বাগাতিপাড়ায় লেবুর রাজ্য, সবুজ বাগানেই বদলাচ্ছে কৃষকের ভাগ্য

নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার যোগীপাড়া ও স্যান্যালপাড়া গ্রামের একাধিক কৃষক লেবু চাষে সাফল্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। এলাকাটি বর্তমানে লেবুর রাজ্য হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। তুলনামূলক কম খরচে সারা বছর ফলন, বাজারে ভালো দাম এবং বাগান থেকেই পাইকারদের সরাসরি লেবু কিনে নেওয়ার সুযোগ সব মিলিয়ে একসময়ের প্রচলিত ফসলের জমিই এখন হয়ে উঠেছে স্বাবলম্বিতার সবুজ ঠিকানা।

স্থানীয় লেবু চাষিরা জানান, অন্যান্য ফসলের তুলনায় লেবুতে পরিশ্রম ও উৎপাদন খরচ কম। রোগ বালাই ও পোকামাকড়ের উপদ্রবও খুবই কম। এছাড়া লেবুতে লাভ না হলেও লোকসানের কোনো ভয় থাকে না। তবে রমজানের মধ্যে লেবুর চাহিদা বেশি থাকায় দামও বেশি হয়। সেসময় অনেকটা পুষিয়ে নেওয়া হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাগাতিপাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কমবেশি লেবুর চাষ হলেও সদর ইউনিয়নের যোগীপাড়া ও ফাগুয়াড়দিয়াড় ইউনিয়নের স্যান্যালপাড়া গ্রাম ২টি এখন লেবু চাষের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। উপজেলার সদর ইউনিয়নের যোগীপাড়া গ্রামটির প্রায় ৫০-৬০টি পরিবার নিজস্ব জমিতে লেবুর বাগান গড়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

আবার ফাগুয়াড়দিয়াড় ইউনিয়নের স্যান্যালপাড়া গ্রামে ৬০-৭০ টি পরিবার একই ভাবে লেবু চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। আবার অনেকেই বছরের চুক্তিতে অন্যের জমি লিজ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে লেবুর চাষ করে সংসারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন।

স্থানীয় লেবু চাষিরা জানান, এলাকায় প্রায় ২০০ বিঘার মত জমিতে লেবুর আবাদ হচ্ছে। শুধু লেবু বিক্রিই নয়, নতুন বাগান স্থাপনে আগ্রহী কৃষকদের কাছে লেবুর কাটিং চারা (কলম চারা গাছ) বিক্রিও অনেকের জন্য লাভজনক আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। ফলে লেবু ও লেবুর কাটিং কলম দুইয়ের ব্যবসাই গ্রামের অনেক পরিবারের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে।

প্রতিদিন ভোর থেকে বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা বাগানে এসে সরাসরি লেবু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে কৃষকদের বাজারে নিয়ে বিক্রির বাড়তি ঝামেলা ও পরিবহন খরচ দুই কমে যাচ্ছে। বর্তমানে উপজেলার যোগীপাড়া ও স্যান্যালপাড়া এলাকায় লেবুর বাগান শুধু একটি ফসলের ক্ষেত নয় বরং গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের প্রবেশের মুখ থেকেই রাস্তার দু’পাশে ছোট-বড় অসংখ্য লেবুর বাগান চোখে পড়ে। একটু ভেতরে মাঠের দিকে এগোতেই বিঘার পর বিঘা জুড়ে বিস্তীর্ণ লেবুর বাগান যেন সবুজের এক অনন্য সমারোহ সৃষ্টি করেছে। কোথাও চাষিরা বাগান পরিষ্কার করছেন, কোথাও গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত।

অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা গাছ থেকে লেবু পেড়ে বাছাই ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে বস্তায় ভরে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দু’চোখ যেদিকে যায়, সেদিকেই শুধু লেবুর বাগান। পুরো এলাকাটি যেন এক বিশাল লেবুর রাজ্য বলেই মনে হয়।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানায়, উপজেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ ১০ হাজার ৯৩০ হেক্টর। তার মধ্যে মোট ২৫ হেক্টর জমিতে লেবুর বাগান রয়েছে। এর মধ্যে শুধু যোগীপাড়া গ্রামে ৫ হেক্টর ও স্যান্যালপাড়া গ্রামে ১০ হেক্টর লেবুর চাষ হয় হেক্টর। তাছাড়ও পুরো উপজেলায় কম বেশি লেবুর চাষ হয়ে থাকে। উপজেলায় বছরে লেবুর উৎপাদন লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৫০ মেট্রিক টন। চায়না-৩ জাতীয় লেবু বছরে অন্তত ৩-৪ বার ফলন দেয়। সেই হিসেবে লেবুর গড় ফলন ধরা হয়েছে ৪২ মেট্রিকটন।

