সরবরাহ ঠিক না থাকলে বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে

সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে দেশে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীসহ নিত্যপণ্যের বাজারে থাকা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। তবে দ্রুত জ্বালানি সংকট নিরসন, সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে বলে শঙ্কা তুলে ধরেছেন এসব ব্যবসায়ীরা।

গতকাল মঙ্গলবার ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) নিত্যপণ্যের মজুদ, সরবরাহ, আমদানি ও মূল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক। এতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীরা জানান, ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানি কাঁচামাল আমদানি করে উৎপাদন ও সরবরাহ ঠিক রাখে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহে বিঘ্ন হচ্ছে। এ অবস্থায় যেকোনোভাবে কারখানাগুলো সচল রাখার দাবি করেছেন।

মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা বলেন, দেশে এক সময় ৩০-৪০টি ভোগ্যপণ্যের কোম্পানি থাকলেও এখন তা টিকে আছে মাত্র চার থেকে পাঁচটি। একদিকে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী কয়েকটি কারখানা বন্ধ, অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যায় কিছু কারখানা ভালোভাবে উৎপাদনে আসতে পারছে না।

তিনি বলেন, আমদানি এবং মিল পর্যায়ে উৎপাদন সচল না রাখা গেলে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা যাবে না। এজন্য জ্বালানি সংকট নিরসন এবং এলসি সংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত সমাধান করতে হবে।

মেঘনা গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপ-মহাব্যবস্থাপনা পরিচালক তসলিম শাহরিয়ার বলেন, গ্যাস সরবরাহের আশ্বাসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদনের প্রস্তুতি নিলেও অনেক ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে চিনি, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে সমস্যা হচ্ছে। রমজান সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনকারী শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

বেতন বৃদ্ধির সুযোগে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো যাবে না : অনুষ্ঠানে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, সরকারি বেতন স্কেল ঘোষণার পরপর সভাটি গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এমনিতে সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে। এই পরিস্থিতিতে কিছু মানুষের বেতন বেড়ে গেল, আর সেই সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরাও আগামীকাল চাল, ডাল ও তেলের দাম দুই টাকা থেকে পাঁচ টাকা করে বাড়িয়ে দিলেন এটা যেন না হয়।

তিনি বলেন, ‘যারা সরকারি চাকরি করেন, বেতন বাড়ার পরে তারা হয়তো পাঁচ টাকা বেশি দিতে পারবেন। কিন্তু সরকারি চাকরি করেন না, এমন মানুষের সংখ্যাই বেশি। ফলে ব্যবসায়ীদের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব আছে। ব্যবসায়ীরা বেতন বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে বাড়তি মুনাফা, মূল্যবৃদ্ধি, সিন্ডিকেট করবেন না; আজ সভা থেকে আমরা এই বার্তা দিতে চাই।’

অনুষ্ঠানে একপর্যায়ে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে চিনির দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কারণ জানতে চান তিনি।

এ সময় নিউ মার্কেট বনলতা কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শফিউল্লাহ বলেন, তিনি গতকালও পাইকারি বাজার (মৌলভীবাজার) থেকে ৫ হাজার ৫৫০ টাকায় প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চিনি কিনেছেন। তাতে এক কেজির দাম পড়ে প্রায় ১১১ টাকা। সেই চিনি ১১৫ টাকার নিচে বিক্রি করা যায় না।

বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আবুল হাশেম বলেন, চিনির দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে যাওয়ার কারণ আছে। অনেক দিন চিনির বাজার স্বাভাবিক ছিল। হঠাৎ দেখা গেল, কারখানায় উৎপাদন বন্ধ। পাইকারি ব্যবসায়ী যে বিনিয়োগ করেছেন, যে বিক্রয় কার্যাদেশ নিয়েছেন, সে অনুসারে সরবরাহ করতে পারছেন তারা। প্রকৃতপক্ষে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে কারখানা উৎপাদন করতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য না আসায় দাম বেড়েছে।

মেঘনা গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপ-মহাব্যবস্থাপনা পরিচালক তসলিম শাহরিয়ার বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন কমলেও খুচরা পর্যায়ে চিনির দাম কেজিতে ১০ টাকা বৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। মিল পর্যায়ে চিনির দামে বড় কোনো সমস্যা নেই।

সভায় শ্যামবাজার কৃষিপণ্য আড়ৎ মালিক সমিতির সভাপাতি বলেন, মৌলভীবাজার, খাতুনগঞ্জ বা শ্যামবাজারের মতো কোনো একটি বাজারের পক্ষে পুরো দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও যদি বাজার অস্থিতিশীল হয়, তখন সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে খুঁজে দেখতে হবে কোথায় সমস্যা হচ্ছে।

সভায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম নিয়ে ব্যবসায়ীরা বলেন, শুধু খুচরা দোকানে অভিযান পরিচালনা করলে বাজারের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। মিলগেট বা আমদানিকারকের পর্যায় থেকে পণ্য কী দামে বিক্রি হচ্ছে, এরপর পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে কত দামে যাচ্ছে, সেটি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। তাদের দাবি, বড় প্রতিষ্ঠানের মিলগেটের বিক্রয়মূল্য, চালান ও মূল্যতালিকা সংগ্রহ করে খুচরা বাজারের দামের সঙ্গে তুলনা করা হলে প্রকৃত মূল্যবৃদ্ধির উৎস চিহ্নিত করা সহজ হবে।

পোলাও চাল বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘আরফান’র সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রতিনিধি মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান বলেন, চলতি বছর বৈরী আবহাওয়ার কারণে পোলাও চালের উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। এর পাশাপাশি রপ্তানির অনুমোদন পাওয়ায় বাজারে এ চালের চাহিদা ও মজুদের প্রবণতা বেড়েছে। তিনি বলেন, পোলাও চালের উৎপাদন মূলত নওগাঁ ও দিনাজপুরকেন্দ্রিক এবং বছরের নির্দিষ্ট সময়ে ধান পাওয়া যায়। রপ্তানির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অনেক পাইকার ও মজুদদার বাজার থেকে ধান ও চাল কিনে রাখছেন। ফলে উৎপাদক ও বড় ব্যবসায়ীরাও প্রয়োজনীয় পরিমাণ পণ্য সংগ্রহ করতে পারছেন না।  

সভায় ব্যবসায়ীরা বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার ও ব্যবসায়ী, উভয়পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু খুচরা বাজারে অভিযান না চালিয়ে আমদানি, এলসি, উৎপাদন, মিলগেট, পাইকারি বাজার ও সরবরাহব্যবস্থার পুরো শৃঙ্খলকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।