দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভরা বর্ষার বন্যায় জনপদ তলিয়ে গেছে। কোথাও মানুষ পানিবন্দি, কোথাও পানির নিচে তলিয়ে গেছে ফসলের মাঠ। অথচ এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলায়। বর্ষার মাঝামাঝি সময়েও প্রয়োজনীয় পানির অভাবে শুকিয়ে আছে অনেক কৃষিজমি। যুগ যুগ ধরে বর্ষার জমে থাকা পানির ওপর নির্ভর করেই এ উপজেলার কৃষকরা রোপা আমন ধানের চারা রোপণ থেকে শুরু করে ধান পাকা পর্যন্ত আবাদ কাজ পরিচালনা করে আসছেন। কিন্তু এবার উপজেলায় পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় সেই চিরচেনা চিত্র বদলে গেছে। মাঠে পানি না থাকায় রোপা আমন মৌসুমের প্রস্তুতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন কৃষকরা।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে কৃষকদের। তবে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হলে আমন আবাদে প্রভাব পড়তে পারে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, বর্ষায় এ অঞ্চলের জমিগুলোতে পানি জমে থাকে আর সেই পানির উপর নির্ভর করেই কৃষকরা রোপা আমন মৌসুমে জমি তৈরি থেকে শুরু করে চারার বেড তৈরি, চারা রোপণ এবং ধান পাকার আগ পর্যন্ত বর্ষার পানি দিয়েই সেচের প্রয়োজন মেটান। কিন্তু চলতি বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পানি জমেনি কোনো জমিতে এমনকি নিচু জমিগুলোও এবার পানি শূন্য যেখানে বর্ষা মৌসুমের এ সময় হাটু সমান পানি থাকার কথা সেখানে এক চুলও পরিমাণও পানি নেই। এমনি কি বিলের নিচু এলাকাগুলোতেও পানি শূন্য। ফলে স্বাভাবিক নিয়মে আমন আবাদের প্রস্তুতি ব্যাহত হচ্ছে।
কৃষকদের দাবি, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় অনেক খাল-বিল ও জলাশয়ে প্রয়োজনীয় পানি জমেনি। ফলে বর্ষার পানির ওপর নির্ভরশীল আমন চাষ এবার শুরু থেকেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অনেক কৃষক সেচের পানি ব্যবহার করে রোপা আমন ধানের চারা তৈরি করলেও বৃষ্টির অভাবে জমিতে পানি না থাকায় নির্ধারিত সময়ে চারা রোপণ করতে পারছেন না। এতে অনেক চারাই রোপণের উপযুক্ত বয়স অতিক্রম করছে। আবার অনেকে সেচ দিয়ে চারা রোপন করলেও জমিতে একটুও পানি নেই। একদিকে সেচের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে অতিরিক্ত খরচের আশঙ্কায় অনেক কৃষক এখনো বৃষ্টির অপেক্ষায় জমি ফেলে রেখেছেন।
কৃষকদের ভাষ্য, দ্রুত বৃষ্টি না হলে সময়মতো চারা রোপণ ব্যাহত হবে। আর রোপণের পরও পর্যাপ্ত পানি না থাকলে জমিতে আগাছার প্রকোপ বাড়বে, যা ফলনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই চলমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এ মৌসুমে রোপা আমন ধানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বর্ষা মৌসুমে বাগাতিপাড়া উপজেলায় ৬ হাজার ৩৭৩ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৩ হাজার ১৯ মেট্রিক টন। গত বছরও উপজেলার ৬ হাজার ৩৭৩ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছিল এবং মোট উৎপাদন হয়েছিল ২৩ হাজার ১৯ মেট্রিক টন।
সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন কৃষি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গত বছর কিংবা তার আগের বছরগুলোতে এ সময় যেসব নিচু জমিতে হাঁটুসমান পানি জমে থাকত, সেসব জমিতে এখনও শুকনো মাটির ঢেলা পড়ে রয়েছে। যে মাঠগুলো বর্ষা মৌসুমে সারি সারি সবুজ রোপা আমন ধানের চারায় ভরে থাকার কথা, সেসব জমির অনেকগুলোতেই এখনো পাট দাঁড়িয়ে আছে।
পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় জমিতে প্রয়োজনীয় পানি না থাকায় কৃষকরা পাট কাটতে পারছেন না। তাদের আশা ছিল পাট কাটার পরপরই ওই জমিতে রোপা আমন ধানের চারা রোপণ করবেন। কিন্তু বৃষ্টির অভাব ও পানির সংকটের কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে, যেসব কৃষক সেচের মাধ্যমে রোপা আমনের চারা রোপণ করেছেন, তারাও পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়। পর্যাপ্ত পানির অভাবে অনেক জমিতে ফাটল দেখা দিয়েছে, কোথাও কোথাও মাটি শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। কৃষকদের ভাষ্য,রোপা আমন
ধানের এ পর্যায়ে জমিতে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে গাছের গোড়া থেকে নতুন কুশি (টিলার) গজায় না। ফলে ধানের গোছা প্রয়োজনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায় না, যা সরাসরি ফলনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সময়মতো পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হলে চলতি মৌসুমে রোপা আমন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
উপজেলার পৌরসভা এলাকার সোনাপাতিল মহল্লার কৃষক সোহেল রানা (৪৭) বলেন, আমাদের এলাকায় রোপা আমন চাষের প্রাণই হলো বর্ষার পানি। এই পানি থাকলে আলাদা করে বেশি সেচ দিতে হয় না। কিন্তু এবার মাঠে পানি নেই। এখন পর্যন্ত বৃষ্টি না হওয়ার কারণে জমিতে বীজ থেকে চারাই দিতে পারেননি।
উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের ছোট চিথলিয়া এলাকার কৃষক মো. মকুল হোসেন (৫০) বলেন, ভরা বর্ষায় মাঠে পানি নেই। এমন অবস্থা আগে খুব একটা দেখিনি। সেচ দিয়ে আবাদ করতে গেলে খরচ অনেক বেড়ে যাবে। সব কৃষকের সেই সামর্থ্য নেই। সেচ দিয়ে রোপন করলেও পরে পানির অভাবে জমিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে আগাছা জন্মে যা অনেক ব্যায় সাপেক্ষ। পানি না
পেলে অনেক জমি হয়তো অনাবাদি থেকে যাবে। একদিকে সময় চলে যাচ্ছে এখনো বৃষ্টির দেখা নেই। আবার পানির অভাবে জমির পাট এখনো সম্পূর্ণ কাটাই হয়নি অধিকাংশ কৃষকের। তাই খুবই দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ডা. ভবসিন্ধু রায় বলেন, এ বছর প্রয়োজনের তুলনায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকার নিচু জমিতেও পর্যাপ্ত পানি জমেনি। এতে রোপা আমন ধানের চারা রোপণে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। কৃষকদের জমির অবস্থা বিবেচনা করে সেচের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা নিশ্চিত করে সময়মতো চারা রোপণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আমরা সার্বক্ষণিক মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের প্রয়োজনীয় কারিগরি
পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পর্যাপ্ত বৃিিষ্টপাত হলে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হবে বলে আমরা আশা করছি। তবে বৃষ্টি হলে সমস্যা আর থাকবেনা। যেটুকু ধান রোপনে বিলম্ব হয়েছে তা কৃষকরা কাটিয়ে উঠবেন।