উপজেলার সদর ইউনিয়নের পূর্ব যোগীপাড়া গ্রামের লেবু চাষি আব্দুল কুদ্দুস (৪৮) বলেন, তাদের এলাকায় তিনিই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চায়না-৩ জাতের লেবুর চাষ শুরু করেন। প্রথমে টাঙ্গাইল থেকে চারা এনে অন্যের ১ বিঘা জমি লিজ নিয়ে তিনি এ চাষের যাত্রা শুরু করেছিলেন। পরে তার সাফল্য দেখে গ্রামের অন্যরাও লেবু চাষে আগ্রহী হন। বর্তমানে যোগীপাড়া গ্রামের প্রায় ৫০-৬০টি পরিবার লেবু চাষের সঙ্গে যুক্ত এবং প্রায় ১০০ বিঘার মত জমিতে লেবুর বাগান গড়ে উঠেছে।

তিনি আরও জানান, শুরুতে নিজের কোনো জমি ছিল না। অন্যের জমি লিজ নিয়ে চাষ শুরু করলেও এখন তিনি প্রায় ২০-২২ বিঘা জমিতে লেবুর আবাদ করছেন। লেবু চাষের আয়েই তিনি গাড়ি কিনেছেন, পাকা ছাদ বাড়ি নির্মাণ করেছেন এবং সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন। তার ভাষায়, লেবু চাষই তার জীবন বদলে দিয়েছে।

এখন তিনি সমাজের একজন সুখী ও স্বচ্ছল মানুষ এবং তিনি জানান, তার এলাকা লেবুর রাজ্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে উপজেলায়।

উপজেলার ফাগুয়াড়দিয়াড় ইউনিয়নের স্যান্যালপাড়া গ্রামের লেবু চাষি আলম আলী (৫০) বলেন, তিনি দেড় বিঘা জমিতে লেবুর চাষ করেছেন। তিনি ২০১৫ সালে থেকে লেবুর চাষ করে আসছেন। লেবু চাষ লাভজনক হওয়ায় তার এলাকায় অনেক কৃষক এখন লেবু চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। লেবুর পশাপাশি কাটিং চারা করেও লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা।

উপজেলার যোগীপাড়া গ্রামের তরুন উদ্যোক্তা তোফিকুর রহমান তুহিন (৩২) বলেন, তার ২ বিঘা জমিতে লেবুর পরিপূর্ণ বাগান রয়েছে। এ বাগান থেকে বছরে প্রায় ৪ লাখ টাকার লেবু বিক্রি করেন। বাগানের পরিচর্যা, সার ও কীটনাশক বাবদ বছরে বিঘা প্রতি প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়।

লাভজনক হওয়ায় গত ২ বছর আগে তিনি আরও ৪ বিঘা জমিতে নতুন করে লেবুর বাগান করেছেন। তিনি আরও জানান, বাহির থেকে পাইকারিরা এসে জমি থেকেই লেবু নিয়ে যান। তাছাড়াও আশে পাশে নাটোর জেলা সদর, পাশ্ববর্তী উপজেলা আব্দুলপুর ও খুলনা বিভাগে তিনি লেবু বিক্রি করে থাকেন। সারা বছরই লেবুর মোটামুটি ভালো দাম থাকে। বিশেষ করে রোজার ঈদের আগে একটি লেবু ১০-১২ টাকা পিচ হিসেবে পাইকারি বিক্রি হয়ে থাকে।

যোগীপাড়া পূর্বপাড়ার জিয়াউর রহমান বাদশা (৪৬) বলেন, তাদের এলাকার মাঠে শতাধিক বিঘা জমিতে লেবুর চাষ হচ্ছে। তিনি নিজেও ৫ বিঘা জমিতে প্রায় ৫ বছর আগে থেকে লেবুর বাগান গড়ে তুলেছেন। প্রতি বিঘা জমি থেকে বছরে ২ লাখ টাকার বেশি লেবু বিক্রি করেন।

