশায় ফার্মগেটের ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে যাওয়ার পথে সংসদ ভবন এলাকায় মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি রনজিলার হাতে থাকা ব্যাগ ধরে টান দেন। এসময় টানাহেচড়ার একপর্যায়ে রিকশা থেকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। তাকে উদ্ধার করে মোহাম্মদপুরের শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান তার স্বামী। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকায় স্বামী আব্দুল মতিন ও একমাত্র মেয়ে রাইসাকে নিয়ে থাকতেন। চিকিৎসা শেষে ফিরে আসার কথা ছিল, তবে ফিরেছে তার নিথর দেহ। তার এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না প্রতিবেশি ও স্বজনরা। একমাত্র কন্যাসহ কাঁদছেন স্বজন, প্রতিবেশি আর শিক্ষার্থীরা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, শনিবার দিবাগত রাতে তার মরদেহ বগুড়ায় আসে, রবিবার বাদ যোহর বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে প্রথম জানাজা ও বাদ আসর তরফসরতাজ গ্রামে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
রবিবার (৩০ আগস্ট) বেলা ১১টার পর বিদ্যালয়ে দেখা যায় একেবারেই নিরবতা। প্রধান শিক্ষকের চেয়ার ফাঁকা। শিক্ষক শিক্ষার্থীর মাঝে শোকের ছায়া। সহকারী শিক্ষক মেহেনাজ আফরীন ও মাছুমা খাতুন জানান, তারা আজ থেকে অভিভাবক হারা হলেন। সবার আগেই আসতেন বিদ্যালয়ে, নিজে ক্লাস নিতেন নিয়মিত। তার এমন চলে যাওয়া তারা মেনে নিতে পারছেনা।
শিক্ষকের স্বামী আব্দুল মতিন, এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। যেন ঘটনায় জড়িতদের দ্রæত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করেন।
তাদের একমাত্র সন্তান নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী রাইসা আক্তার বলেন, আমার মতো আর যেন কেউ এভাবে মা হারা না হয়। আমি মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় বিচার চাই।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, রনজিলা পারভীন ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে সহকারী শিক্ষক হিসেবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরিতে যোগ দেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে তিনি বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হন। ৩৮ বছর ধরে তিনি এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন বলে জানা গেছে উপজেলা শিক্ষা অফিস সুত্রে।
গাবতলী উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক হিসেবে রনজিলা পারভীন ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও নিবেদিতপ্রাণ। তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।
তিনি আরও বলেন, ৩৮ বছর যে বিদ্যালয়ে শিশুদের পড়িয়েছেন, ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছেন, সেই বিদ্যালয়েই শেষবার ফিরলেন রনজিলা পারভীন। তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন শিক্ষার্থীরা, কিন্তু তিনি ফিরলেন না ক্লাস নিতে। ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে। সবাইকে শেষ বিদায় জানাতে।