তিনি বলেন, লেবু চাষ লাভজনক হওয়ায় এখন অনেকেই এ চাষে আগ্রহী হয়েছেন। একসময় যে গ্রামটি সাধারণ গ্রাম ছিল, এখন সেই গ্রাম লেবুর রাজ্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

উপজেলার লেবুর ব্যাপারী ও ব্যবসায়ী রিংকু আলী (৪২) বলেন, তারা সরাসরি বাগান থেকে লেবু কিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইকারি বিক্রি করেন। বাগান মালিকদের এ ক্ষেত্রে আলাদা কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না। তারা নিজেরাই বাগান থেকে লেবু সংগ্রহ করেন তারপর নিজেরাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে বস্তাবন্দি করে বিক্রির জন্য নিয়ে যান। পরে এসব লেবু ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তারা সরবরাহ করেন।

স্থানীয় আরেক লেবুর ব্যাপারী ও ব্যবসায়ী মিন্টু (৪০) বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে লেবুর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বাগান থেকে তারাই শ্রমিক দিয়ে লেবু তুলে বস্তাবন্দি করেন। একটি বস্তায় প্রায় ১০০-১০৭ কেজি লেবু থাকে। বর্তমানে প্রতি বস্তা লেবু ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

তিনি বলেন, এসব লেবু ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, কুমিল্লা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাইকারি বাজারে সরবরাহ করা হয়। আর ওই সকল স্থান হতে খুরচা বিক্রেতার মাধ্যমে সারা দেশে লেবু ছড়িয়ে পড়ে।

উপজেলার মালঞ্চি বাজারের ক্ষুদ্র সবজি ব্যবসায়ী শাহাজান আলী (৫৭) বলেন, আমাদের এলাকার সবচেয়ে বড় সবজির হাট বসে দয়ারামপুর, তমালতলা, লোকমানপুর ও মালঞ্চি বাজারে। এসব হাটে বিভিন্ন ধরনের সবজির পাশাপাশি লেবুর বেশ চাহিদা রয়েছে। এলাকার লেবুর চাহিদা স্থানীয় লেবু চাষিরাই পূরণ করেন। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পাইকারীরাও এখান থেকে লেবু কিনে নিয়ে যান। 

উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা বজলুর রহমান জানান, উপজেলায় চাষিদের লেবু চাষের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে দিন দিন লেবুর বাগান বাড়ছে। উপজেলা কৃষি দপ্তর হতে নিয়মিত লেবু চাষিদের সঙ্গে রোগবালাই দমন ও সার প্রয়োগ বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয় ও পরামর্শ দেওয়া হয়। লেবুর গাছ দীর্ঘদিন রক্ষায় রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতেও পরামর্শ দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ডা. ভবসিন্ধু রায় বলেন, বাগাতিপাড়ার মাটি লেবু জাতীয় ফসলের জন্য খুব উপযোগী। চায়না-৩ জাতের লেবুটি সারা বছরই ফল দেয় পাশাপাশি কাগজি লেবু, বিনা-১ সিডলেছ জাতীয় লেবুও সম্প্রসারিত হচ্ছে। আমরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বাগাতিপাড়া থেকে কৃষকদের পাশে থেকে কারিগরি সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছি। লেবরু উপাদান শরীরের জন্য খুবই উপকারী। লেবু চাষে পুঁজি কম লাগে, উৎপাদনে খরচ কম, পোকামাকড় রোগবালাই কম তাই
কৃষকরা অল্প পুঁজিতে লাভবান হচ্ছে। বাগাতিপাড়ার চাহিদা পুরণের পাশাপাশি লেবুগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে কৃষকরা লাভবান হচ্ছে।

তিনি বলেন, কৃষকদের কৃষি বিষয়ে যে কোনো পরামর্শের জন্য তাদের সংশ্লিষ্ট উপ সহকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে পরামর্শ দেওয়া হয়। করোনা কালীন সময় লেবুর ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়। মানুষের ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রয়োজন হয় সেই কারণে আমরা পরিকল্পিত ভাবেই উপজেলার স্যান্যালপাড়া ও যোগীপাড়া গ্রামটি বেছে নেই এবং কৃষি অধিদপ্তরের প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু বাগান সৃষ্টি করি এবং সেই বাগান দেখে, কৃষকদের লাভ দেখে গ্রামটিতে আরও কৃষকরা এ লেবু চাষ শুরু করেন এবং তারা লাভবান হচ্ছেন।